


তেজপুরে প্রথম উন্নত জাতের লিচুর চারা রোপণকারী সাহিত্য-কাণ্ডারী পদ্মনাথ গোহাঞি বরুয়ার প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ
– লিচু বিষয়ক তথ্যচিত্র প্রদর্শন, লিচু প্রদর্শনী ও বিক্রয়, এবং ‘খাদ্য প্রযুক্তি ও লিচু’ শীর্ষক বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন
– উন্মোচ্ত লিচু বিষয়ক একটি স্মরণিকা
– ১০ জন লিচু চাষিকে সংবর্ধনা
– লিচু ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে সংশ্লিষ্ট বিভাগকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ সাংসদ রঞ্জিত দত্তের
– তেজপুরে ‘ঘরে ঘরে লিচু’ কর্মসূচির অধীনে ২০ হাজার পরিবারের মধ্যে দুটি করে লিচুর চারা বিতরণের ঘোষণা বিধায়ক পৃথ্বীরাজের
– বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে লিচু চাষকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার আহ্বান তেজপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সম-উপাচার্য অধ্যাপক অমরেন্দ্র কুমার দাসের
তেজপুর (অসম), ৬ জুন (হি.স.) : তেজপুরের সুস্বাদু, মিষ্টি ও রসালো লিচুকে কেন্দ্র করে শনিবার সকাল থেকে সমগ্র তেজপুরে উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে পরিচিতি লাভকারী তেজপুরের বিশ্ববিখ্যাত লিচুর প্রচার-প্রসার, নতুন প্রজন্মকে লিচু চাষে উৎসাহিত করা, জিআই স্বীকৃতি লাভের পর কৃষকদের জন্য সরাসরি বাজার সংযোগ স্থাপন এবং প্রগতিশীল কৃষক ও কৃষি উদ্যোক্তাদের সম্মান জানানোর উদ্দেশ্যে তেজপুরে দু-দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য কর্মসূচির মাধ্যমে শুরু হয়েছে দ্বিতীয় বার্ষিক ‘তেজপুর লিচু উৎসব’।
তেজপুর জেলা গ্রন্থাগার প্রেক্ষাগৃহ, গ্রন্থাগার প্রাঙ্গণ এবং আনন্দচন্দ্র আগরওয়ালা উদ্যানে অনুষ্ঠিত এই উৎসবে ৫০ জনের বেশি প্রদর্শক, প্রায় ৩০ জন চাষি ও উৎপাদক সংগঠন এবং বহু দেশি-বিদেশি ক্রেতা অংশগ্রহণ করেন।
শোণিতপুর জেলা প্রশাসন, জেলা কৃষি বিভাগ, তেজপুর কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্র, তেজপুর বিশ্ববিদ্যালয়, অসম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ভারতীয় সেনাবাহিনীর চতুর্থ কর্পস, ভারতীয় ডাক বিভাগ, এপেডা, শোণিতপুর জেলা রেডক্রস সোসাইটি, নাবার্ড, এক্সিস ব্যাংক, আইসিএআর সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় আয়োজিত এই উৎসবের সূচনা হয় তেজপুরে উন্নত জাতের লিচুর প্রথম রোপণকারী সাহিত্য-কাণ্ডারী পদ্মনাথ গোহাঞি বরুয়ার প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন এবং প্রদীপ প্রজ্বলনের মাধ্যমে।
সাহিত্য-কাণ্ডারীর নাতি উদয়কৃষ্ণ গোহাঞি বরুয়া, সঞ্জয়কৃষ্ণ গোহাঞি বরুয়া এবং তিনজন লিচু চাষির উপস্থিতিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি অনুষ্ঠানের সূচনা করেন শোণিতপুরের জেলাশাসক ও উদযাপন কমিটির সভাপতি আনন্দকুমার দাস।
এর পর জেলা গ্রন্থাগার প্রেক্ষাগৃহে শুরু হয় ‘তেজপুর লিচু উৎসব-২০২৬’-এর উদ্বোধনী অধিবেশন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন তেজপুরের বিধায়ক পৃথ্বীরাজ রাভা, তেজপুরের পুরপতি রমেন তামুলি, তেজপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সভাপতি বিশ্বদেব ভট্টাচার্য, জেলা কৃষি আধিকারিক প্রদীপ তালুকদার, মহকুমা কৃষি আধিকারিক ড. জাকির হুসেন সহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।
কিশোর বেহালাবাদক শিবমের পরিবেশিত একটি বড়গীত দিয়ে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুরু হয়। স্বাগত ভাষণে জেলাশাসক আনন্দকুমার দাস জানান, ১৯২৩ সালে তৎকালীন তেজপুরের পুরপতি সাহিত্য-কাণ্ডারী পদ্মনাথ গোহাঞি বরুয়া বহিঃরাজ্য থেকে উন্নত জাতের লিচুর চারা এনে তেজপুরে লিচু চাষের যে সূচনা করেছিলেন, তার শতবর্ষ পূর্তির পর গত বছর প্রথম লিচু উৎসব অনুষ্ঠিত হয় এবং সেই ধারাবাহিকতায় এবার দ্বিতীয় বর্ষের উৎসব আয়োজন করা হয়েছে।
উদযাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক পঙ্কজ বরুয়া এবং জেলা তথ্য ও জনসংযোগ আধিকারিক অঙ্কিতা গগৈ পরিচালিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শোণিতপুরের সাংসদ রঞ্জিত দত্ত। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তেজপুরের বিধায়ক পৃথ্বীরাজ রাভা। সম্মানিত অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ করেন তেজপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সম-উপাচার্য অধ্যাপক অমরেন্দ্র কুমার দাস। এছাড়া বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অসম সরকারের উদ্যানপালন বিভাগের অধিকর্তা নৃপেনচন্দ্র দাস, সশস্ত্র সীমা বল (এসএসবি)-এর তেজপুর ফ্রন্টিয়ারের মহাপরিদর্শক বিশ্বজিৎকুমার পাল, এপেডা অসমের আঞ্চলিক প্রধান সন্দীপ সাহা, ডাক বিভাগের দরং ডিভিশনের অধীক্ষক সমীরচন্দ্র দাস, তেজপুরের পুরপতি রমেন তামুলি এবং নাবার্ড-এর মুখ্য মহাপ্রবন্ধক লোকেন দাস।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. ভূপেন শইকিয়ার সম্পাদনায় প্রকাশিত তেজপুরের লিচু বিষয়ক একটি গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করেন অতিথিরা। একইসঙ্গে তেজপুর লিচু মহোৎসব উপলক্ষ্যে ডাক বিভাগের একটি বিশেষ কভারও প্রকাশ করা হয়।
অনুষ্ঠানে ১০ জন লিচু চাষিকে বিশেষভাবে সংবর্ধনা জানানো হয়। তাঁরা যথাক্রমে শরৎ চন্দ্র শইকিয়া, কৌশিক নেওগ, আব্দুল জলিল, প্রেমসাগর চৌধুরী, রামনারায়ণ সিং, বীণা স্বর্গিয়ারী, সমীর আলি, রাজু সাহানি, ধীরাজ কুমার সিং এবং সুভাষ সিং। পাশাপাশি ভারতীয় সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে কয়েকজন এনসিসি ক্যাডেটকে লিচুর চারা বিতরণ করা হয়।
প্রধান অতিথির ভাষণে সাংসদ রঞ্জিত দত্ত বলেন, তেজপুরের লিচুর মতো স্বাদযুক্ত লিচু আর কোথাও পাওয়া যায় না। সাহিত্য-কাণ্ডারী পদ্মনাথ গোহাঞি বরুয়ার দূরদর্শী উদ্যোগে রোপিত এই লিচু আজ জাতীয় পর্যায়ে বিশেষ মর্যাদা লাভ করেছে, যা আমাদের জন্য গর্বের বিষয়। তিনি লিচু চাষিদের বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে সরকার ও প্রশাসনকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
ভাষণের মধ্যে তিনি কয়েকজন লিচু চাষিকে মঞ্চে ডেকে তাঁদের সমস্যার কথা শোনেন এবং কৃষি ও উদ্যানপালন বিভাগের কর্মকর্তাদের দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন।
তেজপুরের বিধায়ক পৃথ্বীরাজ রাভা জানান, লিচু চাষের প্রসারের লক্ষ্যে ‘ঘরে ঘরে লিচু’ শীর্ষক একটি বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। এই প্রকল্পের অধীনে ২০ হাজার পরিবারের মধ্যে দুটি করে উন্নত জাতের লিচুর চারা বিতরণ করা হবে। এর জন্য ৫২ লক্ষ টাকা ব্যয় করা হবে। এই কর্মসূচির শুভ সূচনা করবেন মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্তবিশ্ব শর্মা।
তেজপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সম-উপাচার্য অধ্যাপক অমরেন্দ্র কুমার দাস বলেন, লিচুর চারা রোপণ থেকে শুরু করে উৎপাদন ও বিপণন পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ও পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চাষিদের বাণিজ্যিকভাবে সফল করে তুলতে সংশ্লিষ্ট সরকারি বিভাগগুলোর আরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন বলেও তিনি মত প্রকাশ করেন।
লিচু বিষয়ক একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শনের পর সাংসদ রঞ্জিত দত্ত অন্যান্য অতিথিদের সঙ্গে লিচু প্রদর্শনী ও বিক্রয়কেন্দ্রের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনের পর হাজার হাজার মানুষের ভিড় জমে প্রদর্শনী ও বিক্রয়স্থলে।
এর পর ‘এলসিসার ইমপ্যাক্ট’-এর প্রধান সমন্বয়ক ও বিশিষ্ট উদ্যোক্তা অনুজ শর্মা, তেজপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সম-উপাচার্য অধ্যাপক অমরেন্দ্র কুমার দাস এবং ‘মধুর ফুড প্রোডাক্টস’-এর স্বত্বাধিকারী অমৃত মাধুরী দেবীর অংশগ্রহণে লিচু শিল্পের সম্ভাবনা নিয়ে একটি বিশেষ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
পরে লিচু চাষ বিষয়ক একটি কারিগরি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এতে তেজপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. জুরি বরবরা, শিল্পপতি হেমন্ত লহকর, উদ্যোক্তা কৃষ্ণকান্ত বরা, কৃষি বিজ্ঞানী ড. অঙ্গনা শর্মা এবং পর্যটন বিভাগের অধ্যাপক ড. নিরঞ্জন দাস বিশেষজ্ঞ হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। বিভিন্ন জেলার কৃষি বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞরাও এতে অংশ নেন।
লিচু উৎসব উপলক্ষ্যে তেজপুরে ব্যাপক জনসমাগম হয়ে। জিআই ট্যাগপ্রাপ্ত তেজপুরের বিখ্যাত লিচুকে কেন্দ্র করে এমন ফলভিত্তিক উৎসব অসমে এই প্রথম অনুষ্ঠিত হচ্ছে। যে লিচু সমগ্র দেশে তেজপুরকে পরিচিতি দিয়েছে, সেই লিচুকেই কেন্দ্র করে দু-দিনব্যাপী এই উৎসব আয়োজন করা হয়েছে।
উৎসবের প্রথম দিন কলকাতার একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দুবাইয়ে এক টন বোম্বাইয়া, পিয়াজি এবং অন্যান্য জাতের লিচু রফতানি করা হয়েছে। একইভাবে পরের দিন সিঙ্গাপুরে পাঁচ কুইন্টাল লিচু রফতানি করা হবে।
এপেডা এই উৎসবে লিচুর চিপস প্রস্তুত করেছে, যা দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায় এবং স্বাদও অক্ষুণ্ণ থাকে। এতে কোনও ধরনের রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করা হয়নি।
মেলায় বিভিন্ন প্রজাতির লিচু প্রদর্শিত হয়েছে। বোম্বাইয়া জাতের একটি লিচুর দাম ৫০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। অন্যদিকে উন্নত জাতের একটি লিচুর চারার মূল্য প্রায় ১ হাজার টাকা। আয়োজকদের আশা, এই উৎসব তেজপুরের লিচুর প্রসার, আন্তর্জাতিক বাজারে এর চাহিদা বৃদ্ধি এবং কৃষকদের আর্থিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
হিন্দুস্থান সমাচার / সমীপ কুমার দাস