
হাফলং (অসম), ৮ আগস্ট (হি.স.):টানা বৃষ্টি ও ভূমিধসে ফের বিপর্যস্ত অসমের ডিমা হাসাও জেলার শতাব্দী প্রাচীন লামডিং–বদরপুর পাহাড়ি রেলপথ। নিউ হারেংগাজাও রেলস্টেশনের কাছে রেললাইনের নীচ থেকে বিস্তীর্ণ অংশের মাটি সরে যাওয়ায় ১ নম্বর ও ২ নম্বর লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেল যুদ্ধকালীন তৎপরতায় মেরামতির কাজ চালাচ্ছে। আপাতত ৩ নম্বর লাইন ব্যবহার করেই ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। রেল সূত্রে জানা গিয়েছে, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আগামী ১০ আগস্টের মধ্যে ২ নম্বর লাইন এবং ২৫ আগস্টের মধ্যে ১ নম্বর লাইন পুনরায় চালু করার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। তবে পাহাড়ি এলাকায় বৃষ্টির দাপট অব্যাহত থাকায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মেরামতির কাজ শেষ করা নিয়ে সংশয় রয়েছে। নতুন করে ভূমিধস বা পাহাড়ের ঢাল থেকে মাটি ও পাথর নেমে এলে কাজ আরও বিলম্বিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। নিউ হারেংগাজাওয়ের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি ফের সামনে এনে দিয়েছে পাহাড়ি রেলপথের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার প্রশ্ন। মেরামতির জন্য রেল কর্তৃপক্ষকে একদিকে ক্ষতিগ্রস্ত অংশে মাটি ও পাথর ভরাট করতে হচ্ছে, অন্যদিকে পাহাড়ের ঢাল স্থিতিশীল রাখার জন্য বিভিন্ন প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে। বর্ষার মধ্যে বার বার ধস নামায় এই কাজ আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
লামডিং–বদরপুর পাহাড়ি রেলপথের ইতিহাস একশো বছরেরও বেশি পুরনো। ব্রিটিশ আমলে দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলকে সমতলের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্দেশ্যে মিটারগেজ রেলপথ হিসেবে এই যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল। পাহাড় কেটে সুড়ঙ্গ, সেতু ও অসংখ্য বাঁকের মধ্য দিয়ে নির্মিত এই রেলপথ দীর্ঘদিন ধরে উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে আসছে। পরবর্তী সময়ে মিটারগেজ থেকে ব্রডগেজে রূপান্তরের ফলে বরাক উপত্যকার সঙ্গে ত্রিপুরা, মিজোরাম ও মণিপুরের রেল যোগাযোগও আরও বিস্তৃত হয়েছে।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে আবহাওয়ার ধরন এবং অতিবৃষ্টির প্রবণতা এই পাহাড়ি রেলপথের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। অল্প সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত, পাহাড়ের ঢালের মাটি আলগা হয়ে যাওয়া এবং ঘন ঘন ভূমিধসের ঘটনা রেললাইনের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। নিউ হারেংগাজাওয়ের সাম্প্রতিক বিপর্যয়ও দেখিয়ে দিয়েছে, ধসের পরে ক্ষতিগ্রস্ত রেললাইন মেরামত করে পরিষেবা চালু করাই সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। রেলপথের ঝুঁকিপূর্ণ অংশগুলিতে জল নিষ্কাশন ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা, পাহাড়ের ঢাল রক্ষায় প্রতিরোধী দেওয়াল নির্মাণ, পাথর ও ধসের মাটি রেললাইনে এসে পড়া ঠেকাতে সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং আধুনিক ভূ-প্রযুক্তিগত নজরদারি বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের একাংশ মনে করছেন। বর্ষা শুরুর আগেই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলির ভূতাত্ত্বিক ও কাঠামোগত সমীক্ষা চালিয়ে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের উপরেও জোর দেওয়া হচ্ছে।
নিউ হারেংগাজাওয়ের বিপর্যয়কে তাই শুধুমাত্র একটি রেললাইন মেরামতির সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বরাক উপত্যকা এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি যোগাযোগ নিরাপত্তা। একটি মাত্র পাহাড়ি রেলপথের উপর বছরের পর বছর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কতটা নিরাপদ, সেই প্রশ্নও ফের সামনে এসেছে। এই পরিস্থিতিতে বরাক উপত্যকার জন্য একটি বিকল্প বা অতিরিক্ত ব্রডগেজ রেলপথের দাবি নতুন করে জোরদার হয়েছে। কারণ পাহাড়ি রেলপথে ভূমিধসের কারণে দীর্ঘ সময় রেল যোগাযোগ বন্ধ থাকলে তার প্রভাব শুধু যাত্রী পরিষেবায় সীমাবদ্ধ থাকে না। খাদ্যসামগ্রী, জ্বালানি, ওষুধ, শিল্পের কাঁচামাল এবং অন্যান্য অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের সরবরাহও ব্যাহত হয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে বরাক উপত্যকা, ডিমা হাসাও, ত্রিপুরা, মিজোরাম ও মণিপুরের জনজীবন এবং অর্থনীতিতে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, নিউ হারেংগাজাওয়ের ঘটনা ভবিষ্যতের জন্য একটি সতর্কবার্তা। পাহাড়ি রেলপথকে আরও নিরাপদ ও জলবায়ু-সহনশীল করে তোলার পাশাপাশি বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থার পরিকল্পনাও এখন দীর্ঘমেয়াদি পরিকাঠামো নীতির অংশ হওয়া প্রয়োজন। ঐতিহাসিক লামডিং–বদরপুর রেলপথের নিরাপত্তা জোরদার করার পাশাপাশি বরাক উপত্যকার জন্য একটি নির্ভরযোগ্য বিকল্প রেল করিডর গড়ে তোলা গেলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে।নিউ হারেংগাজাওয়ের সাম্প্রতিক ধস সেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তাকেই আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
---------------
হিন্দুস্থান সমাচার / বিশাখা দেব