
দুর্গাপুর, ১২ জানুয়ারি ( হি. স.) : পানাগড় শিল্পতালুকের একটি বেসরকারি মদ কারখানার দূষিত বর্জ্য জলের দাপটে এখন অস্তিত্ব সংকটে বর্ধমানের অন্যতম ঐতিহাসিক খড়ি নদীর। দুর্গন্ধে বাতাস ভারী, আর নদীর জল বিষাক্ত— এই পরিস্থিতিতে সামনেই মকরসংক্রান্তি। প্রতি বছর এই দিনে নদীতে পুণ্যস্নান করেন হাজার হাজার গ্রামবাসী। কিন্তু এবার বিষজলে স্নান করবেন কীভাবে? এই আতঙ্কে ঘুম ছুটেছে গলসি-১ ব্লকের মাড়ো, ভিড়সিন, খাঁপাড়া, খামারগ্রাম ও নুরকোনা সহ একাধিক গ্রামের বাসিন্দাদের।
অভিযোগ, পানাগড় শিল্পতালুকের ওই বেসরকারি মদ কারখানাটি গত আট বছর ধরে এলাকায় দূষণ ছড়িয়ে চলেছে। কারখানার তীব্র দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ আশপাশের কোটা, চণ্ডীপুর ও নতুনগ্রামের বাসিন্দারাও। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি খড়ি নদীর।
চাষাবাদে বিপর্যয়: কারখানার বর্জ্য জল মিশছে নদীর জল ও সেচ ক্যানেলে। এর ফলে প্রায় ২০০ হেক্টর উর্বর দোফসলি জমি নষ্ট হওয়ার মুখে।
নদীর এই কালো জল পান করে অসুস্থ হয়ে পড়ছে গবাদি পশুরা। বছরখানেক আগে জলের নমুনা পরীক্ষায় দেখা গেছে, এতে পিএইচ , সিওডি এবং বিওডি-র মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি। জলটি কার্যত 'সেপটিক' হয়ে গিয়েছে, যা মানুষের শরীরের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
খড়ি নদীর উৎপত্তি স্থল মাড়ো গ্রামে রয়েছে পবিত্র খড়্গেশ্বরী মায়ের মন্দির। পৌষ সংক্রান্তিতে এখানে নাম সংকীর্তন, বাউল গান এবং টুসু গানের আসর বসে। খামারগ্রামে বসে ঐতিহ্যবাহী মেলা। প্রথা অনুযায়ী, ভক্তরা নদীতে স্নান করে নতুন দোলা ভাসান। কিন্তু বর্তমানে নদীর জলের যে অবস্থা, তাতে স্নান করা তো দূর, কাছে দাঁড়ানোই দায় হয়ে পড়েছে।
গলসি-১ নং ব্লকের কৃষি দফতর সূত্রে খবর, দূষিত জলের কারণে বুদবুদ, মানকর ও তিলডাঙা মৌজার প্রায় হাজার হেক্টর আমন চাষের ক্ষতি হতে পারে। এলাকার কৃষকরা অভিযোগ করেছেন যে, কারখানা কর্তৃপক্ষকে বারবার জানিয়েও কোনো লাভ হয়নি। প্রশাসনের এই উদাসীনতায় এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।
গলসি-১ নং পঞ্চায়েত সমিতির কৃষি কর্মাধ্যক্ষ পার্থসারথী মন্ডল জানান, আমরা কারখানা কর্তৃপক্ষকে বহুবার বর্জ্য জল নদীতে না ফেলার জন্য বলেছি, কিন্তু তারা কথা শোনেনি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
এদিকে, অভিযুক্ত কারখানা কর্তৃপক্ষ বা দুর্গাপুর আঞ্চলিক দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ— কাউকেই এ বিষয়ে মুখ খুলতে দেখা যায়নি। পুণ্যস্নানের আর মাত্র কয়েকদিন বাকি। তার আগে নদী কবে দূষণমুক্ত হবে, সেই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে জঙ্গলমহল ও গলসির মানুষের কাছে।
হিন্দুস্থান সমাচার / জয়দেব লাহা