क्षेत्रीय

Blog single photo

সামাজিক মননে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে বর্ণবিদ্বেষের কালো ছায়া

15/09/2020

  শুভঙ্কর দাস 
কলকাতা, ১৫ সেপ্টেম্বর (হি. স.): ভারতের সাংস্কৃতিক রাজধানী কলকাতায় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপিকা মেরুনা মুর্মুর উপর যেভাবে বর্ণবিদ্বেষের আঘাত নেমে এসেছে তা যথেষ্ট উদ্বেগের। এটি কোন বিক্ষিপ্ত ঘটনা নয়। বর্ণবিদ্বেষের বীজ অনেক গভীরে যে রয়েছে, এই ঘটনা তার সুস্পষ্ট উদাহরণ বহন করে চলেছে। নবজাগরণের আলোকপ্রাপ্ত মহানগরীতে বর্ণবিদ্বেষ সামাজিক মাধ্যমে যে ভয়ঙ্কর রূপ নিতে পারে এর থেকে ভালো উদাহরণ হয়তো সমকালীন সময়ে আর হতে পারে না। ছাত্রীটির মনের গভীরে বর্ণবিদ্বেষের বীজ কি করে বপন হল তার সন্ধান করা একান্ত প্রয়োজন। স্রেফ নিন্দা করে বা ক্যামেরার সামনে বিবৃতি দিয়েই এই বিদ্বেষকে উপড়ে ফেলা যাবে না। প্রয়োজন আত্মসমীক্ষার। ব্যক্তির এবং সমষ্টি গত ভাবে সমাজের আত্মসমীক্ষার দরকার। সহ নাগরিকের পরিচয় যে কেবল তার পদবীতে সীমাবদ্ধ নয়, সেই চেতনা প্রতিটা জনগণের মধ্যে কেন জন্মালো না তা বিশ্লেষণ করা একান্ত প্রয়োজন। 

 এই প্রসঙ্গে বিশিষ্ট সমাজকর্মী রঞ্জিত শূর জানিয়েছেন, বেথুন কলেজের ছাত্রীটি যে ঘৃণ্য ভাষায় সামাজিক মাধ্যমে মন্তব্য করে গিয়েছে তা ক্ষমাহীন। ছাত্রীটির পরিবারের উচিত ছিল তাদের সন্তান এমন মন্তব্য কেন করল তা আত্মবিশ্লেষণ করে দেখা। নিছক দোষ স্বীকার করলেই সমাধান হয়ে যায় না। বর্ণবিদ্বেষের এই গভীর অসুখ থেকে তরুণ-তরুণীদের নিরাপদ দূরত্বে রাখাটা প্রয়োজন। বর্ণবিদ্বেষের যে ধারা আমাদের সমাজে বহমান এবং তার থেকে জন্ম নেওয়া আধিপত্যকামী শক্তির বহিঃপ্রকাশ হয়েছে এই ঘটনায়। বর্ণবিদ্বেষ নামক গভীর অসুখ সম্পর্কে চোখ খুলে দিয়েছে এই ঘটনা। যেভাবে মেরুনা মুর্মুকে অপমানিত এবং লাঞ্ছিত করা হয়েছে তা হৃদয়বিদারক। ঘৃণার এই দৌরাত্ম্যে সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা বেড়ে গিয়েছে। 
 ঘৃণা এবং বিদ্বেষ শিশুমনে পারিবারিক পারিপার্শ্বিকতার প্রভাবে প্রবেশ করতে শুরু করে। পরবর্তীতে যা সহ নাগরিকের প্রতি বর্ণবিদ্বেষের অগ্নুৎপাত হয়ে ঝড়ে পড়ে। যদিও এমন ধারণাকে মান্যতা দিতে নারাজ মনোবিদ নীলাঞ্জনা সান্যাল। তিনি জানিয়েছেন যে মেয়েটির আশা এবং প্রত্যাশার বিপুলতা পূরণ না হওয়ায় সে হতাশার দিকে চলে গিয়েছিল। এখানে তার হতাশাটা এতটাই তীব্র ছিল যে সে সামান্যতম পরিসর পেয়ে সর্বশক্তি দিয়ে আঘাত করতে উদ্যত হয়। এখানে পরিবারের ভূমিকা আছে বলে মনে করি না। মেয়েটির আক্রোশটা এতটাই বড় ছিল যে সেখানে সমস্ত শালীনতার সীমা লংঘন করে গিয়েছে। 
 উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিত্বদের মনেও বর্ণবিদ্বেষ যে রয়েছে সেদিকে আলোকপাত করতে গিয়ে নীলাঞ্জনা দেবী দাবি করেছেন, 'প্যারিসে সম্মেলনে যোগ দিতে গিয়ে বাঙালি একটি পরিবারের সঙ্গে আলাপ হয়। প্রথমেই তারা জানতে চান যে আমার বিবাহ পূর্বের পদবী কি ছিল। বর্ণবিদ্বেষের এই বহমানতা এখনো বর্তমান।' পাশাপাশি মেরুনা মুর্মুর বিরুদ্ধে সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে যে ১৮০০ কমেন্ট করা হয়েছিল সেগুলিকে মূল্যবোধের অধঃপতন হিসেবে আখ্যা করেছেন নীলাঞ্জনা দেবী।
সমাজতাত্ত্বিক তথা ঝাড়গ্রাম রাজ কলেজের (মহিলা বিভাগ) অধ্যাপিকা শময়িতা ঘোষ জানিয়েছেন, গোটা ঘটনাটি সামাজিক অবক্ষয় হিসেবে দেখাটা ঠিক নয়। কারণ সমাজের প্রচলিত ধারার মধ্যেই বর্ণবিদ্বেষ বহমান। অধ্যাপিকা মেরুনা মুর্মু কর্মক্ষেত্রে এর আগেও প্রতিষ্ঠা অধ্যাপক অধ্যাপিকাদের দ্বারা বর্ণবিদ্বেষের শিকার হয়েছেন। সমাজের জাতিভিত্তিক বিন্যাস বহু হাজার বছর ধরে রয়েছে। এই সমস্যা নিহিত সমাজের কাঠামো বা স্ট্রাকচারে। কলকাতাকে যে সাংস্কৃতিক রাজধানী বলা হচ্ছে সেই সংস্কৃতির গেটকিপার বা রক্ষক কিন্তু উচ্চবর্ণ এবং বিশেষ করে ব্রাহ্মণরা। আম্বেদকর নিজে বলে গিয়েছিলেন যে উচ্চবর্ণের তৈরি সেই সাংস্কৃতিক বৃত্তে অন্য বর্ণের প্রবেশাধিকার নিষেধ। উচ্চবর্ণের ব্যক্তিত্বরাই সেই সংস্কৃতিকে লালন এবং পালন করে যেতে চান। তাই স্বাভাবিকভাবে সংরক্ষণ ব্যবস্থার প্রতি এত বিদ্বেষ। উচ্চবর্ণে থাকা ব্যক্তিত্বরা ছোটবেলা থেকে লেখাপড়ার যে সুযোগ এবং পরিসর পায় তার থেকে কিন্তু বঞ্চিত নিম্নবর্ণের মানুষ। সেই কারণে সমমানের অধিকারের জন্য সংবিধান সংরক্ষণের সুযোগ দিয়েছে। মেধা ঈশ্বরজাত নয়। বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার মাধ্যমে সেই মেধা গড়ে ওঠে। সরকারি চাকরির উচ্চপদে থাকা সিংহভাগ ব্যক্তিত্বরাই উচ্চবর্ণের অন্তর্গত। সমাজ তথা দেশের নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা অপরিসীম। অধ্যাপিকা মেরুনা মুর্মু যে সংরক্ষণের কোন সাহায্য ছাড়াই উচ্চ মেধা এবং শিক্ষার শীর্ষে যেতে পেরেছেন।উচ্চ শ্রেণীতে থাকা লোকেরা তা মানতেই চায় না। যে ঘটনাটা ঘটেছে তার ভিত্তি একদিনের স্থাপন হয়নি। এমনকি স্বাধীনতার পর থেকে শুরু করে আট - এর দশক পর্যন্ত যে বামপন্থী আন্দোলন হয়েছে সেখানেও বর্ণবিদ্বেষ নিয়ে নীরব থাকা হয়েছিল। 
 আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় জনপ্রিয় সংস্কৃতি যেরকম চলচ্চিত্র, সাহিত্য, নাটক সবকিছুতেই উচ্চবর্ণের দাপাদাপি। সেখানে দলিত বা নিম্নবর্ণের প্রবেশাধিকার একপ্রকার নেই বললেই চলে। সমাজের সাংস্কৃতিক আঙিনায় এই বেড়াজাল এখনও রয়েছে। এমনকি দলিত বা অন্ত্যজ শ্রেণীর পদবী শুনলে হাসাহাসি পর্যন্ত হয়।
অধ্যাপিকা মেরুনা মুর্মুর ওপর বর্ণবিদ্বেষী হামলায় উদ্বেগ প্রকাশ করে ঝাড়্গ্রাম রাজ কলেজের (মহিলা বিভাগ) বাংলার অধ্যাপিকা পম্পা হেম্ব্রম জানিয়েছেন, সংরক্ষণের সুযোগ-সুবিধা না নেওয়া সত্ত্বেও আক্রমণের শিকার হতে হয়েছে মেরুনা মুর্মুকে। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর সংবিধানে সংরক্ষণ স্থান পেয়েছে। তবুও আদিবাসীদের সরকারিভাবে আদিবাসী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। তাদেরকে তপশিলি উপজাতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আসলে নিজ ভূমে থেকে পরবাসীর মতন অবস্থা হয়েছে আদিবাসীদের। এমনকি সংসদ এবং বিধানসভাগুলিতেও পর্যাপ্ত মাত্রার তুলনায় আদিবাসী জন প্রতিনিধির সংখ্যা কম। সংবিধানে বর্ণিত সংরক্ষণ সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করে থাকে। এতে কোন প্রকারের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নেই। মেরুনা মুর্মুর প্রতি যে লাঞ্ছনা এবং অপমান ধেয়ে এসেছে তা গোটা আদিবাসী সমাজের কাছে বেদনার। এই আক্রমণ কোন এক ব্যক্তিকে করা হয়নি,তা গোটা একটা জাতিকে করা হয়েছে। ফলে বিষয়টিকে ছোট করে দেখা উচিত। গোটা ঘটনায় তিনি যে শঙ্কিত তাও মনে করিয়ে দিয়েছেন পম্পা দেবী। 
 উল্লেখ করা যেতে পারে সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে করোনা সংকটকালে পড়ুয়াদের শারীরিক নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে চূড়ান্ত বর্ষের সেমিস্টার পরীক্ষা আয়োজন না করার আহ্বান করেছিলেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপিকা মেরুনা মুর্মু। এরপরই বেথুন কলেজের ওই ছাত্রী অসংসদীয় ভাষা প্রয়োগ করে বর্ণবিদ্বেষ মূলক মন্তব্য করে গিয়েছে। গোটা ঘটনায় প্রশ্নের মুখে পড়েছে মহানগরীর সাংস্কৃতিক মনষ্কতা। হিন্দুস্থান সমাচার 


 
Top