
বাঁকুড়া, ১৩ জানুয়ারি (হি স) :: গ্রাম বাংলার প্রাচীন রীতি ও ঐতিহ্য আজ বিলুপ্তির পথে। এক সময় মকর সংক্রান্তির অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল 'কুমা' বা 'মেড়াঘর'। বর্তমানে সেই ঐতিহ্যের দেখা না মেলায় মন ভালো নেই রাঢ় বাংলার গ্রামবাসীদের। মঙ্গলবার জেলার কোথাও সেই পরিচিত 'কুমা'-র দেখা মেলেনি।
মকর সংক্রান্তির দিন ভোরে জলাশয়ে স্নান করার প্রাচীন প্রথা রয়েছে রাঢ় বাংলায়। ছোট থেকে প্রবীণ—সকলেই এই ভোরে মকর স্নানে অংশ নেন। কিন্তু হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় এই স্নান সেরে ওঠার পর শরীর গরম করার জন্য ব্যবহৃত হতো 'কুমা'। স্থানীয় যুবকদের উদ্যোগে সংক্রান্তির বহু আগে থেকেই এর প্রস্তুতি শুরু হতো।
নদীর ঘাট বা পুকুর পাড়ে শুকনো ডালপালা, বিশেষ করে তাল ও খেজুর পাতা দিয়ে কুঁড়েঘরের মতো তৈরি করা হতো এই 'কুমা' বা 'মেড়াঘর'। ভোরে স্নান সেরে আসার পর সেই কুমা-তে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হতো। দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা সেই আগুনের তাপে হাড়কাঁপানো ঠান্ডার মধ্যেও এলাকা গরম হয়ে উঠত। মকর স্নান সেরে এসে আগুনের তাপ নেওয়াকেই বলা হয় 'কুমা জ্বালানো'। অনেকটা দোল উৎসবের ন্যাড়াপোড়ানোর মতো এই প্রথাটি রাঢ় বাংলার মানুষের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল।
এক সময় গ্রামের যুবকদের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলত কার কুমা কত বেশি উঁচু হবে। লম্বা বাঁশ দিয়ে সুউচ্চ মেড়াঘর তৈরির আনন্দ আজ ম্লান। মাকুড়গ্রামের ষাটোর্ধ্ব প্রবীণ অন্তরা সেন, তনিমা কর ও অনন্ত জানা আক্ষেপের সুরে বলেন, আমরা বছরের পর বছর এই কুমার আগুন উপভোগ করেছি। সেই আনন্দটাই ছিল আলাদা। এখনকার প্রজন্ম এসবের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, ফলে গ্রামবাংলার এই অভিনব উৎসবটি হারিয়ে যাচ্ছে।
প্রশাসনের আধুনিকীকরণ আর মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তনের ফলেই কি তবে এই গ্রামীণ লোক-সংস্কৃতি আজ ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই নিচ্ছে? এই প্রশ্নই এখন গ্রামবাসীর মনে।
হিন্দুস্থান সমাচার / সোমনাথ বরাট