क्षेत्रीय

Blog single photo

করোনাভাইরাস নিয়ে সামাজিক মাধ্যমের বাড়বাড়ন্তে কতটা খুশি নেটিজেনরা

03/04/2020

কলকাতা, ৩ এপ্রিল (হি. স.) : করোনা ভাইরাসের আক্রমণ, বিশেষত লকডাউনের পর থেকে সামাজিক মাধ্যমে মানুষের ব্যস্ততা এক লাফে অনেকটা বেড়ে গিয়েছে। এতে মানুষ খুশী না বিরক্ত? বিভিন্ন স্তরের মানুষের সঙ্গে কথা বলে সমীক্ষার ভিত্তিতে একটা ছবি আঁকার চেষ্টা করেছে ‘হিন্দুস্থান সমাচার’। তার মধ্যে কিছু বক্তব্য এ ব্যাপারে মানুষের ধারণার একটা আভাষ মিলবে। 

লকডাউন বা তারপর থেকে বিভিন্ন স্তরের মানুষ গৃহবন্দী হয়ে যাওয়ায় সামাজিক মাধ্যমের এই বৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়েছে। এর ফলে নেটিজেনদের অনেকেই বিরক্ত, বিব্রত হতে শুরু করেছেন। ব্যস্ত অনেকে পোস্ট দেখার সময়-সুযোগও পাচ্ছেন না। প্রাক্তন আইএএস অফিসার, প্রসার ভারতীর প্রাক্তন সিইও তথা প্রাক্তন কেন্দ্রীয় তথ্য ও সম্প্রচার সচিব জহর সরকার এই সামাজিক মাধ্যমের বাড়বাড়ন্তে রীতিমতন অস্বস্তি বোধ করছেন। অধিকাংশ ব্যক্তিকে তিনি জানিয়ে দিয়েছেন যে এত বেশি বার্তা তাঁকে বিব্রত করছে। তিনি লেখাপড়ার জন্য আরও বেশি সময় চান। তাঁকে সামাজিক মাধ্যমে কিছু না পাঠানোর অনুরোধ করে দিয়েছেন প্রকাশ্যেই। 

হোয়াটসঅ্যাপ ফেসবুকের এই প্লাবনে সবাই যে খুব খুশী, তা নয়। সমীক্ষার জন্য এই প্রতিবেদক নির্দিষ্ট চারটি প্রশ্নের উত্তর করেন।  প্রশ্নগুলো হল— ১) করোনার কামড়ের পর আনুমানিক সংখ্যা বা সময় বরাদ্দের দিক থেকে অন্য সময়ের চেয়ে কতটা বেড়েছে হোয়াটসঅ্যাপের পোস্ট/ভিডিও? ২) এতে তিনি ঋদ্ধ না বিরক্ত বোধ হচ্ছেন? ৩) প্রাপ্ত পোস্ট/ভিডিওর আনুমানিক কত শতাংশ দেখার অবকাশ মেলে? ৪ ) এ সবে অন্য কাজে ব্যাঘাত ঘটছে,না ভাল সময় কাটছে ?

উত্তরে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপালের সরকারি আলোকচিত্রী রাজ কুমার ঘোষ জানান, প্রথমটির উত্তর ৭০ - ৮০%। ২) হ্যাঁ। তবে সব সময় নয়। ৩) ৪০ - ৫০%। ৪) কাজের ব্যাঘাত তো নিশ্চয়ই হচ্ছে। কিন্তু সবটাই নেতিবাচক নয়। কিছু ভাল সময় উপভোগ করছি। 

নকশাল (সিপিআইএমএল-রেড স্টার) নেত্রী তথা দুর্গাপুর কার্মেল, প্রেসিডেন্সি এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন কৃতী ছাত্রী, একটি নামী ইংরেজি দৈনিকের প্রাক্তন সাংবাদিক শর্মিষ্ঠা চৌধুরীর উত্তর— ১) করোনার জন্য সামাজিক মাধ্যমের চাপ খানিক বেড়েছে। তবে করোনা ছাড়া অন্য বিষয়ে মেসেজ/ফরওয়ার্ড কমেছে। তাই হরে-দরে একই সময় কাটছে এগুলোর পেছনে। ২) বিশেষ ভাবে কোনোওটা নয়। ৩) ৭০-৮০℅। ৪) কাজে ব্যাঘাত ঘটছে।

কলকাতার অভিজাত অঞ্চল নিউ আলিপুরের পুরমাতা যুঁই বিশ্বাসের উত্তর, ১) আগের চেয়ে দিনে  তিন ঘন্টার মত বেড়েছে সামাজিক মাধ্যমে। ২) অপ্রাসঙ্গিক পোস্টে কাজে ব্যাঘাত ঘটে। ৩) দেখার অবকাশ সব সময়ে মেলে না। ৪) জনপ্রতিনিধিদের কাছে মানুষের জন্য কাজটাই আগে। 

চন্দননগর কলেজের বরিষ্ঠ অধ্যাপিকা, বঙ্কিম চর্চা কেন্দ্রের প্রাক্তন অধিকর্তা সঙ্গীতা ত্রিপাঠী মিত্রর কথায়, “১) গত কদিনে পোস্ট প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে।  ২) কিছু ঋদ্ধ করেছে নিশ্চয়ই। কিন্তু অবশ‍্যই বেশিরভাগ বিরক্ত করে।  ৩) কতটা দেখি বলা মুশকিল। সব পোস্ট তো দেখি না। সময় পেলে বাছা বাছা পোস্ট দেখি। তা সংখ‍্যায় কমই। সামাজিক মাধ্যমে একেবারেই ভালো সময় কাটে না। তাই দেখি কম। ৪) ফেসবুক-হোয়াটসঅ্যাপ পোস্টের কারণে নয়, কাজে ব‍্যাঘাত ঘটেছে এই অসুখের কারণে।  অর্থাৎ দেশের পরিস্থিতি দেখে। এগুলো না দেখলেই তো হল।
বিখ্যাত এক স্বাধীনতা সংগ্রামীর কন্যা বর্ষীয়ান শিক্ষাবিদ ভারতী সেনের মতে, “আগের চেয়ে যে সামাজিক মাধ্যমে বেশি সময় দিতে হচ্ছে তা নয়। অনেক পোস্ট, বিশেষত করোনা-বিষয়কগুলো একটু এড়িয়ে যাই। বাকি পোস্টগুলোর ৮০ শতাংশ দেখি। তাছাড়া সামাজিক কিছু বিষয়, সব্জি-সংগ্রহ এ সবের জন্যও মুঠোফোন ব্যবহারের প্রয়োজন বেড়েছে। সব মিলিয়ে এই বৃদ্ধি ৩০ শতাংশ ধরা যায়। 

আকর্ষণীয় ফলের নিরিখে কলকাতার প্রথম শ্রেনীর স্কুল পঞ্চশায়র বালিকা বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষিকা তথা একটি সাময়িকীর সম্পাদক সূপর্ণা চক্রবর্তীর মতে, উত্তরগুলো হল ১) সময়ের দিক থেকে পোস্ট অনেক বেড়েছে। লেখা ও ভিডিও দুই ই। ২) বেশির ভাগই ভাবনাবিহীন, অর্থহীন, কিছু নিজেকে জাহির করার জন্যে। প্রচুর অপ্রয়োজনীয়
খাবারের পোস্ট। অত্যন্ত বিরক্ত বোধ করছি। কিছু পোষ্ট শেয়ার হচ্ছে যার বিন্দুমাত্র বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। ভুল বার্তা জনমনে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। ৩) আগে দেখছিলাম বেশ। কিন্তু বর্তমানে ২৫-৩০শতাংশ দেখি। ৪) এগুলির একটা নেশা আছে, বিশেষ করে যখন সবাই ঘরবন্দী। কিন্তু শুধু সময়ের অনর্থক অপচয় ছাড়া আর কিছু না। জীবনে সময় পেলে গঠনমূলক অনেক কিছু করা যায়। সেগুলোতে মন দিলে অনেক মূল্যবান হবে ।

 জাতীয়তাবাদী অধ্যাপক মোহিত রায়ের জবাব, “ লকডাউনের পর সামাজিক মাধ্যমে চাপ বেড়েছে, অন্তত ২৫ %। ২) নতুন রকম বোধ হচ্ছে কারণ অনেক নতুন কাজ করছি/ শিখছি। ৩) দেখার অবকাশ হচ্ছে বড় জোর ১৫%। কারণ পোস্ট ভীষণ বেড়ে গেছে। ৪) কিছুটা একঘেয়ে সময়। তবে নতুন কিছু পড়ার, পুরানো চিঠি কাগজপত্র ঘাটার সময় পেয়ে কিছুটা ভাল সময়ও কাটছে।

কেন্দ্রীয় সরকারের ডাকবিভাগের প্রাক্তন অফিসার স্কাউট-আন্দোলনের অন্যতম ব্যক্তিত্ব দেবাশিস সুরের মতে, ১) এই করোনা আতঙ্কের পর হোয়াটসঅ্যাপ পোষ্ট বা দেখা আগের চেয়ে প্রায় চার গুণ বেড়ে গেছে। ২) ঋদ্ধ হচ্ছি। ৩) প্রায় আনুমানিক ৫০% শতাংশ মেলে। ৪) অন্য সেরকম বিশেষ কাজ না থাকায় সামাজিক মাধ্যমে খুব একটা ব্যাঘাত ঘটছে না।

কেন্দ্রীয় সরকারের এজি বেঙ্গলের প্রাক্তন পদস্থ অফিসার মঞ্জুশ্রী শিকদার বলেন, একটা অবসাদ এসে যাচ্ছে। একই পোস্ট বার বার আসছে বলে কম দেখি। এ ছাড়া, কাজের লোক না আসায় বাড়ির কাজ বেড়ে গিয়েছে। 

সমাজকর্মী মিতালি সাহার কথায়, “হোয়াটসঅ্যাপ-ফেসবুকে বেশি সময় দিচ্ছি, কিন্তু রামায়ণ, মহাভারতের সকাল সন্ধ্যার স্লটের সময় কোনও সামাজিক মাধ্যম নয়।“হিন্দুস্থান সমাচার/ অশোক


 
Top