क्षेत्रीय

Blog single photo

পরপাড়ে পাড়ি করিমগঞ্জের বহু ইতিহাসের সাক্ষী, বিজেপির প্রাক্তন জেলা সভাপতি রথীন্দ্র ভট্টাচার্যের

16/09/2020

করিমগঞ্জ (অসম), ১৬ সেপ্টেম্বর (হি.স.) : চলে গেলেন করিমগঞ্জের প্রবীণ ব্যক্তিত্ব, সমাজহিতৈষী, ভারতীয় জনতা পার্টির বটবৃক্ষ তথা প্রাক্তন জেলা সভাপতি রথীন্দ্র ভট্টাচার্য। বেশ কিছুদিন জীবনযুদ্ধে লড়াই করে আজ বুধবার সকাল ৭.১২ মিনিটে ইহলোকের লীলা সাঙ্গ করে পরপারে পাড়ি দিয়েছেন তিনি। একজন সৎ ও আদর্শবান অভিভাবক রথীন্দ্র ভট্টাচার্যকে হারিয়ে করিমগঞ্জের প্রায় সব রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী ছাড়াও সাধারণ নাগরিককুলে শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সনোয়াল, প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অসমে বিজেপির পিতামহ কবীন্দ্র পুরকায়স্থ, দলের প্রদেশ সভাপতি রঞ্জিতকুমার দাস, করিমগঞ্জের সাংসদ কৃপানাথ মালাহ, দলের নির্বাচিত বিধায়কগণ, এআইডিসি-র চেয়ারম্যান মিশনরঞ্জন দাস, কংগ্রেস, এআইইউডিএফ, সিপিআইএম সহ বিজেপির সর্বস্তরের কার্যকর্তা। 

রথীন্দ্র ভট্টাচার্যের মৃত্যুসংবাদ পেয়ে গভীর শোক ব্যক্ত করে মুখ্যমন্ত্রী তাঁর টুইট হ্যান্ডলে লিখেছেন, বিজেপির বরিষ্ঠ কার্যকর্তা, করিমগঞ্জের প্রাক্তন জেলা সভাপতি রথীন্দ্র ভট্টাচার্যের নিঃস্বার্থ অবদান বরাক উপত্যকায় দলকে মজবুত করেছে। প্রয়াত রথীন্দ্র ভট্টাচার্যের আত্মার চিরশান্তি কামনা করে তাঁর শোকাহত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করেছেন মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সনোয়াল।

প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কবীন্দ্র পুরকায়স্থ শোক ব্যক্ত করেছেন প্রবীণ বিজেপি কার্যকর্তা রথীন্দ্র ভট্টাচার্যের প্রয়াণে। তিনি বলেছেন, রথীন্দ্রদার মৃত্যুতে কেবল করিমগঞ্জ জেলাই নয়, গোটা বরাক উপত্যকা একজন রাজনৈতিক বোদ্ধাকে হারিয়েছে। করিমগঞ্জ হারিয়েছে একজন অভিভাবককে। এক ইন্দ্রপতন হয়েছে বলা যেতে পারে। কবীন্দ্র পুরকায়স্থ পুরনো স্মৃতি রোমন্থন করে বলেন, রথীন্দ্রদার দূরদৃষ্টি ছিল অসাধারণ। বরাক উপত্যকার বহু ইতিহাসের এক সাক্ষীকে হারিয়ে ব্যক্তিগতভাবে যারপরনাই অত্যন্ত মর্মাহত তিনি। বলেন, তাঁর সাংগঠনিক ক্ষমতাও ছিল প্রবল। কবীন্দ্রবাবু আরও বলেন, আজীবন নিষ্ঠা ও সততার সাথে শুধু রাজনীতিই নয়, সামাজিক কর্মকাণ্ডে কর্মচঞ্চল এমন ব্যক্তিত্ব বিরল। 

প্রয়াত রথীন্দ্র ভট্টাচার্য ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন। দুরারোগ্য ব্যাধি নিয়েও আমৃত্যু নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে দল ও সমাজের কাজ নীরবে করে গেছেন। কয়েকদিন আগে শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাঁকে শিলচর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসাধীন করা হয়। সেখানেই আজ সকাল ৭.১২ মিনিটে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। 

আজ সকালে তাঁর মৃত্যু সংবাদ পৌঁছামাত্র করিমগঞ্জ জেলায় এক শোকাবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। নিষ্ঠা ও সততার সাথে কাজ করে যাওয়ার এক জ্বলন্ত উদাহরণ ছিলেন তিনি। ফলে সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে তাঁর জনপ্রিয়তাও ছিল প্রচণ্ড বেশি। কেবল তা-ই নয়, জেলার সব কয়টি রাজনৈতিক দলের নেতা থেকে সাধারণ কর্মীর কাছেও তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ছিল। বিজেপিতো বটেই, কংগ্রেস, এআইইউডিএফ প্রায় সব রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা রথীন্দ্রবাবুর কোনও বক্তব্য গুরুত্ব সহকারে গ্রহণ করতেন। করিমগঞ্জের অধিকাংশ সাংবাদিকও তাঁকে অতি শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের সাহায্যে সবসময় এগিয়ে থাকতেন তিনি। ফলে হিন্দু-মুসলিম সব শ্রেণির মানুষ তাঁকে শ্রদ্ধা করতেন। 

রাজনীতির পাশাপাশি করিমগঞ্জের একটি জীবন্ত ইতিহাস গ্রন্থ বলা যেতে পারে প্রয়াত রথীন্দ্র ভট্টাচার্যকে। দেশ বিভাগের পূর্ব পরিস্থিতি থেকে শুরু করে সাম্প্রতিককালের পরিস্থিতি, সবকিছুই ছিল তাঁর নখদর্পণে। ৬১-এর বাংলা ভাষা আন্দোলন কিংবা ৭১-এর যুদ্ধ, কোনও বিষয়ে জানতে হলে সর্বাগ্রে সকলে ছুটে যেতেন রথীন্দ্রবাবুর কাছে। যার যা জিজ্ঞাসা, তার সেই উত্তর অনর্গল বলে যেতেন। অবিভক্ত সিলেট এবং পরবর্তীতে করিমগঞ্জের ইতিহাস ছিল তাঁর ঠুঁটের ডগায়। প্রশাসন থেকে রাজনীতিবিদ সকলের কাছেই রথীন্দ্র ভট্টাচার্যের বিকল্প নেই। আজীবন রাজনীতি করার পাশাপাশি বাঙালির অস্তিত্বের লড়াইয়েও এগিয়ে ছিলেন তিনি। দু-দুবার করিমগঞ্জ বিজেপির জেলা সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। আজীবন নিষ্কলঙ্কতার সাথে রাজনীতি করে গেছেন। দলের যখন কঠিন পরিস্থিতি, তখনও শক্ত হাতে বিজেপির ধ্বজা ছাড়েননি তিনি। অনেক ঘাত প্রতিঘাত সহ্য করে প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও দলের হাল শক্ত হাতে সামলেছেন রথীন্দ্রবাবু। বলতে গেলে করিমগঞ্জ বিজেপির এক মহীরুহ ছিলেন তিনি। 

রাজনীতি ছাড়াও বহু সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক সংগঠনের সাথেও সরাসরি জড়িত ছিলেন প্রয়াত রথীন্দ্র ভট্টাচার্য। বহু আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। এই কয়দিন আগে, জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) নিয়ে করিমগঞ্জের মানুষ যখন ব্যতিব্যস্ত, তখন অনেকেই তাঁর সান্নিধ্যে এসে উপায় খুঁজে পেয়েছিলেন। বিগত কিছুদিন থেকে অসুস্থ থাকা সত্ত্বেও অনেকেই তাঁর বাড়িতে ছুটে গেছেন বহু ইতিহাস জানতে। তাঁর মৃত্যুতে করিমগঞ্জ জেলার সকল স্তরের মানুষ গভীর শোক ব্যক্ত করেছেন। অনেকেই বলেছেন, রথীন্দ্র ভট্টাচার্যের জায়গা পূরণ করা অসম্ভব। তাঁর মৃত্যুতে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে করিমগঞ্জের। 

রথীন্দ্র ভট্টার্যের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন জেলা বিজেপি সভাপতি সুব্রত ভট্টাচার্য, জেলা কংগ্রেস সভাপতি সতু রায়, এআইইউডিএফ-এর জেলা সভাপতি আজিজুর রহমান তালুকদার, বিধায়ক তথা কংগ্রেস নেতা কমলাক্ষ দে পুরকায়স্থ, বিজেপি বিধায়ক কৃষ্ণেন্দু পাল, বিধায়ক বিজয় মালাকার, সিপিআইএম-এর জেলা কমিটির সম্পাদক ধর্মদাস চক্রবর্তী। করিমগঞ্জ প্রেস ক্লাব এবং প্রেস ক্লাব করিমগঞ্জও রথীন্দ্র ভট্টাচার্যের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে। 

হিন্দুস্থান সমাচার / জন্মজিৎ / সমীপ


 
Top