क्षेत्रीय

Blog single photo

বঙ্গ জীবনে বর্ণবিদ্বেষের বাড়বাড়ন্ত নিয়ে উদ্বিগ্ন যুক্তিবাদীরা

16/09/2020

  শুভঙ্কর দাস 
কলকাতা, ১৬ সেপ্টেম্বর (হি. স.): যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপিকা মেরুনা মুর্মুর ওপর ধেয়ে আসা বর্ণবিদ্বেষীমূলক মন্তব্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যুক্তিবাদী সংগঠনগুলি। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, জগদীশচন্দ্র বসু, মেঘনাদ সাহার শহর কলকাতায় মধ্যযুগীয় মানসিকতার বাড়বাড়ন্ত উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বিষয়টিকে কোনোভাবেই বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখতে নারাজ যুক্তিবাদী সংগঠনগুলি। 

 যুক্তিবাদী মননের পরিবর্তে বর্ণবিদ্বেষীমূলক কুসংস্কারে ভরা মানসিকতা তৈরি হওয়ার পেছনে রাজ্য তথা দেশের শিক্ষাব্যবস্থা যে দায়ী সেদিকে আলোকপাত করেছেন ব্রেক থ্রু সাইন্স সোসাইটির কোষাধ্যক্ষ আশিষ সামন্ত। তিনি জানিয়েছেন, গোটা ঘটনাটাকে গভীরে গিয়ে ভাবতে হবে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা প্রকৃত বিজ্ঞানের মানে পড়ুয়াদেরকে শেখাতে পারেনি। শিক্ষাব্যবস্থায় বিজ্ঞানের পঠন-পাঠন হচ্ছে তথ্য কেন্দ্রিক। সেখানে আবিষ্কারের পেছনে আবিষ্কর্তার ভাবনা ও মনন নিয়ে কখনো আলোচনা হয়নি। একজন বৈজ্ঞানিক কোন পরিস্থিতি এবং প্রেক্ষাপটের মধ্যে দাঁড়িয়ে আবিষ্কার করেছিলেন সেগুলি পড়ুয়াদের মধ্যে তুলে ধরা হয় না। ফলের যুক্তিবাদী মননশীলতার অভাব। সমাজের পারিপার্শ্বিকতা শৈশব মনে বর্ণবিদ্বেষের মতন কুসংস্কারের বীজ বপন করে চলে। উচ্চ-নিচ ভেদাভেদ এগুলো শৈশব থেকেই পারিপার্শ্বিকতার মাধ্যমে শিশু মনে জন্ম নেয়। ফলে সত্যের অন্বেষণ করার ইচ্ছাটা মরে যায়। কোন কিছুকে যুক্তি দিয়ে উল্টেপাল্টে ভাববার প্রচেষ্টা কমে আসে। তখনই এমন ধরনের ঘটনা ঘটে। আসলে জীবনটাই যে বড় একটা পরীক্ষাগার সেই শিক্ষা পড়ুয়াদের দেওয়া হয় না।
অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলি বর্ণবিদ্বেষমূলক পরিস্থিতির থেকে ভোটের স্বার্থে ফায়দা তুলতে চায়। তারাও পুরোপুরি বর্ণবিদ্বেষ নির্মূল করতে চায় না।
পরিবারের পরম্পরা মধ্যেই কুসংস্কারের যে আধিক্য যা কিনা পরবর্তী সময় মানুষের মনের ওপর বিস্তার লাভ করে সেদিকে আলোকপাত করে বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতির সাধারণ সম্পাদক দেবাশীষ ভট্টাচার্য্য জানিয়েছেন, বৈজ্ঞানিক ধ্যান-ধারণা আসার আগে মানুষ কুসংস্কারে নিমজ্জিত ছিল। বর্ণাশ্রম প্রথা ভগবানের তৈরি বলে প্রাচীনকালে প্রচার করা হতো। বিজ্ঞান এসে দেখিয়ে দিল বিবর্তনের মধ্যেই মানব সভ্যতার অগ্রগতি হয়েছে। উচ্চ-নিচ, জাতিভেদ প্রথা আদতে যে মানুষের সৃষ্টি তা বিজ্ঞান চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় সমাজের সিংহভাগ অংশ বিজ্ঞান পড়ে নম্বর অর্জন করে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু তাদের পারিবারিক পরম্পরার মধ্যে যে কুসংস্কারের আধিক্য সেটাকেই তারা এগিয়ে নিয়ে যায়। তাই ঘৃণা এখন মানুষের নিঃশ্বাসে-প্রশ্বাসে। কিছু তথাকথিত শিক্ষিত মানুষ আছেন যারা ঘৃণা প্রদর্শন করাকে জীবনের স্বাভাবিক ক্রিয়ার হিসেবে বিবেচনা করেন। অর্থাৎ সে যে অন্য মানুষের প্রতি ঘৃণা পোষণ করে তাতে তার কোন লজ্জা নেই। উচ্চপদে কর্মরত ব্যক্তিত্বরাও ঘৃণা ছড়িয়ে যান। সামাজিক মাধ্যম আসার আগে কিছু উচ্চ শিক্ষিত ব্যক্তি নিজেদের ঘনিষ্ঠমহলে বর্ণবিদ্বেষের সপক্ষে সওয়াল করতেন। কিন্তু সামাজিক মাধ্যম চলে আসার ফলে সেই আড়াল সরে গিয়ে এখন প্রকাশ্যেই তারা বর্ণবিদ্বেষ মূলক আচরণ করে চলেছেন। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিসরে নতুন অভ্যাস গজিয়ে উঠেছে যেখানে অন্য জাতিকে নিচ হিসেবে প্রতিপন্ন করার মধ্যেই দেশপ্রেম লুকিয়ে রয়েছে বলে প্রমাণ করার চেষ্টা চলছে। 
 এই প্রসঙ্গে ঝাড়গ্রাম রাজ কলেজ (মহিলা বিভাগ) বাংলার অধ্যাপিকা পম্পা হেম্ব্রম জানিয়েছেন, সংরক্ষণের সুযোগ-সুবিধা না নেওয়া সত্ত্বেও আক্রমণের শিকার হতে হয়েছে মেরুনা মুর্মুকে। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর সংবিধানে সংরক্ষণ স্থান পেয়েছে। তবুও আদিবাসীদের সরকারিভাবে আদিবাসী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। তাদেরকে তপশিলি উপজাতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আসলে নিজ ভূমে থেকে পরবাসীর মতন অবস্থা হয়েছে আদিবাসীদের। এমনকি সংসদ এবং বিধানসভাগুলিতেও পর্যাপ্ত মাত্রার তুলনায় আদিবাসী জন প্রতিনিধির সংখ্যা কম। সংবিধানে বর্ণিত সংরক্ষণ সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করে থাকে। এতে কোন প্রকারের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নেই। মেরুনা মুর্মুর প্রতি যে লাঞ্ছনা এবং অপমান ধেয়ে এসেছে তা গোটা আদিবাসী সমাজের কাছে বেদনার। এই আক্রমণ কোন এক ব্যক্তিকে করা হয়নি,তা গোটা একটা জাতিকে করা হয়েছে। ফলে বিষয়টিকে ছোট করে দেখা উচিত নয়। গোটা ঘটনায় তিনি যে শঙ্কিত তাও মনে করিয়ে দিয়েছেন পম্পা দেবী। 
 পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চের সদস্য কমল নাথ জানিয়েছেন, যুক্তিবাদ এবং বিজ্ঞান এখনো পুরোপুরি সমাজ থেকে কুসংস্কার এবং বর্ণবিদ্বেষী ধারণাকে নির্মূল করতে পারেনি। তার সবথেকে বড় উদাহরণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সেখানে এখনো বর্ণবিদ্বেষ মানসিকতা এখনও বহমান। একদিকে যখন যুক্তিবাদীরা বিজ্ঞানের সপক্ষে প্রচার করে চলেছে তখন কুসংস্কারকেও এক শ্রেণীর লোকেরা সাংগঠনিক ভিত্তি দিতে চাইছে। তারা কুসংস্কার প্রচার করার জন্য সংগঠন তৈরি করছে। ফলে এখানেই দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে।
 পরিবেশবিদ বিশ্বজিৎ মুখোপাধ্যায় জানিয়েছেন, আমাদের মন পরিবেশের উপাদানে গঠিত। কিন্তু করোনা সংকটের জেরে প্রত্যেক দিন এমন একটা নেতিবাচক পরিবেশ তৈরি হয়েছে যে তার থেকে হতাশা এবং উৎকণ্ঠা জন্ম নিচ্ছে। সেই হতাশ এবং উৎকণ্ঠায় প্রকাশ হচ্ছে এই ঘটনা। 
 উল্লেখ করা যেতে পারে সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে করোনা সংকটকালে পড়ুয়াদের শারীরিক নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে চূড়ান্ত বর্ষের সেমিস্টার পরীক্ষা আয়োজন না করার আহ্বান করেছিলেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপিকা মেরুনা মুর্মু। এরপরই বেথুন কলেজের ওই ছাত্রী অসংসদীয় ভাষা প্রয়োগ করে বর্ণবিদ্বেষ মূলক মন্তব্য করে গিয়েছে। গোটা ঘটনায় প্রশ্নের মুখে পড়েছে মহানগরীর সাংস্কৃতিক মনষ্কতা। হিন্দুস্থান সমাচার 


 
Top