



- ‘অর্ধসত্য সংবাদ ভুলের চেয়েও ভয়ংকর..., 'গোদি সাংবাদিক'রা সত্য ঘটনা চেপে যায়’
- ‘ভুট্টো তাঁর একটি বইয়ে লিখেছেন, ‘...কেবল কাশ্মীরকে নিয়ে ভাবলে হবে না, আসামকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।...’
- দেশের প্রথম গণ-নিগ্রহের শিকার সাভারকর পরিবার
গুয়াহাটি, ৭ জুন (হি.স.) : অসমে জনবিন্যাসের পরিবর্তন এক সুপরিকল্পিত সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র। মহম্মদ আলি জিন্নার হাতে অসমকে তুলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন কথিত ‘বরাকের রূপকার মইনুল হক চৌধুরী’, বলেছেন দিল্লি দূরদর্শন কেন্দ্রের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ও সাংবাদিক প্রখর শ্রীবাস্তব।
আজ রবিবার গুয়াহাটির বড়বাড়ি ভিআইপি রোডে অবস্থিত রাষ্ট্ৰীয় স্বয়ংসেবক সংঘের সদর কাৰ্যালয় ‘সুদর্শনালয়’-এর ‘কৰ্মযোগী গৌরীশংকর প্রেক্ষাগৃহ’-এ বিশ্ব সংবাদ কেন্দ্র অসম আয়োজিত ‘দেবর্ষি নারদ জয়ন্তী’র অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য পেশ করছিলেন বিশিষ্ট সাংবাদিক প্রখর। তিনি বলেন, সাংবাদিকতায় ভুলের চেয়েও বড় বিপদ হলো অর্ধসত্যের প্রচার ও বিচার।
সাম্প্রিতিককালে এবং অতীতে সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন ঘটনাবলির প্রকৃত সংবাদ প্রকাশ না করে ভুল সংবাদ প্রচার করা হয়। এ সবের তথ্যসমৃদ্ধ ব্যাখ্যা করে বক্তব্য পেশ করেছেন প্রখর শ্রীবাস্তব। প্রসঙ্গক্রমে শতবর্ষ উদ্যাপনকারী আরএসএস-এর স্বয়ংসেবক-কার্যকর্তাদের নানা সময় পরিচালিত বিভিন্ন কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তাৎপর্যপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন বক্তা।
তিনি বলেন, ‘বর্তমান পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সংবাদমাধ্যম সংঘের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করলেও অতীতে তা ছিল বিরল। ১৯২৫ সালে প্রতিষ্ঠিত সংঘ যখন সংবাদমাধ্যমের সামান্য মনোযোগ পাচ্ছিল, তখনই দেশ বিভাজনের মুখোমুখি হয়। সেই সময় পাকিস্তানের সিন্ধ প্রদেশের প্রবীণ কংগ্রেস নেতারাও ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। অন্যদিকে সিন্ধে সংঘের স্বয়ংসেবকরা মৌলবাদীদের আক্রমণের শিকার হিন্দু, শিখ সহ বহু মানুষকে রক্ষার জন্য জীবন বাজি রেখেছিলেন।’
স্বাধীনতার পর তদানীন্তন প্রতিরক্ষামন্ত্রী সর্দার বলদেব সিং কর্তৃক গৃহমন্ত্রী সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলকে লেখা একটি চিঠির উল্লেখ করে শ্রীবাস্তব বলেন, দেশভাগের পর পাকিস্তানে বিপদাপন্ন মানুষদের উদ্ধারে সংঘের প্রচেষ্টাকে সরকারিভাবে সহযোগিতা করার আহ্বান জানানো হয়েছিল। সেই চিঠিটি মন্ত্রিসভায় উত্থাপনের পরামর্শ দিয়েছিলেন প্যাটেল। তবে এ ধরনের পদক্ষেপ দুর্ভাগ্যবশত প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর মনে সংঘের প্রতি বিরূপ মনোভাব সৃষ্টি করেছিল।
শ্রীবাস্তব বলেন, ‘মূলত গান্ধী হত্যার অভিযোগে নয়, পাকিস্তানে সংঘের উদ্ধারকাজে অসন্তুষ্ট হয়েই নেহরু সংঘের গতিবিধি রুখতে আরএসএস-এর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন। তাছাড়া নেহেরু-লিয়াকত চুক্তির বিরোধিতা করে আরএসএস-এর মুখপত্র অর্গানাইজার-এ ধারাবাহিক সম্পাদকীয় লিখেছিলেন তদানীন্তন সম্পাদক কেআর মালকানি। এতে আরও রুষ্ট হয়ে যান জওহরলাল।’
সাংবাদিক প্রখর শ্রীবাস্তব বলেন, যাকে বাক-স্বাধীনতার পুরোধা বলা হয়, সেই জওহরলাল নেহরু সংবাদপত্রের মুখ বন্ধ করতে আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৫১ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বলে, ‘এ ধরনের বিষয়ের ওপর সম্পাদকীয় লেখার স্বাধীনতা সংবাদপত্রের আছে।’ সুপ্রিম কোর্টের রায় বেরনোর পর জরুরি ভিত্তিতে বিশেষ অধিবেশন ডেকে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৯০-এ পরিবর্তন এনে সংবাদপত্রে বাক-স্বাধীনতার ওপর লাগাম টানেন নেহরু। এটা ছিল ভারতের প্রথম সংবিধান সংশোধনের কাজ।
তিনি আরও বলেন, ‘স্বাধীন ভারতে গান্ধী হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে প্রথম গণ-নিগ্রহের (মব লিংচিং) ঘটনা ঘটেছিল। এই গণ-নিগ্রহ সংঘটিত করেছিল তথাকথিত একাংশ গান্ধীবাদী। এর প্রথম শিকার ছিলেন বীর সাভারকরের ভাই ড. নারায়ণ সাভারকর। তাই বীর সাভারকরের পরিবারই ছিল দেশের প্রথম গণ-নিগ্রহের মূল্য প্রদানকারী পরিবার।’
সাংবাদিক শ্রীবাস্তব বলেন, ‘অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মা যখন রাজ্যের জনবিন্যাস সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করেন, তখন তাঁকে বলা হয় সাম্প্রদায়িক।’ সরকারি রেকর্ডের উদ্ধৃতি দিয়ে উপস্থিত দর্শক-শ্রোতাদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনারা জানেন কি না জানি না, ১৯৩৫ থেকে আজ পর্যন্ত ৪৫ বার মুসলমান জনসংখ্যা বেড়েছে, বিপরীতে নয় (৯) বার হিন্দুদের। গোপীনাথ বরদলৈ না থাকলে অসম আজ পূর্ব পাকিস্তানের (অধুনা বাংলাদেশ) অংশ থাকত।’ এ সম্পর্কে গোপীনাথ বরদলৈ কেন্দ্রের সঙ্গে কতটা দরবার করেছিলেন সে সব ইতিহাসের বর্ণনা দিয়েছেন বক্তা। এছাড়া ইন্দিরা গান্ধীর বসংবদ কংগ্রেস নেতা দেবকান্ত বরুয়ার কৰ্মকাণ্ড সম্পৰ্কেও কিছু তথ্য দিয়েছেন তিনি।
সাংবাদিক শ্ৰীবাস্তব বলেন, ‘অসমের জনবিন্যাস পরিবর্তনের মূল ষড়যন্ত্রী ছিলেন সাদুল্লা। সাদুল্লার আমল থেকে শুরু হয় অবৈধ অভিবাসন। তাঁর পথপ্ৰদৰ্শক মইনুল হক চৌধুরী এবং ফখরুদ্দিন আলি আহমেদের সুদূরপ্রসারি সক্রিয় ভূমিকায় অসমের জনবিন্যাসের এত পরবর্তন হয়েছে।’
প্রখর শ্রীবাস্তব বলেন, ‘আপনারা যাকে বরাকের রূপকার বলেন, সেই মইনুল হক চৌধুরী কিছুদিন মহম্মদ আলি জিন্নার ব্যক্তিগত সচিব ছিলেন। তিনি জিন্নাকে প্ৰতিশ্ৰুতি দিয়েছিলেন, অসমকে তাঁর তুলে দেবেন বলে। তাঁর বপন করা বীজ আজ ফলেফুলে পূৰ্ণতা পাচ্ছে।’
প্ৰাসঙ্গিক বক্তব্যে তিনি জুলফিকার আলি ভুট্টোকেও টেনে এনেছেন। ভুট্টোর লেখা একটি বইয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, বইয়ে জুলফিকার লিখেছেন, ‘কেবল কাশ্মীরকে নিয়ে ভাবলে হবে না, আসামকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।...’
এ সব নানা বিষয় উত্থাপন করে বক্তা বলেন, এ সব ঘটনা 'গোদি সাংবাদিক'রা জনসমক্ষে আনে না, চেপে যায় বলে খেদ ব্যক্ত করেছেন প্রখর শ্রীবাস্তব।
এদিকে বিশ্ব সংবাদ কেন্দ্র অসমের উদ্যোগে আয়োজিত নারদ জয়ন্তী অনুষ্ঠানে এবারও প্রদান করা হয়েছে ‘দেবর্ষি নারদ পুরস্কার’ ও বিশেষ সংবর্ধনা। এবারের ‘দেবর্ষি নারদ পুরস্কার’ প্রদান করা হয়েছে প্রবীণ সাংবাদিক এবং ‘ঈশান দর্পণ’-এর সম্পাদক নব ঠাকুরিয়াকে। পাশাপাশি তিনজন তরুণ সাংবাদিক যথাক্রমে এনকে টিভির জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক লক্ষ্যজ্যোতি গোহাঁই, প্রথম খবর-এর চিফ রিপোর্টার রঞ্জিতা রাভা এবং দৈনিক অসমের সহ-সম্পাদক মৃদুল হালৈকে নারদ জয়ন্তীর বিশেষ সংবর্ধনা প্রদান করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে নব ঠাকুরিয়াকে ৫০ হাজার টাকার চেক এবং বইয়ের সম্ভার সহ ‘দেবর্ষি নারদ পুরস্কার’ প্রদান করা হয়। এছাড়া সংবর্ধিত তিন সাংবাদিককে প্রদান করা হয় পাঁচ হাজার টাকার চেক সহ সবাইকে ফুলাম গামোছা, চেলেং-চাদর, মানপত্র, ভারতমাতার ছবি এবং বইয়ের সম্ভার।
পুরস্কার গ্রহণ করে ঠাকুরিয়া বলেন, প্রশ্ন উত্থাপন ও গঠনমূলক পরামর্শের মাধ্যমে গ্রহণযোগ্যতা অর্জনকারী নারদ আজও সাংবাদিকতার অনুপ্রেরণা। তিনি আরও বলেন, পৌরাণিক চরিত্র নারদের গ্রহণযোগ্যতা বর্তমান সাংবাদিকতার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
ঠাকুরিয়া বলেন, বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক সাংবাদিকতার ব্যক্তি-কেন্দ্রিক ধারা ভারতের সংস্কৃতি ও প্রকৃতি-কেন্দ্রিক সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলেছে।
অনুষ্ঠানের শুরুতে বিশ্ব সংবাদ কেন্দ্রের সম্পাদক কিশোর শিবম জ্ঞান ও দোষ-নির্মূলকারী দেবর্ষি নারদ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য পেশ করেন। তিনি বলেন, নারদের ৮৪টি ভক্তি সূত্র নিয়ে গবেষণা বর্তমান সাংবাদিকতার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে সমৃদ্ধ করতে পারে।
অনুষ্ঠানে একটি স্মরণিকা উন্মোচন করা হয়েছে। ত্রিবেণী বুজবরুয়ার মনোমুগ্ধকর সরস্বতী বন্দনা পরিবেশন করেন। নব বুজবরুয়ার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত কাৰ্যক্ৰমে বক্তব্য পেশ কছেছেন বিশ্ব সংবাদ কেন্দ্র অসমের সভাপতি ড. গৌরাঙ্গ শর্মা। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন বিশ্ব সংবাদ কেন্দ্ৰ অসমের উপ-সভাপতি গুরুপ্ৰসাদ মেধি। অনুষ্ঠানে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রের তিন শতাধিক মানুষ অংশগ্রহণ করেন। এবারের নারদ জয়ন্তী অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে ত্রিবেণী বুজবরুয়ার নেতৃত্বে সমবেত বন্দেমাতরম রাষ্ট্রগীতের মাধ্যমে।
হিন্দুস্থান সমাচার / সমীপ কুমার দাস