
জয়পুর, ১০ জুন (হি.স.) : রাজস্থানের জয়পুরে একটি অবৈধ বাজি মজুতকেন্দ্রে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ও ধারাবাহিক বিস্ফোরণে মৃত্যু সংখ্যা বেড়ে ৮ জন হয়েছে। গুরুতর দগ্ধ হয়েছেন আরও কয়েকজন। মঙ্গলবার খোহ নাগোরিয়ান থানার অন্তর্গত আয়েশা নগর তলাই এলাকায় ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনা গোটা শহরে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। ঘটনার পর এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
পুলিশ ও প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, আইটিআই কলেজ সংলগ্ন একটি আবাসিক এলাকায় বেআইনিভাবে বিপুল পরিমাণ বাজি ও দাহ্য সামগ্রী মজুত করা হয়েছিল। মঙ্গলবার সকাল প্রায় ১১টা নাগাদ আচমকাই সেখানে আগুন লাগে। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ভয়াবহ রূপ নেয় এবং একের পর এক বিস্ফোরণে গোটা এলাকা কেঁপে ওঠে। ভিতরে থাকা বহু মানুষ বেরিয়ে আসার সুযোগই পাননি।
মৃতদের মধ্যে রয়েছেন মহম্মদ আশরফ (৪০), মহম্মদ রাব্বিল (১৬), আব্দুল ওয়াহিদ (৪৬), সমীর খান (২০), বিলাল খান (২৮), আজিম খান (১৮) এবং নাসির খান (২৫)। আরও এক মৃতের পরিচয় এখনও জানা যায়নি। প্রথমে সাতজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেলেও পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আরও এক দগ্ধের মৃত্যু হওয়ায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে আটে পৌঁছেছে।
মৃতদের মধ্যে বিলাল খান ও আজিম খান দুই ভাই। পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, আজিম ওই অবৈধ ইউনিটে কাজ করতেন। ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে বিস্ফোরণের কবলে পড়েন বিলাল। সমীর খানও ওই ইউনিটের কর্মী ছিলেন। দুর্ঘটনায় গুরুতর দগ্ধ আরও কয়েকজনের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা চলছে।
এসএমএস হাসপাতালের প্লাস্টিক সার্জন ডা. আর. কে. জৈন জানিয়েছেন, হাসপাতালে আনা ছ’জনের মধ্যে দু’জনকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। বাকিদের চিকিৎসা শুরু হলেও পরে কয়েকজনের মৃত্যু হয়। অধিকাংশের শরীরের ৭৫ থেকে ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত পুড়ে গিয়েছিল। নাসিরের শরীরের প্রায় ৯৫ শতাংশ অংশ দগ্ধ হয়েছিল বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে, বাড়িটির মালিক ইয়াকুব খান নামে এক ব্যক্তি। তিনি দিল্লির বাসিন্দা ফিরোজের কাছে বাড়িটি ভাড়া দিয়েছিলেন। অভিযোগ, ফিরোজ ও তাঁর সহযোগী ওয়াসিম সেখানে বেআইনিভাবে বাজি মজুত ও প্যাকেটজাত করার কাজ চালাতেন। ঘটনার পর থেকেই ফিরোজ, ওয়াসিম এবং বাড়ির মালিক পলাতক।
পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে, খোহ নাগোরিয়ান থানার মাত্র এক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ওই ভবনে গত প্রায় দু’বছর ধরে অবৈধভাবে বাজি মজুত ও প্যাকেটজাত করার কাজ চলছিল। প্রাথমিক অনুমান, সেখানে প্রায় ৫০ কিলোগ্রাম বারুদ মজুত ছিল। ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞদের মতে, শর্ট সার্কিট অথবা বিড়ি-সিগারেটের আগুন থেকেই বিস্ফোরণের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। যদিও তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নির্দিষ্ট কারণ নিয়ে মন্তব্য করতে নারাজ পুলিশ।
স্থানীয় বাসিন্দা হাশিম আনসারি জানিয়েছেন, আগুন লাগার পর জলবাহী ট্যাঙ্কারের সাহায্যে ভিতরে আটকে পড়া কয়েকজনকে উদ্ধারের চেষ্টা করা হয়েছিল। উদ্ধারকাজে অংশ নিতে গিয়ে তিনিও দগ্ধ হন। তাঁর দাবি, সময়মতো একটি এলপিজি সিলিন্ডার বাইরে সরিয়ে নেওয়ায় আরও বড় বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
জয়পুরের পুলিশ কমিশনার সচিন মিত্তল জানিয়েছেন, ঘটনাটির পূর্ণাঙ্গ তদন্ত চলছে। আবাসিক এলাকায় কীভাবে এই ধরনের বিপজ্জনক মজুতকেন্দ্র গড়ে উঠল এবং কারা এর সঙ্গে জড়িত, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। গাফিলতি বা যোগসাজশের প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানিয়েছেন। পলাতক অভিযুক্তদের খোঁজে তল্লাশি শুরু হয়েছে।
এদিকে দুর্ঘটনার পর যে আবাসিক এলাকায় এই অবৈধ মজুতকেন্দ্রটি চলছিল, সেই আবাসনের বৈধতাও খতিয়ে দেখতে শুরু করেছে জেলা প্রশাসন। মৃতদের দেহ ময়নাতদন্তের পর পরিবারের হাতে তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন রাজ্যপাল হরিভাউ বাগড়ে, কৃষিমন্ত্রী কিরোড়ীলাল মীণা এবং প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অশোক গেহলট। মৃতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করেছেন তাঁরা।
পুলিশ, ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞ এবং প্রশাসনের যৌথ তদন্তে এখন মূলত নজর দেওয়া হচ্ছে অবৈধভাবে বাজি মজুত, নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘন এবং এর নেপথ্যে থাকা চক্রের ওপর। এই ঘটনা ফের জনবসতিপূর্ণ এলাকায় অবৈধ বিস্ফোরক মজুতের বিপজ্জনক বাস্তবতাকে সামনে এনে দিয়েছে।
---------------
হিন্দুস্থান সমাচার / সৌমি বৈদ্য