এফএম নেটওয়ার্কের সম্প্রসারণই আকাশবাণীর অগ্রাধিকার: রাজীব কুমার জৈন
এমন এক সময় ছিল, যখন খেত-খামার থেকে শুরু করে ঘর এবং দফতর পর্যন্ত আকাশবাণীর সুরই প্রতিধ্বনিত হতো। তখন মনে হতো সঙ্গীতের লহরীতে পুরো দেশ মেতে উঠেছে। যখন কোনও সংবাদ বা বার্তা প্রচারিত হতো, তখন মনে করা হতো এই বার্তার মাধ্যমে পুরো দেশকে সম্বোধন করা হচ্ছে
আকাশবাণীর মহানির্দেশক রাজীব কুমার জৈন


এমন এক সময় ছিল, যখন খেত-খামার থেকে শুরু করে ঘর এবং দফতর পর্যন্ত আকাশবাণীর সুরই প্রতিধ্বনিত হতো। তখন মনে হতো সঙ্গীতের লহরীতে পুরো দেশ মেতে উঠেছে। যখন কোনও সংবাদ বা বার্তা প্রচারিত হতো, তখন মনে করা হতো এই বার্তার মাধ্যমে পুরো দেশকে সম্বোধন করা হচ্ছে। আকাশবাণী তার এযাবৎকালের যাত্রায় সংবাদ এবং তথ্য প্রদান করেছে। সংকটের মুহূর্তে রাষ্ট্রকে সতর্কও করেছে। চাষবাস থেকে শুরু করে শিক্ষা জগতের প্রয়োজনীয় ও লাভজনক তথ্য যেমন দিয়েছে, তেমনই মানুষের বিনোদনের মাধ্যমও হয়েছে। নিজের সহজলভ্যতা এবং প্রযুক্তির মাধ্যমে দেশের প্রতিটি শ্রেণী ও বিভিন্ন বয়সের মানুষের জন্য আকাশবাণীর সুর আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।

আকাশবাণী ৮ জুন, ১৯৩৬ সালে প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই দেশের হৃদস্পন্দন হয়ে রয়েছে। এই আকাশবাণীই ৮ জুন, ২০২৬-এ তার গৌরবময় যাত্রার ৯০ বছর পূর্ণ করতে চলেছে। এক কথায়, আকাশবাণী আমাদের ৯০ বছরের পথচলার সঙ্গী। এই উপলক্ষে 'হিন্দুস্থান সমাচার' আকাশবাণীর মহানির্দেশক রাজীব কুমার জৈনের বিশেষ সাক্ষাৎকার নিয়েছে। সঞ্জীব কুমারের সঙ্গে সেই কথোপকথনের প্রধান অংশগুলি :

আকাশবাণীর ৯০ বছরের গৌরবময় যাত্রার জন্য আপনাকে অভিনন্দন। আকাশবাণী এ পর্যন্ত অনেক মাইলফলক পার করেছে। এই বিশেষ মুহূর্তে আপনি কী বলতে চাইবেন?

মহানির্দেশক: অভিনন্দন আপনাকেও। আকাশবাণীকে এই অবস্থানে পৌঁছে দেওয়ার পেছনে আমাদের প্রোগ্রাম প্রডিউসার, টেকনিশিয়ান এবং ইঞ্জিনিয়ারদের পাশাপাশি এর সঙ্গে যুক্ত থাকা প্রতিটি মানুষের অবদান রয়েছে। তবে আমাদের প্রতিভাবান ও যোগ্য ইঞ্জিনিয়ার, টেকনিশিয়ান তাঁরা সকলেই দেশকে তথ্যসমৃদ্ধ করতে, মনোরঞ্জন করতে এবং আমাদের সঙ্গীত, গান ও বাদ্যযন্ত্রের মতো শিল্পকলার সঙ্গে বিশ্বকে পরিচিত করতে এক বিরাট ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁরা এই সমস্ত কিছু দেশের জন্য করেছেন, দেশের মানুষের জন্য করেছেন। তাই আকাশবাণীর এই ৯০ বছরের যাত্রা শুধু আকাশবাণী, প্রসার ভারতী বা এর কর্মচারী, কর্মকর্তা, প্রযুক্তিবিদ ও অনুষ্ঠান নির্মাতাদের জন্যই গর্বের মুহূর্ত নয়, বরং এটি পুরো দেশের জন্য এক গৌরবের বিষয়। সবচেয়ে বড় কথা হলো, দেশের মানুষও আকাশবাণীকে নিজেদের পথচলার সঙ্গী হিসেবে মেনে নিয়েছে, একে ভালোবেসেছে এবং প্রশংসা করেছে। মানুষের এই ভালোবাসার কারণেই আমরা আজ এই পর্যায়ে পৌঁছাতে পেরেছি।

আকাশবাণীর ৯০ বছরের যাত্রাকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

মহানির্দেশক: ৯০ বছর আগে যখন ভারতের পরিধিতে 'অল ইন্ডিয়া রেডিও' হিসেবে রেডিওর আগমন ঘটে, তখন এটি ছিল একটি সম্পূর্ণ নতুন মাধ্যম। ৮ জুন, ১৯৩৬ সালে যখন এটি প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন এটি 'অল ইন্ডিয়া রেডিও' নামেই পরিচিত ছিল। ১৯৫৬ সালে পণ্ডিত নরেন্দ্র শর্মার পরামর্শে এর নাম রাখা হয় 'আকাশবাণী'। যখন 'অল ইন্ডিয়া রেডিও' প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তখন আজকের মতো সংবাদপত্রগুলি এত ঝকঝকে ছিল না এবং তাদের মুদ্রণও আজকের মতো আকর্ষণীয় ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে মূলত প্রযুক্তি-নির্ভর রেডিও মাধ্যমের আগমন মানুষের কাছে প্রথমে কৌতূহলের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। যখন এর মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের ঘর, দফতর, খেত-খামার পর্যন্ত কণ্ঠস্বর পৌঁছাতে শুরু করল, তখন মানুষ একে দারুণভাবে স্বাগত জানাল। প্রথমে রেডিওর মাধ্যমে তথ্য ও সংবাদ দেওয়া হতো, কিন্তু ধীরে ধীরে রেডিওতে গান-বাজনা এবং নাটকের মতো অনুষ্ঠান সম্প্রচারিত হতে শুরু করে। শুরুতে রেডিও সেটগুলি বেশ বড় ছিল, তাই সবার পক্ষে সেগুলি কেনা কঠিন ছিল। শুরুর দিকে রেডিওর জন্য লাইসেন্স ফিও লাগত। প্রথম দিকে রেডিও সম্প্রচার এবং অনুষ্ঠান তৈরির প্রযুক্তিও ছিল বেশ জটিল। তা সত্ত্বেও, যেহেতু এই মাধ্যমটি নতুন ছিল এবং নতুন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা উদ্ভাবনীও ছিল, তাই মানুষের মধ্যে এর আকর্ষণ বাড়তে থাকে। এরপর ধীরে ধীরে সম্প্রচার এবং রিসিভার প্রযুক্তির উন্নতি হয়, সাশ্রয়ী মূল্যের ট্রানজিস্টর জনসাধারণের জন্য সহজলভ্য হয়ে ওঠে। মানুষ আকাশবাণীকে সাদরে গ্রহণ করে। দেখতে দেখতে রেডিও দেশের হৃদস্পন্দনে পরিণত হয়।

আকাশবাণীতে গান-বাজনা থেকে শুরু করে সংবাদ পর্যন্ত প্রচুর অনুষ্ঠান সম্প্রচারিত হয়। এই সম্প্রচার এবং বিষয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে আপনাদের নীতি কী?

মহানির্দেশক: আকাশবাণীর মূল মন্ত্র হলো 'বহুজন হিতায়, বহুজন সুখায়', অর্থাৎ সর্বাধিক মানুষের হিত এবং সর্বাধিক মানুষের সুখের জন্য। আকাশবাণীর উদ্দেশ্য হলো সমাজের সর্বাধিক মানুষের স্বার্থ ও আনন্দকে মাথায় রেখে সম্প্রচার করা। অনুষ্ঠান গান-বাজনার হোক বা সংবাদের, সবকিছুর পেছনেই এই ভাবনা কাজ করে। সংবাদের ক্ষেত্রে আকাশবাণীর লক্ষ্য হলো, তাড়াহুড়ো করে ভুল খবর দেওয়ার চেয়ে সঠিক ও নির্ভুল সংবাদ সম্প্রচার করা। সংবাদ নির্বাচনের সময় আমরা সবসময় এই বিষয়টি মাথায় রাখি। যতক্ষণ না কোনও সংবাদের সত্যতা নিশ্চিত হচ্ছে, ততক্ষণ আকাশবাণী তা সম্প্রচার করে না। এই নির্ভরযোগ্যতাই আমাদের বৈশিষ্ট্য। প্রতিটি সম্প্রচারেই আমরা এই বিষয়টির প্রতি খেয়াল রাখি।

আজ আমরা ইন্টারনেটের যুগে বাস করছি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যোগাযোগ মাধ্যমের বিবর্তন ঘটছে। এমন পরিস্থিতিতে আকাশবাণী নিজের প্রাসঙ্গিকতা বজায় রাখার জন্য কী করছে?

মহানির্দেশক: যেহেতু রেডিও একটি অত্যন্ত সহজলভ্য মাধ্যম, তাই এর সাহায্যে তথ্য দ্রুত প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। এই কারণে আজও যেকোনও জরুরি পরিস্থিতিতে এটিই সবচেয়ে সহজ মাধ্যম। আমি বলতে পারি, এটাই আকাশবাণীর আসল শক্তি। আজ ইন্টারনেটের রমরমা। ইন্টারনেটের সমন্বয়ের মাধ্যমে আজ সংবাদপত্র, রেডিও এবং টিভি— সব মাধ্যমই উপলব্ধ। রেডিওর কথা বললেই আমাদের সামনে শুধু একটি কণ্ঠস্বর-কেন্দ্রিক মাধ্যমের ছবি ভেসে ওঠে। আকাশবাণী এখনও প্রচলিত প্রযুক্তিতে রেডিও সেটের মাধ্যমে উপলব্ধ রয়েছে। তবে যোগাযোগ মাধ্যমের বিবর্তনের সঙ্গে এটি এখন নতুন রূপেও হাজির হয়েছে। এখন আকাশবাণী পডকাস্টও করছে। আকাশবাণী এখন ইন্টারনেট প্ল্যাটফর্মেও পাওয়া যাচ্ছে। প্রচলিত অডিও মাধ্যম হিসেবে থাকার পাশাপাশি এটি টুইটার, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ইত্যাদির মতো সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টগুলিতেও সক্রিয় রয়েছে। এর সঙ্গে ইউটিউবেও আমাদের চ্যানেলগুলি আছে। সব জায়গাতেই রেডিওর সম্প্রচার হচ্ছে। অবশ্য এই সমস্ত সম্প্রচার প্রথাগত রেডিও সম্প্রচারের মতো নয়, আবার তা থেকে আলাদাও নয়। প্রথাগত সম্প্রচারে কেউ একবার কোনও বার্তা শুনতে না পারলে, তা আবার শোনা কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু ইন্টারনেটের গতি এবং সমাজ মাধ্যমের প্ল্যাটফর্মের কল্যাণে নির্ধারিত সময়ে প্রচারিত সংবাদ ও অনুষ্ঠানগুলি পরেও শোনা সম্ভব হচ্ছে। এখন তো আমাদের 'নিউজ অন এআইআর' অ্যাপের মাধ্যমে আপনি আকাশবাণীর প্রায় সমস্ত চ্যানেল শুনতে পারবেন। বর্তমানে আকাশবাণী দেশের ২৩টি ভাষা এবং ১৮৩টি উপভাষায় নিরবিচ্ছিন্নভাবে সম্প্রচার করে যাচ্ছে। এর পাশাপাশি, বিদেশ সেবা বিভাগ ১৬টি বিদেশি এবং ১১টি ভারতীয় ভাষায় সম্প্রচার করছে।

এই পরিবর্তনশীল সময়ে প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে আকাশবাণীকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আপনার পরিকল্পনা কী?

মহানির্দেশক: আমাদের মূল চেষ্টা হলো এফএম নেটওয়ার্কের সম্প্রসারণ, স্টুডিওগুলির আধুনিকীকরণ এবং সম্পদের সঠিক ব্যবহার করা। গত বছর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগের মাধ্যমে রেডিও স্টেশনগুলিকে আঞ্চলিক চ্যানেল হিসেবে পুনর্গঠন করা হয়েছে। সেই সঙ্গে আঞ্চলিক চ্যানেলের প্রধানদের প্রশাসনিক ও আর্থিক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে প্রশাসনিক ও আর্থিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো রেডিও স্টেশনগুলিকে স্থানীয় চাহিদা অনুযায়ী অনুষ্ঠান তৈরির ক্ষেত্রে আরও বেশি স্বায়ত্তশাসন দেওয়া, যাতে আঞ্চলিক চ্যানেলগুলি স্থানীয় মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারে এবং আর্থিকভাবে আরও স্বাবলম্বী হতে পারে।

এছাড়া আকাশবাণীর কাছে অডিওর এক অত্যন্ত সমৃদ্ধ ভাণ্ডার রয়েছে, যার মধ্যে বহু বিখ্যাত শিল্পীর সঙ্গীতের রেকর্ডিং, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার এবং দেশের ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর ধারাভাষ্য অন্তর্ভুক্ত। এই পুরো সংগ্রহটিকে ডিজিটাল করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর পাশাপাশি ইউটিউব, ওয়েব এবং ওটিটি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে।

হিন্দুস্থান সমাচার / সৌম্যজিৎ




 

 rajesh pande