
ডঃ মায়াঙ্ক চতুর্বেদী
কলকাতা, ২৪ মে (হি.স.): পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাজ্য রাজনীতি ও অর্থনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের পতন এবং ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) ক্ষমতায় আসার পর এই রাজ্যে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আশার আলো দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের নীতিপঙ্গুত্ব, থমকে থাকা প্রকল্প এবং রাজনৈতিক কোন্দলের কারণে বিনিয়োগকারীদের মনে যে সংশয় তৈরি হয়েছিল, তা কাটছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
রাজ্যের অর্থনীতিকে গতিশীল করতে ইতিমধ্যেই বড় পদক্ষেপ নিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে নীতি আয়োগ পশ্চিমবঙ্গে শিল্পায়নের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা তৈরির কাজ শুরু করেছে।
তাজপুর বন্দর: পূর্ব ভারতের নতুন অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি
রাজ্যের এই রূপান্তরের সবচেয়ে বড় প্রতীক হয়ে উঠতে চলেছে ২৫ হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্প তাজপুর বন্দর। বিগত সরকারের আমলে বছরের পর বছর ধরে এটি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আর লাল ফিতের ফাঁসে আটকে ছিল। শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে নতুন সরকার আসার পর সেই তাজপুর বন্দর প্রকল্পটিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
ভবিষ্যতে এই বন্দরটি সমগ্র পূর্ব ভারতের অর্থনীতির ভোল বদলে দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাজপুর বন্দর চালু হলে বিশালাকৃতির আন্তর্জাতিক পণ্যবাহী জাহাজগুলি সরাসরি বাংলার উপকূলে নোঙর করবি। এর ফলে বাণিজ্যের খরচ এক ধাক্কায় অনেকটাই কমবে। পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক সংযোগও বাড়বে।
লজিস্টিকস ও সংযোগ ব্যবস্থায় বিশেষ নজর
তাজপুর বন্দরের পাশাপাশি নতুন সরকার রাজ্যের সড়ক, রেল এবং সামগ্রিক লজিস্টিকস নেটওয়ার্ক মজবুত করার ওপর জোর দিচ্ছে। এই বহুমাত্রিক সংযোগ ব্যবস্থা সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে তা কলকাতা ও হলদিয়া বন্দরের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমাবে। ফলে, পণ্য পরিবহন অনেক সহজ হবে এবং পশ্চিমবঙ্গ পূর্ব ভারতের বৃহত্তম লজিস্টিকস কেন্দ্রে পরিণত হবে।
নীতি আয়োগের নেতৃত্বে নতুন শিল্প রূপরেখা
রাজ্যের অর্থনৈতিক পুনরুত্থানের রূপরেখা তৈরির মূল দায়িত্ব মোদী সরকার অর্পণ করেছে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ তথা নীতি আয়োগের উপাধ্যক্ষ অশোক লাহিড়ির ওপর। পশ্চিমবঙ্গের শিল্পোন্নয়নের পরিকল্পনা নিয়ে তিনি জানান, বাংলার জন্য একটি ব্যাপক মাত্রায় ও দীর্ঘমেয়াদী ক্ষেত্রে শিল্প পরিকাঠামো প্রস্তুত করা হচ্ছে। উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি, মজবুত সরবরাহ ব্যবস্থা, আধুনিক পরিকাঠামো নির্মাণ, নদীভিত্তিক বাণিজ্যের প্রসার এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে। একইসঙ্গে ভারতের 'অ্যাক্ট ইস্ট' নীতির প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে কলকাতাকে পুনর্প্রতিষ্ঠা করার কৌশল নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, একসময় দেশের অন্যতম সমৃদ্ধ রাজ্য হিসেবে গণ্য হতো বাংলা। কিন্তু আজ শিল্পোৎপাদনের ক্ষেত্রে বাংলা তার পূর্বের অবস্থান থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে পড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে আমাদের লক্ষ্য হলো একে তার পূর্বের মর্যাদায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া।
'ডবল ইঞ্জিন' মডেল ও কর্ণাটক-গুজরাট থেকে শিক্ষা
ইলেকট্রনিক ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়া-র আইটি প্রোডাক্টস কমিটির চেয়ারম্যান মিতেশ লোকওয়ানি এই কেন্দ্র-রাজ্য সমন্বয়কে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, কেন্দ্রে ও রাজ্যে একই দল (বিজেপি) ক্ষমতায় থাকায় নীতিগত সামঞ্জস্য অনেক বাড়বে। এর ফলে থমকে থাকা পরিকাঠামো প্রকল্পগুলোয় দ্রুত গতির সঞ্চার করবে।
তিনি শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন সরকারকে একটি বিশেষ টাস্ক ফোর্স গঠনের পরামর্শ দিয়ে 'কর্ণাটক মডেল' এবং 'গুজরাট মডেল' অনুসরণের আহ্বান জানান।
'কর্ণাটক মডেল' থেকে শেখার পরামর্শ
মিতেশ লোকওয়ানি পরামর্শ দেন, কর্নাটক সরকার তার শিল্প ও উৎপাদন ক্ষেত্রকে উৎসাহিত করার জন্য একটি বিশেষ টাস্ক ফোর্স গঠন করেছিল। এই উদ্যোগটি অ্যারোস্পেস ও প্রতিরক্ষা (মহাকাশ প্রযুক্তি এবং ড্রোন সহ), ইলেকট্রনিক্স ও সেমিকন্ডাক্টর, রোবোটিক্স, অটোমোবাইল ও বৈদ্যুতিক যানবাহন (ইভি), কারিগরি ও কৃত্রিম তন্তু (এমএমএফ)-ভিত্তিক বস্ত্র শিল্প এবং ভোগ্যপণ্য (এফএমসিজি, জুতা এবং খেলনা সহ)-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলিতে বিশেষ মনোযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সফল হয়েছে। আজ বাংলায়ও একই ধরনের পন্থা অবলম্বন করা প্রয়োজন।
গুজরাটের শিল্প নীতি থেকে অনুপ্রেরণা গ্রহণ
মিতেশ লোকওয়ানি আরও উল্লেখ করেন, যে কাঠামোর জোরে গুজরাট আজ দেশের একটি প্রধান শিল্প কেন্দ্র এবং অগ্রদূত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, গুজরাটের সেই শিল্পনীতি থেকেও অনেক কিছু শেখা যেতে পারে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সুস্পষ্ট, সুনির্দিষ্ট নীতিই বিনিয়োগকারীদের কাছে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। বিনিয়োগকারীরা আশা করেন, প্রকল্পগুলো মাঝপথে বাধাপ্রাপ্ত হবে না এবং দীর্ঘমেয়াদী ক্ষেত্রে নীতি স্থিতিশীল থাকবে।
বরিষ্ঠ সাংবাদিক তথা হিন্দুস্থান সমাচার-এর কলকাতার ব্যুরো চিফ সন্তোষ মধুপ এক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ পেশ করেছেন। তাঁর মতে, রাজ্যে ক্ষমতা পরিবর্তনের পর থেকে রাজ্যবাসীর মধ্যেও ইতিবাচক পরিবর্তনের একটি আশা জেগেছে। এতে কোনও সন্দেহ নেই যে, এইসব প্রত্যাশা পূরণ করাই হবে শুভেন্দু অধিকারীর সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। তবে, বিগত চার-পাঁচ দশকে পূর্ববর্তী সরকারগুলোর আমলে রাজ্য শোচনীয় জায়গায় পোঁছে গিয়েছিল। তা থেকে রাজ্যকে উদ্ধার করতে ধারাবাহিকভাবে ও পদ্ধতিগত উপায়ে প্রচেষ্টার প্রয়োজন হবে। শিল্প, বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, এইসব ক্ষেত্রগুলিতে ব্যাপক সংস্কারের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি, তিনি কর্মসংস্কৃতির কথাও উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, ইতিবাচক বিষয় হলো, নতুন সরকার এই চ্যালেঞ্জগুলো সম্বন্ধে সম্পূর্ণভাবে অবগত এবং তা উপলব্ধিও করছে। শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের পরপরই শুভেন্দু অধিকারীর প্রশাসন যেভাবে একের পর এক বড় সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, তা থেকে এটা স্পষ্ট যে সরকারের দৃঢ় সংকল্প রয়েছে এবং বাংলার মানুষের মঙ্গলের জন্য কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে তারা দ্বিধা করে না। বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসা নতুন সরকার এবং এর নেতা শুভেন্দু অধিকারীকে অবশ্যই ভবিষ্যতে এই 'সাহসী ভাবমূর্তি' বজায় রাখতে হবে। তিনি আরও বলেন, সবকিছু সঠিক পথে এগোলে আগামী বছরগুলিতে বাংলা আবারও ভারতের শিল্প মানচিত্রে উজ্জ্বল হয়ে উঠতে পারে, যা উন্নয়নের নতুন পথ খুলে দেবে এবং বিনিয়োগের এক নতুন অধ্যায় রচনা করবে।
ট্রেড ইউনিয়ন ও ধর্মঘটের প্রভাব
একটা সময় ছিল যখন কলকাতা দেশের শিল্পের ভরকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু বাম আমলে ট্রেড ইউনিয়নের বাড়বাড়ন্ত এবং প্রায়শই ধর্মঘট শিল্পক্ষেত্রকে দুর্বল করে দেয়। পরবর্তীতে, সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামের মতো আন্দোলন বিনিয়োগকারীদের আস্থা তলানিতে নিয়ে যায়। টাটা মোটরসের ন্যানো প্রকল্প রাজ্য ছেড়ে চলে যাওয়া তারই একটা উদাহরণ। বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ এবং পুণের মতো শহরগুলি যখন আধুনিক পরিকাঠামো এবং গতিশীল স্টার্টআপ সংস্কৃতি নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন বাংলা নীতিগত জটিলতার মধ্যে আটকে থেকে পিছিয়ে পড়ছিল। ফলে, রাজ্য থেকে পুঁজি এবং প্রতিভা উভয়ই হাতছাড়া হয়।
রাজ্যের নতুন সরকার যেভাবে শুরুতেই দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে চলেছে, সবকিছু ঠিকঠাক চললে, দীর্ঘ খরা কাটিয়ে বাংলা আবারও ভারতের শিল্প মানচিত্রে তার পুরনো গৌরবময় স্থান ফিরে পাবে, এমনটাই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
অনুলিখন: সৌম্যজিৎ চক্রবর্তী
হিন্দুস্থান সমাচার / সৌম্যজিৎ