অসমের রেল পুনর্জাগরণ : অমৃত ভারত স্টেশন প্রকল্পের মাধ্যমে উত্তরপূর্বের প্রবেশদ্বার আরও শক্তিশালী
গুয়াহাটি, ১৩ জানুয়ারি (হি.স.) : অসমকে দীর্ঘদিন ধরে ভৌগোলিক এবং কৌশলগত উভয় দিক থেকেই উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। কয়েক দশক ধরে সীমিত সংযোগ ব্যবস্থা এবং সীমিত পরিকাঠামোর জন্য এই প্রবেশদ্বারটি অব্যবহৃত থেকে গিয়েছিল। গত এ
হয়বরগাঁও রেলস্টেশন


হোজাই রেলস্টেশন


অমৃতভারত স্টেশনে রূপান্তর


গুয়াহাটি, ১৩ জানুয়ারি (হি.স.) : অসমকে দীর্ঘদিন ধরে ভৌগোলিক এবং কৌশলগত উভয় দিক থেকেই উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। কয়েক দশক ধরে সীমিত সংযোগ ব্যবস্থা এবং সীমিত পরিকাঠামোর জন্য এই প্রবেশদ্বারটি অব্যবহৃত থেকে গিয়েছিল। গত এগারো বছরে সেই বাস্তবতা চূড়ান্তভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে রেলওয়ে অসমের রূপান্তর এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে জাতীয় মূলধারার সাথে একীভূত করার ক্ষেত্রে একটি প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

আজ মঙ্গলবার উত্তরপূর্ব সীমান্ত রেলওয়ের মুখ্য জনসংযোগ আধিকারিক কপিঞ্জল কিশোর শর্মা এক প্রেস বার্তায় জানান, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বিকাশের চিন্তা স্পষ্ট এবং ধারাবাহিক। সংযোগ ব্যবস্থাকে উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। পরিকাঠামোকে সুযোগ সৃষ্টির সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এছাড়া, এটি নিশ্চিত করেছে প্রবৃদ্ধি অবশ্যই শেষ প্রান্ত পর্যন্ত পৌঁছাবে। কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে শক্তিশালী সমন্বয় সহ ডাবল ইঞ্জিন শাসন মডেলটি উন্নয়নের গতিকে উল্লেখযোগ্যভাবে ত্বরান্বিত করেছে। ফলস্বরূপ, অসম ভারতের রেল উন্নয়ন অ্যাজেন্ডার প্রান্তিক অবস্থান থেকে কেন্দ্রে চলে এসেছে। এই রূপান্তরটি সরকারি বিনিয়োগে ব্যাপক বৃদ্ধির দ্বারা হয়েছে। অসম এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্য বার্ষিক গড় রেল বাজেট বরাদ্দ ২০০৯-১৪ সালের ২,১২২ কোটি টাকা থেকে বৃদ্ধি হয়ে ২০২৫-২৬ সালে ১০,৪৪০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা প্রায় পাঁচগুণ অধিক। এই ধারাবাহিক ফান্ডিঙের জন্য গ্রাউন্ড লেভেলে ধারাবাহিক কাজ হচ্ছে, যার অধীনে বর্তমানে অসম ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে ৭৭,৩৩০ কোটি টাকার বেশি মূল্যের রেল প্রকল্পের কাজ চলছে।

রেললাইনের সম্প্রসারণ এই বিনিয়োগের সবচেয়ে দৃশ্যমান ফলাফলগুলোর মধ্যে একটি। ২০১৪ থেকে ভারতীয় রেলওয়ে অসম এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ১,৮৪০ কিলোমিটারের অধিক নতুন রেল লাইন নির্মাণ করেছে। শুধুমাত্র অসমেই গত পাঁচ বছরে ৪১৬ কিলোমিটার নতুন রেললাইন স্থাপন করা হয়েছে। যার মধ্যে ৫০ কিলোমিটার নতুন লাইন এবং ৩৬৬ কিলোমিটার ডাবলিং-এর কাজ রয়েছে। অসমে মোট রেল নেটওয়ার্কের দৈর্ঘ্য এখন ৪,১৯৯ ট্র্যাক কিলোমিটার, যা রাজ্যে পরিচালনগত দক্ষতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে। বেশ কয়েকটি যুগান্তকারী প্রকল্প অসমের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থাকে নতুন রূপ দিয়েছে। এর মধ্যে ৫,৮২০ কোটি টাকা ব্যয় সাপেক্ষে নির্মিত বগিবিল ব্রিজ এবং এর সাথে সংযুক্ত ৯২ কিলোমিটার রেললাইন রয়েছে। রঙিয়া-মুরকংসেলেক (৫১০ কিমি, ৩,০১৯ কোটি টাকা) এবং লামডিং-শিলচর ও বদরপুর-কুমারঘাট (৪১২ কিমি, ৬,৫০০ কোটি টাকা)-এর মতো গেজ রূপান্তর প্রকল্পগুলো প্রত্যন্ত ও সীমান্ত এলাকাগুলিতে নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ নিশ্চিত করেছে এবং কৌশলগত চলাচলকে শক্তিশালী করেছে। এই প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে ভারতীয় রেলওয়ে বহু দশকের দূরত্বকে অবসান ঘটিয়েছে। অসম কেন্দ্রীয় রেল ধমনী হিসেবে কাজ করছে। যার ফলে এই অঞ্চলে যাত্রী চলাচল, বাণিজ্য, পর্যটন এবং অর্থনৈতিক আদান-প্রদান সম্ভব হয়েছে।

হাই-টেক ট্রেন পরিষেবা এই পরিকাঠামোগত সম্প্রসারণকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। গুয়াহাটি-নিউ জলপাইগুড়ি বন্দেভারত এক্সপ্রেস বর্তমানে এই অঞ্চলের প্রধান সেমি-হাই-স্পিড পরিষেবা হিসেবে চলাচল করছে। এখানে অসম এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের তিনটি জেলা এবং চারটি অন্যান্য স্টপেজ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। যদিও ট্র্যাক ও ট্রেন সংযোগ ব্যবস্থার মেরুদণ্ড, স্টেশন ভারতীয় রেলওয়ের পাবলিক ফেস। এই ইন্টারফেসটিকে আধুনিকীকরণের জন্য ভারতীয় রেল অমৃতভারত স্টেশন স্কিম চালু করেছে। দেশব্যাপী এই স্কিমের অধীনে সারা দেশে ১,৩০০টিরও অধিক স্টেশনকে পুনর্বিকাশ করা হচ্ছে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ৬০টি স্টেশন নির্বাচন করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫০টিই অসমে অবস্থিত। অমৃতভারত স্টেশন স্কিমে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ৬০টি অমৃতভারত স্টেশনের জন্য ২,১০১ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হচ্ছে। এর ফলে অসম এই অঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী রাজ্যে পরিণত হয়েছে।

অসমের ৫০টি অমৃতভারত স্টেশন প্রধান শহরাঞ্চল এবং আঞ্চলিক শহরগুলোতে বিস্তৃত। ফলে সুষম আঞ্চলিক উন্নয়ন নিশ্চিত হয়েছে। এর মধ্যে আমগুড়ি, অরুণাচল, চাপরমুখ, ধেমাজি, ধুবড়ি, ডিব্রুগড়, ডিফু, দুলিয়াজান, ফকিরাগ্রাম জংশন, গৌরীপুর, গহপুর, গোলাঘাট, গোসাইগাঁওহাট, গুয়াহাটি, হয়বরগাঁও, হারমতি, হোজাই, জাগিরোড, যোরহাট টাউন, কামাখ্যা জংশন, কোকরাঝাড়, লংকা, লিডু, লামডিং জংশন, মাজবাট, মাকুম জংশন, মার্ঘেরিটা, মারিয়নি জংশন, মুরকংসেলেক, নাহরকটিয়া, নলবাড়ি, নামরূপ, নারেঙ্গি, নিউ বঙাইগাঁও জংশন, নিউ হাফলং, নিউ করিমগঞ্জ জংশন, নিউ তিনসুকিয়া জংশন, নর্থ লখিমপুর, পাঠশালা, রাঙাপাড়া নর্থ জংশন, রঙিয়া জংশন, সরুপথার, শিবসাগর টাউন, শিলাপথার, শিলচর, শিমলুগুড়ি, টংলা, তিনসুকিয়া, ওদালগুড়ি, বিশ্বনাথ চারিয়ালি রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী কর্তৃক মে ২০২৫-এ উদ্বোধন করা হয় বরগাঁও স্টেশনটি অসমের প্রথম সম্পূর্ণকৃত অমৃতভারত স্টেশন হিসেবে যাত্রী সুবিধা এবং ডিজাইনের ক্ষেত্রে নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেছে।

এই পুনর্বিকাশ প্রকল্পগুলিতে উন্নত স্টেশন ভবন, আধুনিক প্ল্যাটফর্ম, উন্নত চলাচল এলাকা, আধুনিক বিশ্রামাগার, উন্নত সাইনেজ এবং দিব্যাঙ্গজন-বান্ধব সুবিধার ওপর মনোযোগ দেওয়া হয়েছে। এটি নিশ্চিত করার জন্য স্থানীয় সংস্কৃতি এবং স্থাপত্যশৈলীর উপাদানগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে, যাতে স্টেশন সুরক্ষা ও স্বাচ্ছন্যের্র আধুনিক মান বজায় রেখে অসমের পরিচয়কে প্রতিফলিত করে। ভৌতিক পুনর্বিকাশের পাশাপাশি পরিকাঠামোর সাথে সাথে যাত্রীদের সুযোগ-সুবিধাও উল্লেখযোগ্যভাবে প্রসারিত হয়েছে। ২০১৪ থেকে অসমের স্টেশনগুলিতে ২৪টি লিফট এবং ২১টি এসকেলেটর স্থাপন করা হয়েছে, যা উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মধ্যে সর্বোচ্চ। বর্তমানে রাজ্যের ২১৮টি স্টেশনে ওয়াই-ফাই সংযোগ উপলব্ধ রয়েছে। সুরক্ষা ও প্রযুক্তির আধুনিকীকরণের মধ্যে রয়েছে ১,০০০টির অধিক এআই-বেসড সিসিটিভি ক্যামেরা, এলিফ্যানন্ট করিডোরের জন্য এআই-বেসড ইন্ট্রুশন ডিটেকশন সিস্টেম এবং আন্ডারওয়াটার রোবোটিক ব্রিজ ইন্সপেকশন ইত্যাদি।

গত এগারো বছরে অসমের রেলওয়ের অগ্রগতি উদ্দেশ্য থেকে বাস্তবায়নের দিকে পরিবর্তন প্রতিফলিত হয়। রেকর্ড পরিমাণ বাজেট বরাদ্দ, নীতির স্বচ্ছতা এবং সময়সীমা মেনে কাজ সম্পন্ন করার ওপর ধারাবাহিক মনোযোগ রাজ্যজুড়ে এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সংযোগ ব্যবস্থাকে নতুন রূপ দিয়েছে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসেবে, অসম এখন দৃঢ়ভাবে সংযুক্ত, আত্মবিশ্বাসের সাথে তার অবস্থান বজায় রেখেছে এবং দেশের উন্নয়ন যাত্রার সাথে সম্পূর্ণভাবে যুক্ত।

হিন্দুস্থান সমাচার / সমীপ কুমার দাস




 

 rajesh pande