
নয়াদিল্লি, ২৩ মে (হি.স.) : পেট্রোল, ডিজেল, রান্নার গ্যাস ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানাল কংগ্রেস। শনিবার দিল্লিতে দলীয় সদর দফতরে সাংবাদিক বৈঠক করে কংগ্রেসের গবেষণা বিভাগের প্রধান রাজীব গৌড়া এবং দলের মুখপাত্র ডলি শর্মা অভিযোগ করেন, সাধারণ মানুষের সংসারের খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলেও কেন্দ্র সরকার কোনও স্বস্তি দেওয়ার বদলে উল্টে মূল্যবৃদ্ধির বোঝা আরও বাড়াচ্ছে।
রাজীব গৌড়া বলেন, “এখন দেশের মানুষ দেখছে আগে কোনটা শতরান করবে—পেট্রোলের দাম না ডলার-রুপির বিনিময় হার।” তাঁর অভিযোগ, মাত্র এক সপ্তাহে পেট্রোলের দাম প্রায় পাঁচ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এমন সময় এই মূল্যবৃদ্ধি করা হল, যখন সাধারণ মানুষ আগেই অর্থনৈতিক চাপে জর্জরিত।
তিনি বলেন, ইউপিএ আমলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপিছু ১৪০ ডলারের বেশি পৌঁছেছিল। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সরকার ভর্তুকি দিয়ে মানুষকে স্বস্তি দিয়েছিল। কিন্তু মোদী সরকার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমলেও সেই সুবিধা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়নি। বরং এখন দাম বাড়ার পুরো বোঝাই জনগণের উপর চাপানো হচ্ছে।
রাজীব গৌড়ার অভিযোগ, কেন্দ্র সরকার তেলের দাম বাড়িয়ে যে অতিরিক্ত আয় করছে, তা নিজেদের আর্থিক পরিস্থিতি সামলাতে ব্যবহার করছে। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক ও রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার লভ্যাংশের মতোই পেট্রোলিয়াম ক্ষেত্র থেকেও বিপুল রাজস্ব আদায় করা হচ্ছে বলে দাবি তাঁর।
তিনি আরও বলেন, দেশ এখন আমদানিকৃত অপরিশোধিত তেল, এলপিজি ও প্রাকৃতিক গ্যাসের উপর আগের তুলনায় আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। ২০০৫ সালে কৃষ্ণা-গোদাবরী অববাহিকায় বিপুল গ্যাস ভাণ্ডার আবিষ্কারের দাবি করে গুজরাট স্টেট পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন। তখন নরেন্দ্র মোদী বলেছিলেন, এর ফলে ভারত জ্বালানি ক্ষেত্রে আত্মনির্ভর হবে। কিন্তু পরে নিয়ন্ত্রক ও মহালেখা পরীক্ষকের রিপোর্টে এটিকে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি বলা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সারের মূল্যবৃদ্ধির প্রসঙ্গ টেনে কংগ্রেস নেতা বলেন, এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে কৃষকদের উপর। তাঁর প্রশ্ন, “যদি দেশে পর্যাপ্ত তেল ও গ্যাস মজুত থাকে, যেমনটা প্রধানমন্ত্রী ও পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী দাবি করছেন, তাহলে বারবার জ্বালানির দাম বাড়ানো হচ্ছে কেন?” তাঁর মতে, এই মূল্যবৃদ্ধির বোঝা সরকারেরই বহন করা উচিত, সাধারণ মানুষের উপর চাপানো উচিত নয়।
অন্যদিকে কংগ্রেস মুখপাত্র ডলি শর্মা বলেন, “এখন মানুষ প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে পেট্রোল, ডিজেল ও রান্নার গ্যাসের নতুন দাম শুনছে।” তাঁর অভিযোগ, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কম থাকলেও দেশে জ্বালানির দাম কমানো হয়নি। বরং তেল সংস্থাগুলি বিপুল মুনাফা করেছে, কিন্তু সাধারণ মানুষ তার কোনও সুবিধা পায়নি।
তিনি বলেন, নেপালের মতো দেশ জ্বালানির দাম কমাচ্ছে, অথচ ভারতে বারবার দাম বাড়ানো হচ্ছে। নির্মাণ শ্রমিক, দিনমজুর ও পরিযায়ী শ্রমিকরা বাড়ি থেকে কাজ করতে পারেন না, অথচ তাঁদেরই বেশি দামে গ্যাস ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনতে হচ্ছে।
ডলি শর্মার দাবি, পরিবহণ খরচ বেড়ে যাওয়ায় দুধ, আটা, চাল, ডাল, ভোজ্যতেল ও সবজির দামও ব্যাপক বেড়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দুধের দাম তিন শতাংশ, আটা ও চালের দাম ১২.৫ শতাংশ, তুর ডালের দাম ১৫ শতাংশ এবং সবজির দাম ১০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
তিনি আরও বলেন, ট্যাক্সি, অটো ও পরিবহণ ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত বহু মানুষ ধর্মঘটে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। সংসারের বাজেট ভেঙে পড়ছে, ঋণের বোঝা বাড়ছে। লোকসভায় বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী সম্প্রতি এমন এক পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছেন, যাদের উপর ১১ লক্ষ টাকার ঋণের বোঝা রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
ডলি শর্মার অভিযোগ, সরকার শিল্পপতিদের হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ মকুব করেছে, অথচ সাধারণ মানুষের ভর্তুকি তুলে নিয়েছে। তাঁর মতে, লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় ধাক্কা খাচ্ছেন মধ্যবিত্ত, শ্রমজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষ।
উল্লেখযোগ্যভাবে, গত এক মাসে একাধিকবার পেট্রোল, ডিজেল, সিএনজি ও এলপিজির দাম বেড়েছে। ১ মে বাণিজ্যিক এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ৯৯৩ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়। পরে ১৫ মে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম লিটারপিছু তিন টাকা এবং সিএনজির দাম কেজিপিছু দুই টাকা বাড়ানো হয়। ১৮ মে ফের প্রায় ৯০ পয়সা করে পেট্রোল-ডিজেলের দাম বাড়ে এবং সিএনজি এক টাকা মহার্ঘ হয়। শনিবার দিল্লিতে পেট্রোলের দাম আরও ৮৭ পয়সা বেড়ে লিটারপিছু ৯৯.৫১ টাকা এবং ডিজেলের দাম ৯১ পয়সা বেড়ে ৯২.৪৯ টাকায় পৌঁছেছে।
হিন্দুস্থান সমাচার / সৌমি বৈদ্য