

গুয়াহাটি, ৯ জুন (হি.স.) : অসম সরকার এবং ভারতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদল আজ মঙ্গলবার গুয়াহাটিতে ‘ব্লু ভ্যালি ক্লাস্টার’ চালু করেছে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। এর লক্ষ্য সুগন্ধি, ফ্লেভার এবং আয়ুষ ক্ষেত্রের মাধ্যমে ইউরোপ এবং উত্তরপূর্ব ভারতের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা শক্তিশালী করার পাশাপাশি বিনিয়োগ, উদ্ভাবন ও শিল্প সহযোগিতা বৃদ্ধি করা।
অসমের মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্তবিশ্ব শর্মা, ভারতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত হার্ভে ডেলফিন, বিদেশ মন্ত্রকের (পশ্চিম) সচিব সিবি জর্জ, ভারতে বেলজিয়ামের রাষ্ট্রদূত দিদিয়ের ভ্যান্ডারহ্যাসেল্ট এবং ফেডারেশন অব ইউরোপিয়ান বিজনেস ইন ইন্ডিয়া (এফইবিআই)-র প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে আজ মঙ্গলবার গুয়াহাটিতে অবস্থিত একটি পঞ্চতারকা হোটেলে এই প্রকল্পের উদ্বোধন করা হয়েছে। এই উদ্যোগ ভারত-ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)-এর অংশীদারিত্বকে আঞ্চলিক স্তরে বাস্তব সহযোগিতায় রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে মনে করা হচ্ছে।
অসম সরকারের নেতৃত্বে পরিচালিত ‘ব্লু ভ্যালি ক্লাস্টার’ ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ইউরোপীয় ইউনিয়ন-ভারত শীর্ষ সম্মেলনে গৃহীত ইইউ-ভারত সমন্বিত কৌশলগত কর্মসূচির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং বৃহত্তর ‘ব্লু ভ্যালিজ’ উদ্যোগের অংশ। এই প্রকল্প ইউরোপীয় ও ভারতীয় সংস্থাগুলির মধ্যে গবেষণা, উদ্ভাবন, বিনিয়োগ এবং শিল্প সহযোগিতার অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
হোটেল রেডিসন ব্লু-কে আয়োজিত যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনে অসমকে ভারতের দ্রুত বিকাশশীল অর্থনীতিগুলির মধ্যে একটি এবং উত্তরপূর্ব ভারতের প্রবেশদ্বার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। রাজ্যের যোগাযোগ ব্যবস্থা, জৈববৈচিত্র্য, উদ্ভাবনী ক্ষমতা এবং আঞ্চলিক বাজারে প্রবেশাধিকারের মতো বিশেষ সুবিধার কথাও তুলে ধরা হয়েছে।
অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মা ইইউ রাষ্ট্রদূত হার্ভে ডেলফিনের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন। বৈঠকে বিদেশ মন্ত্রকের সচিব সিবি জর্জও উপস্থিত ছিলেন। মুখ্যমন্ত্রী এফইবিআই-এর সদস্য এবং ইউরোপীয় প্রতিনিধিদলের সঙ্গে একটি বৈঠকে বিনিয়োগের সুযোগ, শিল্প সহযোগিতা, প্রযুক্তি অংশীদারিত্ব, দক্ষতা উন্নয়ন এবং অসম-ইউরোপের মধ্যে ব্যবসায়িক সম্পর্ক জোরদার করার বিষয়ে আলোচনা করেন।
সাংবাদিক সম্মেলনে বক্তব্য পেশ করতে গিয়ে রাষ্ট্রদূত ডেলফিন বলেন, অসমের প্রাকৃতিক সম্পদ, মানবসম্পদ এবং টেকসই উদ্ভাবনের প্রতি প্রতিশ্রুতি আন্তর্জাতিক ব্যবসার জন্য রাজ্যকে আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত করেছে। তিনি বলেন, ‘ব্লু ভ্যালিজ’ উদ্যোগ ইউরোপীয় ও ভারতীয় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলিকে যুক্ত করার পাশাপাশি পরিবেশগত স্থায়িত্ব ও সামাজিক উন্নয়নকে উৎসাহিত করবে।
ডেলফিন গুয়াহাটির সিআইটিআইএস ২.০ এবং বরাক নদী অববাহিকা ব্যবস্থাপনা কর্মপরিকল্পনার মতো ইইউ-সমর্থিত প্রকল্পগুলির কথাও বলেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আরও গভীর শিল্প ও বিনিয়োগ সহযোগিতা সমগ্র উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্য উপকারী হবে।
মুখ্যমন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মা বলেন, এই অংশীদারিত্ব একটি শক্তিশালী, টেকসই এবং উদ্ভাবন-নির্ভর অর্থনীতি গড়ার যৌথ দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। সেমিকন্ডাক্টর ও ইলেকট্রনিক্স, প্রতিরক্ষা ও বিমান চলাচল, চা, আগর, জৈব খাদ্য, প্রাকৃতিক সুগন্ধি ও ফ্লেভার এবং আয়ুষভিত্তিক স্বাস্থ্যপণ্যের ক্ষেত্রে সহযোগিতার বিপুল সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন তিনি।
ড. শর্মা বলেন, ‘ব্লু ভ্যালিজ’ প্ল্যাটফর্ম কৃষক, মহিলা স্বনির্ভর গোষ্ঠী, স্টার্টআপ, গবেষক এবং শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলিকে আন্তর্জাতিক মূল্য শৃঙ্খলের সঙ্গে যুক্ত করবে। এর মাধ্যমে অসম ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে প্রযুক্তি স্থানান্তর, মানসম্পন্ন কর্মসংস্থান এবং টেকসই সমৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হবে।
ইউরোপীয় প্রতিনিধিদল জাগিরোডে অবস্থিত টাটা সেমিকন্ডাক্টর অ্যাসেম্বলি অ্যান্ড টেস্ট প্রাইভেট লিমিটেড (টিএসএটি) পরিদর্শন করে উন্নত উৎপাদন ও সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে অসমের ক্রমবর্ধমান ভূমিকা সম্পর্কে ধারণা লাভ করেছে।
এই সফরকালে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে অসম ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন লিমিটেড এবং ফেডারেশন অব ইউরোপিয়ান বিজনেস ইন ইন্ডিয়ার মধ্যে অসম এবং ইউরোপের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক শক্তিশালী করার জন্য একটি সমঝোতা স্মারক (মউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে।
মউ চুক্তির মাধ্যমে ইউরোপীয় ও অসমের শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে বিনিয়োগ সচেতনতা, ব্যবসায়িক সংযোগ এবং জ্ঞান বিনিময় বাড়ানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
রাজ্য সরকার ইউরোপীয় সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানগুলিকে অসমে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়ে বিনিয়োগ-বান্ধব নীতি, বিশেষ সুবিধা, শিল্প পরিকাঠামো, জমির প্রাপ্যতা, দ্রুত অনুমোদন ব্যবস্থা, প্রযুক্তি সহযোগিতা এবং দক্ষতা উন্নয়নের উদ্যোগের কথা তুলে ধরেছে।
সাংবাদিক সম্মেলনে উভয় পক্ষ বলেছে, ‘ব্লু ভ্যালি ক্লাস্টার’ প্রকল্প স্থানীয় জৈববৈচিত্র্য, উদ্ভাবন ও শিল্পকে আন্তর্জাতিক মূল্য শৃঙ্খল এবং বিশ্ব বাজারের সঙ্গে যুক্ত করে টেকসই শিল্প সহযোগিতার একটি নতুন মডেল তৈরি করবে।
এই উদ্যোগের লক্ষ্য কৃষক, মহিলা, যুবক, উদ্যোক্তা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলিকে উচ্চমূল্যের বায়ো-ইকোনমি ক্ষেত্রে যুক্ত করা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক জীবিকা, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদল জানিয়েছে, এই সফর অসম-ইউরোপ সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনা তুলে ধরেছে। পরিকাঠামোবদ্ধ বাণিজ্যিক ও ক্ষেত্রভিত্তিক আলোচনা, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং যৌথ উদ্ভাবনী প্রকল্পের মাধ্যমে উত্তরপূর্ব ভারত ও ইউরোপের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে।
হিন্দুস্থান সমাচার / সমীপ কুমার দাস