গুয়াহাটিতে ‘বাগুরুম্বা দহৌ’-এর বিশাল অনুষ্ঠানে কং-এর তুলোধোনা প্রধানমন্ত্রীর
গুয়াহাটি, ১৭ জানুয়ারি (হি.স.) : গুয়াহাটিতে অসম সরকারের উদ্যোগ আয়োজিত ‘বাগুরুম্বা দহৌ’-এর বিশাল অনুষ্ঠানে কংগ্রেস-এর তুলোধোনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। দু-দিনের সফরসূচি নিয়ে আজ শনিবার সন্ধ্যায় গুয়াহাটিতে পৌঁছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদ
ভাষণ দিচ্ছেন প্ৰধানমন্ত্ৰী


স্টেডিয়াম প্ৰদক্ষিণ প্ৰধানমন্ত্ৰীর


বাগুরুম্বা দহৌ-এর প্রদর্শনে অভিভূত প্ৰধানমন্ত্ৰী


উপহারসামগ্রী নিয়ে প্রধানমন্ত্রী


বাগুরুম্বা দহৌ-এ ফুলের আকৃতি


বাগুরুম্বা দহৌ-এ ফুলের আকৃতি (চিত্র ২)


নৃত্যে মৃদু ও প্রবাহিত প্রজাপতি


সারিবদ্ধভাবে সম্মিলিত নৃত্য পরিবেশন


গুয়াহাটি, ১৭ জানুয়ারি (হি.স.) : গুয়াহাটিতে অসম সরকারের উদ্যোগ আয়োজিত ‘বাগুরুম্বা দহৌ’-এর বিশাল অনুষ্ঠানে কংগ্রেস-এর তুলোধোনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।

দু-দিনের সফরসূচি নিয়ে আজ শনিবার সন্ধ্যায় গুয়াহাটিতে পৌঁছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বাগুরুম্বা নৃত্য উপভোগ করতে সরুসজাইয়ে ‘অর্জুন ভোগেশ্বর বরুয়া ক্রীড়া প্রকল্প’ স্টেডিয়ামে আসেন। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান অসমের মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্তবিশ্ব শর্মা।

অনুষ্ঠানের সূচনালগ্নে শিল্পী দিবস উপলক্ষ্যে অসমে সংস্কৃতির পুরোধা জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালার প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে বিটিসি-প্রধান হাগ্রামা মহিলারি প্রদত্ত বডোফা উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মের প্রতিকৃতি গ্রহণ করেন তিনি। অন্যদিকে, বিধানসভার অধ্যক্ষ বিশ্বজিৎ দৈমারির উপহার বড়ো বাদ্যযন্ত্র ‘চেরজা’ (দুতারা সদৃশ) গ্রহণ করে নিজের হাতে বাজান প্রধানমন্ত্রী।

‘বাগুরুম্বা দহৌ’-এর এই বিশাল আয়োজনে অংশগ্রহণ করে ভাষণের শুরুতে বড়ো ও অসমিয়া - দুই ভাষায় নমস্কার ও সম্ভাষণ জানিয়ে রাজ্যবাসীকে মাঘ বিহুর শুভেচ্ছা জানান প্রধানমন্ত্রী মোদী। অনুষ্ঠানে ভাষণ দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বিহুর বিশ্ব রেকর্ড এবং ‘ঝুমইর বিনন্দিনী’ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করেন। এই মহৎ আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত সকলকে তিনি ধন্যবাদ জানান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বড়ো পরম্পরাকে সম্মান দেওয়াই তাঁদের উদ্দেশ্য। তিনি বড়ো জাতির জন্য কালিচরণ ব্রহ্ম, সীতানাথ ব্রহ্ম এবং বডোফা উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মের ত্যাগ ও অবদানের কথা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছেন।

প্ৰদত্ত ভাষণে প্ৰধানমন্ত্ৰী বলেন, অসমের শিল্প-সংস্কৃতিতে এক অনন্য আনন্দ নিহিত আছে। সেই আনন্দ উপভোগের কোনও সুযোগ তিনি হাতছাড়া করেন না। অসমের সংস্কৃতি ও বড়ো ঐতিহ্যকে তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন বলেও উল্লেখ করেন। একে নিজের সৌভাগ্য হিসেবে অভিহিত করে মোদী বলেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি যতবার অসমে এসেছেন, অন্য কোথাও ততবার যাননি।

প্ৰাসঙ্গিক ভাষণে প্রধানমন্ত্রী কংগ্রেসকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করে অসমকে ভারতের দ্রুততম উন্নয়নশীল রাজ্যগুলির অন্যতম হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আজ অসমের অগ্রগতি বিচ্ছিন্ন কোনও ঘটনা নয়, এটি ভারতের সামগ্রিক উন্নয়নের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

কানায় কানায় পূর্ণ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত বড়ো জনগোষ্ঠীর সমৃদ্ধ ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান প্রায় দশ হাজার শিল্পীর সম্মিলিত ‘বাগুরুম্বা দহৌ’ নৃত্যানুষ্ঠানে প্রদত্ত ভাষণে প্রধানমন্ত্রী কংগ্রেসের বিরুদ্ধে বেজায় অভিযোগ করেছেন। তিনি বলেন, ‘কংগ্রেস হলো অসমের উন্নয়ন ও স্বীকৃতির প্রতি অ্যালার্জিক। তাঁর দাবি, রাজ্যের উন্নয়নযাত্রার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলকের বিরোধিতা করে এসেছে কংগ্রেস, এখনও করছে।’

প্রধানমন্ত্রী মোদী বলেন, ‘সাংস্কৃতিক আইকন ড. ভূপেন হাজরিকাকে ভারতরত্ন দেওয়ার বিরোধিতা করা, অসমে সেমিকন্ডাক্টর শিল্প স্থাপনের বিরুদ্ধে সর্বভারতীয় কংগ্রেস সভাপতির ছেলের (কর্ণাটকের মন্ত্রী) কটাক্ষ - এ সব অসমের অগ্রগতির প্রতি কংগ্রেসের বিরূপ মানসিকতার উদাহরণ। এমন-কি আমি যে অসমিয়া গামোছা গলায় পরিধান করি তাকে নিয়েও ঠাট্টা-মসকরা করেন কংগ্ৰেসিরা।’

তিনি বলেন, আজ অসম দেশের দ্রুততম উন্নয়নশীল রাজ্যগুলোর একটি। এই অগ্রগতি আর আলাদা নয়, এটি ভারতের সামগ্রিক উন্নয়নের অংশ। পরিকাঠামো, শিল্প ও যোগাযোগ ব্যবস্থার দ্রুত উন্নয়নের জন্য বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকারকে কৃতিত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী।

অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মার প্রশংসা করে মোদী বলেন, ‘হিমন্তবিশ্ব শর্মা নেতৃত্বাধীন সরকার কংগ্রেস আমলের পাপ মোচন করছে, মানুষের হৃদয় এবং রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলকে আবারও যুক্ত করছে।’ তাঁর অভিযোগ, দীর্ঘদিনের অবহেলার দরুন রাজ্যের বহু এলাকা, বিশেষ করে বডোল্যান্ড অঞ্চলকে মূল স্রোত থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছিল।’

ভূমি সংক্রান্ত রাজ্য সরকারের পদক্ষেপের প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘হিমন্তবিশ্ব শর্মার সরকার অনুপ্রবেশকারীর দখলকৃত লক্ষ লক্ষ বিঘা জমি উদ্ধার করছে। অতীতে কংগ্রেস সরকার অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের জন্য দরজা খুলে দিয়ে তাদের ভোটব্যাংকে পরিণত করেছিল। কংগ্রেস অনুপ্রবেশ ও অস্থিরতা নিশ্চিত করেছিল। আর আমরা উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করছি...’, বলেন তিনি।

বডো শান্তি চুক্তির প্রসঙ্গে মোদী বলেন, এটি অসমের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী মোড়, যা বছরের পর বছর ধরে চলমান অশান্তি ও সহিংসতার অবসান ঘটিয়ে শিক্ষা, শান্তি ও অগ্রগতির নতুন পথ খুলে দিয়েছে।

পুনরায় জোর দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজ অসমে শান্তি, সাংস্কৃতিক গৌরব ও উন্নয়ন একসঙ্গে এগিয়ে চলেছে, যা কংগ্রেস আমলের বিভাজন ও স্থবিরতার সম্পূর্ণ বিপরীত। তিনি আশ্বাস দেন, কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার সম্মিলিতভাবে অসমের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং এই উন্নয়নের সুফল উপজাতি সমাজ, যুবসমাজ সহ সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমার অসম আজ অনেক এগিয়ে গেছে। যে অসমে একসময় প্রতিদিন রক্তপাত হতো, আজ সেখানে সংস্কৃতির রং ছড়িয়ে পড়েছে। অসমের যেখানে একসময় গুলির শব্দ শোনা যেত, সেখানে এখন খাম ও সিফুং-এর (বড়োদের বাদ্যযন্ত্র ঢোল ও বাঁশি) মধুর ধ্বনী বাজছে। যেখানে কারফিউ ছিল, সেখানে আজ সংগীতের গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। যেখানে আগে অশান্তি ছিল, সেখানে এখন বাগুরুম্বা নৃত্য পরিবেশিত হচ্ছে। এই রূপান্তর শুধু অসমের নয়, সমগ্র ভারতের গৌরব। অসমের মানুষ এবং বড়ো ভাই-বোনেরা যে আস্থা প্রকাশ করেছেন, তাতে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।

মোদী বলেন, ‘বিজেপি অসমের সংস্কৃতিকে ভারতের গর্ব হিসেবে বিবেচনা করে। আমাদের সরকার চরাইদেও মৈদামকে ইউনেসকোর স্বীকৃতি দিয়েছে। বড়ো ভাষাকে অসমের সহযোগী সরকারি ভাষার মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। বড়ো ভাষা শিক্ষার জন্য বিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে। বাথৌ পূজায় সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। বিজেপি সরকারের আমলেই লাচিত বরফুকনের মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে।’

দশ হাজারের বেশি শিল্পীর অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত ‘বাগুরুম্বা দহৌ’ নৃত্য পরিবেশনার প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটি কেবল একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়। এটি বডো সমাজ ও তাদের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের প্রতি গভীর শ্রদ্ধার প্রকাশ।

অনুষ্ঠানে স্বাগত ভাষণ দিয়েছেন রাজ্যের সাংস্কৃতিক পরিক্রমা দফতরের মন্ত্রী বিমল বরা, বক্তব্য পেশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্তবিশ্ব শর্মা, বিটিসি-প্রধান হাগ্রামা মহিলারি। মঞ্চে ছিলেন রাজ্যপাল লক্ষ্মণপ্রসাদ আচার্য, দুই কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সর্বানন্দ সনোয়াল ও পবিত্র মার্ঘেরিটা (প্রতিমন্ত্রী), অসম বিধানসভার অধ্যক্ষ বিশ্বজিৎ দৈমারি, রাজ্যের কয়েকজন মন্ত্রী।

উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আজই প্রথম বাগুরুম্বা উপভোগ করেছেন। খানাপাড়ার কইনাধরায় রাজ্য অতিথিশালায় রাত কাটিয়ে আগামীকাল রবিবার তিনি নারেঙ্গি থেকে হেলিকপ্টারে করে কলিয়াবরের উদ্দেশে রওয়ানা দেবেন। কলিয়াবরের মৌসন্দা মাঠে প্রধানমন্ত্রী এক বিশাল জনসভায় ভাষণ দেবেন। ওই সভায় লক্ষাধিক মানুষের সমাগমের সম্ভাবনা রয়েছে। সেখান থেকে ভার্চুয়ালি কাজিরঙা এলিভেটেড করিডরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন প্রধানমন্ত্রী।

হিন্দুস্থান সমাচার / সমীপ কুমার দাস




 

 rajesh pande