শুভেন্দু সরকারের এক মাস : অবৈধ অনুপ্রবেশকারী ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে নিলেন কঠোর পদক্ষেপ
কলকাতা, ৯ জুন (হি. স.) : পশ্চিমবঙ্গে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে গঠিত নতুন সরকারের প্রথম এক মাস পূরণ হলো। ব্রিগেড প্যারেড ময়দানে গত মাসের ৯ তারিখে মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নেওয়ার পর, শুভেন্দু অধিকারী দুর্নীতি এবং অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর
শুভেন্দু-অগ্নিমিত্রা


কলকাতা, ৯ জুন (হি. স.) : পশ্চিমবঙ্গে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে গঠিত নতুন সরকারের প্রথম এক মাস পূরণ হলো। ব্রিগেড প্যারেড ময়দানে গত মাসের ৯ তারিখে মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নেওয়ার পর, শুভেন্দু অধিকারী দুর্নীতি এবং অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

বিজেপি সরকার দায়িত্ব নিয়ে প্রথম মাসেই মহিলাদের জন্য 'অন্নপূর্ণা যোজনা' চালু করেছে, যার অধীনে ইতিমধ্যেই প্রায় ৩২ লক্ষ মহিলার অ্যাকাউন্টে তিন হাজার টাকা পৌঁছে গেছে। এ ছাড়া রাজ্যের সরকারি বাসগুলিতে মহিলাদের বিনামূল্যে সফরের সুবিধাও শুরু হয়েছে, যা নারীশক্তির জন্য এক বড় উপহার হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিজেপি সরকারের প্রথম মাসের সবচেয়ে বড় ফোকাস ছিল দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। বিভিন্ন স্তরে চালানো তদন্ত ও অভিযানে একাধিক রাজনৈতিক নেতা, আধিকারিক এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপের বিষয়টি সামনে এসেছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, শতাধিক মানুষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে বেশ কিছু বড় নামও রয়েছে বলে জানা গেছে। এদের মধ্যে প্রাক্তন মন্ত্রী সুজিত বসু, স্বরূপ বিশ্বাস, দিলীপ মণ্ডল, জাহাঙ্গীর খান, অসিত মজুমদার, সব্যসাচী দত্ত এবং রবীন্দ্র নাথ চট্টোপাধ্যায়ের মতো নামগুলি আলোচনায় রয়েছে।

এই একই সময়ে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই এবং ইডি-র সক্রিয়তাও বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি এবং অন্যান্য আর্থিক অনিয়ম নিয়ে তদন্তের গতি বাড়ানো হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে যুক্ত ভুয়ো স্বাক্ষর মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের প্রক্রিয়াও তীব্র করা হয়েছে।

প্রশাসনিক স্তরে দুর্নীতি তদন্তের জন্য একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির সভাপতিত্বে বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠনের ঘোষণা করেছে সরকার। এর পাশাপাশি বেশ কয়েকটি মামলার তদন্ত কেন্দ্রীয় এজেন্সির হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শিক্ষা ব্যবস্থা ও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতেও নতুন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।

সীমান্ত নিরাপত্তা এবং অবৈধ অনুপ্রবেশের ইস্যুতেও সরকার কঠোর মনোভাব দেখিয়েছে। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে নজরদারি বৃদ্ধি, হোল্ডিং সেন্টার নির্মাণ এবং অবৈধভাবে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা হয়েছে। সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার কাজ সম্পূর্ণ করতে সীমান্তরক্ষা বাহিনীকে (বিএসএফ) জমি হস্তান্তরের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই এক মাসে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষকে সীমান্ত পার করে ফেরত পাঠানো হয়েছে এবং আরও হাজার হাজার মানুষ বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছেন। সরকারের দাবি, এর ফলে রাজ্যের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও মজবুত হবে।

এই সময়ের মধ্যে কেন্দ্রের একাধিক প্রধান প্রকল্প রাজ্যে কার্যকর করার দিশাতেও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো 'আয়ুষ্মান ভারত যোজনা', যা রাজ্যে চালু করার জন্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর আগে এই প্রকল্প দীর্ঘ সময় ধরে রাজ্যে কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। এর পাশাপাশি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে জন ঔষধি কেন্দ্রের বিস্তার, ওষুধের প্রাপ্যতা বৃদ্ধি এবং ক্যানসার প্রতিরোধ কর্মসূচির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

শিল্প উন্নয়নে গতি আনতে সরকার দেশের বড় শিল্পপতি ও সংস্থাগুলির সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে। শিল্পপতি গৌতম আদানির পুত্র করণ আদানি এবং লার্সন অ্যান্ড টুব্রো গোষ্ঠীর প্রধান এস এন সুব্রহ্মণ্যনের সঙ্গে পৃথক পৃথক বৈঠক হয়েছে। রাজ্যে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বন্ধ পড়ে থাকা শিল্পগুলিকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। হাওড়ার এক শিল্পপতি অসিত চট্টোপাধ্যায়ের মতে, নতুন সরকার আসায় শিল্প পরিবেশে উন্নতির আশা জেগেছে।

প্রকল্পের স্তরেও বেশ কিছু পরিবর্তন দেখা গেছে। তাজপুর বন্দর প্রকল্পের পরিবর্তে দাদনপাত্রবাড়ে নতুন বন্দর গড়ার পরিকল্পনায় কাজ শুরু হয়েছে। সিঙ্গুরের শিল্প প্রসঙ্গ টেনে টাটা গোষ্ঠীর প্রত্যাবর্তনের জল্পনাও তীব্র হয়েছে। রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণবের সঙ্গে বৈঠকের পর রাজ্যে প্রায় এক লক্ষ কোটি টাকার বিনিয়োগের সম্ভাবনা সামনে এসেছে। দীর্ঘ সময় ধরে থমকে থাকা মেট্রো ও রেল প্রকল্পগুলিতেও গতি আনার দাবি করা হচ্ছে।

সরকারি কর্মচারীদের স্বার্থেও একাধিক ঘোষণা করা হয়েছে। বকেয়া মহার্ঘ ভাতা (ডিএ) প্রদানের প্রক্রিয়া শুরু এবং সপ্তম বেতন কমিশন গঠনের ঘোষণাকে সরকারি কর্মচারী মহল একটি বড় সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছে। এ ছাড়া নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া পুনরায় শুরু করা এবং আবেদনের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৫ বছর বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তবে এই এক মাসের মধ্যে সরকারকে বেশ কিছু বিতর্কেরও মুখোমুখি হতে হয়েছে। অবৈধ নির্মাণ ভাঙার জন্য চালানো অভিযান এবং বুলডোজার পদক্ষেপ নিয়ে বিরোধী দল ও কিছু সামাজিক সংগঠন আপত্তি জানিয়েছে। বেশ কিছু জায়গায় হকার উচ্ছেদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করা হয়েছে। কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকার ছোট ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, তাঁদের পর্যাপ্ত সময় ও পুনর্বাসন দেওয়া হচ্ছে না।

বিরোধী দলগুলির অভিযোগ, সরকারের প্রথম দিকের মনোভাব অত্যন্ত আক্রমণাত্মক এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। সিপিআই(এম) সাধারণ সম্পাদক মহম্মদ সেলিম বলেছেন, এটি সেই একই প্যাটার্ন যা আগে অন্যান্য রাজ্যে প্রথম দফায় দেখা গেছে। কংগ্রেস নেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরী অভিযোগ করেছেন, রাজ্যে উন্নয়নের চেয়ে ভাঙচুর ও উচ্ছেদের রাজনীতি বেশি দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে, তৃণমূলের এক বিক্ষুব্ধ বিধায়ক আখরুজ্জামান দাবি করেছেন, পুলিশি পদক্ষেপ ও গ্রেফতারের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে।

যদিও শাসকদল বিজেপির বক্তব্য, রাজ্যে দীর্ঘ সময় ধরে চলে আসা দুর্নীতি এবং অরাজকতা দূর করতে এই কঠোরতার প্রয়োজন ছিল। বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, রাজ্যে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষ স্বস্তি পাচ্ছে।

হিন্দুস্থান সমাচার / সোনালি




 

 rajesh pande