
ময়নাগুড়ি ও কলকাতা, ২৫ মার্চ (হি.স.) : উত্তরবঙ্গ থেকেই বিধানসভা নির্বাচনের প্রচার অভিযান আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করলেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বুধবার জলপাইগুড়ি জেলার ময়নাগুড়ি টাউন ক্লাব ময়দানে দলীয় প্রার্থী রামমোহন রায়ের সমর্থনে আয়োজিত এক জনসভা থেকে বিজেপি এবং নির্বাচন কমিশনকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করেন তিনি। এদিনের ভাষণে যেমন উন্নয়নের খতিয়ান ছিল, তেমনই ছিল এনআরসি আতঙ্ক, কেন্দ্রীয় বাহিনী ও ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে হুঁশিয়ারি। অন্যদিকে, তাঁর এই মন্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করে নির্বাচন কমিশনের দ্বারস্থ হয়েছে বিজেপি।
এদিনের সভা থেকে কেন্দ্রীয় বাহিনীকে কড়া বার্তা দেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, “আমি কেন্দ্রীয় বাহিনীকে সম্মান করি। কিন্তু মনে রাখবেন, জনগণের শক্তিই আসল শক্তি। আপনারা আপনাদের কাজ সম্মানের সঙ্গে করুন।” এর পরেই তোপ দেগে তিনি বলেন, “ভোটের সময় আপনারা যদি বিজেপির পোলিং এজেন্ট হয়ে যান, তবে আমাদের মা-বোনেরা আছেন, তাঁরা সব দেখে নেবেন। আমরা কিছু করব না, সাধারণ মানুষই জবাব দেবে।”
মুখ্যমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যের শুরুতেই উত্তরবঙ্গের জন্য রাজ্য সরকারের করা উন্নয়নমূলক কাজের খতিয়ান তুলে ধরেন। তিনি জানান, ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে এলাকায় নতুন রাস্তা নির্মাণ হচ্ছে, জল্পেশ মন্দিরের (মহাকাল মন্দির) সংস্কার কাজ দ্রুত গতিতে জারি রয়েছে। তিনি দাবি করেন, রাজ্য সরকার উন্নয়নের স্বার্থে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করেছে। তাঁর কথায়, “তৃণমূল যা প্রতিশ্রুতি দেয়, তা করে দেখায়। চা-বাগান খোলা রাখতে এবং ‘চা সুন্দরী’ প্রকল্প সচল রাখতে তৃণমূলকেই ভোট দিন।”
ভোটার তালিকা ও এনআরসি নিয়ে হুঁশিয়ারি
ভোটার তালিকায় নাম সংশোধন বা স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) প্রক্রিয়া নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেন যে, চক্রান্ত করে মহিলা এবং রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “এসআইআর-এ নাম বাদ যাওয়ার ফলে যদি কারও মৃত্যু হয়, তবে তার দায় কে নেবে?” এনআরসি প্রসঙ্গে চূড়ান্ত হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, “আমি বেঁচে থাকতে বাংলায় এনআরসি হতে দেব না এবং কোনও ডিটেনশন ক্যাম্প তৈরি করতে দেব না। বিজেপি সংবিধান বা গণতন্ত্রের তোয়াক্কা করে না, তারা কেবল ভয় দেখাতে জানে।”
বিজেপিকে একটি ‘হিংস্র দল’ হিসেবে চিহ্নিত করে তিনি আলু চাষিদের পাশে থাকার আশ্বাস দেন। অকাল বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের শস্য বিমার আওতায় দ্রুত ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে বলেও তিনি ঘোষণা করেন। সেই সঙ্গে পেট্রোল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারকে তীব্র নিশানা করেন মুখ্যমন্ত্রী।
বিজেপি কর্মীদের হুমকি দিচ্ছেন মমতা, নির্বাচন কমিশনে নালিশ সুকান্তের
ময়নাগুড়ির সভা থেকে মমতার বক্তব্যের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী তথা বিজেপি রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদার। তিনি মুখ্যমন্ত্রীর এই মন্তব্যকে গণতন্ত্রের জন্য ‘মারাত্মক বিপদ’ বলে অভিহিত করেছেন।
সামাজিক মাধ্যম ‘এক্স’-এ সুকান্ত মজুমদার অভিযোগ করেন যে, ময়নাগুড়িতে তৃণমূল প্রার্থীর সমর্থনে ভাষণ দেওয়ার সময় বিজেপি কর্মীদের লক্ষ্য করে অত্যন্ত আপত্তিজনক ও হুমকিমূলক মন্তব্য করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। সুকান্তের দাবি অনুযায়ী, মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন—নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর রাজ্যের বিজেপি কর্মীদের হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে বসে থাকতে হবে, যেখানে লেখা থাকবে যে তাঁরা বিজেপির সঙ্গে যুক্ত নন।
কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রীর মতে, মুখ্যমন্ত্রীর এই বয়ান ২০২১ সালের বিধানসভা পরবর্তী হিংসার স্মৃতি উসকে দিচ্ছে। তিনি অভিযোগ করেন, “সেই সময় বহু বিজেপি কর্মীকে হত্যা করা হয়েছিল এবং ঘরছাড়া হতে হয়েছিল। আসন্ন নির্বাচনের আগে এই ধরনের মন্তব্য আসলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় ও চাপের পরিবেশ তৈরি করার চক্রান্ত।” সুকান্ত মজুমদার ভারতের নির্বাচন কমিশনের কাছে এই বিষয়টি অবিলম্বে খতিয়ে দেখে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তাঁর মতে, আদর্শ আচরণবিধি (এমসিসি) চালু থাকা সত্ত্বেও এই ধরনের উস্কানিমূলক মন্তব্য গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী।
হিন্দুস্থান সমাচার / সোনালি