
আলিপুরদুয়ার, (হি. স.) : উত্তরবঙ্গের রাজনীতির এক অবিচ্ছেদ্য এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জেলা আলিপুরদুয়ার। ২০১৪ সালের ২৫ জুন জলপাইগুড়ি ভেঙে আলাদা জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা এই ভূখণ্ডটি মূলত পাহাড়, নদী, জঙ্গল আর বিস্তীর্ণ চা-বাগানে ঘেরা। রাজ্যের ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের দামামা বেজে উঠতেই উত্তরবঙ্গের এই জেলাটি এখন আলোচনার কেন্দ্রে। আগামী ২৩ এপ্রিল প্রথম দফায় রাজ্যের যে ১৫২টি আসনে ভোট হতে চলেছে, তার মধ্যে রয়েছে আলিপুরদুয়ারের ৫টি গুরুত্বপূর্ণ বিধানসভা আসন।
কুমারগ্রাম, কালচিনি, আলিপুরদুয়ার, ফালাকাটা এবং মাদারিহাট—এই পাঁচটি কেন্দ্রেই এবার হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সংকেত মিলছে। ২০২১ সালের নির্বাচনে বিজেপি এই জেলার সবকটি আসনে জয়লাভ করে জেলাকে নিজেদের ‘দুর্গ’ হিসেবে প্রমাণ করেছিল। তবে ২০১৬ সালের পরিসংখ্যানে দেখা গিয়েছিল, মাদারিহাট বাদে বাকি চারটি আসনই ছিল তৃণমূল কংগ্রেসের দখলে। এবারের ভোট তাই শাসকদলের কাছে যেমন হৃত ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের লড়াই, তেমনই বিজেপির কাছে নিজেদের শক্তঘাঁটি ধরে রাখার কঠিন পরীক্ষা।
এবারের লড়াই মূলত ত্রিমুখী। বিজেপি, তৃণমূল এবং বামেরা—তিন পক্ষই পাঁচটি আসনে প্রার্থী দিয়েছে। গত বিধানসভা নির্বাচনে মাদারিহাট থেকে রেকর্ড ভোটে জয়ী হয়েছিলেন বিজেপির মনোজ টিগ্গা, যিনি বর্তমানে এই জেলার সাংসদ। ফালাকাটায় জয়ী হয়েছিলেন দীপক বর্মন এবং কালচিনিতে বিশাল লামা। কুমারগ্রাম আসনে জয়লাভ করেছিলেন মনোজ ওঁরাও। তবে সবচেয়ে চর্চিত আসন হয়ে দাঁড়িয়েছে আলিপুরদুয়ার সদর। এখানকার বিদায়ী বিধায়ক সুমন কাঞ্জিলাল বিজেপির টিকিটে জিতলেও পরে তৃণমূলে যোগ দেন এবং এবার তৃণমূল তাঁকে এই আসন থেকেই পুনরায় প্রার্থী করেছে। এই ‘দলবদল’ ফ্যাক্টর ভোটারদের মনে কতটা প্রভাব ফেলে, তা ৪ মে ফল ঘোষণার দিন স্পষ্ট হবে। জেলার ৫টি আসনের মধ্যে ৪টিই (আলিপুরদুয়ার বাদে) সংরক্ষিত আসন হওয়ায় জনজাতি ও আদিবাসী ভোটব্যাঙ্কই এখানে জয়-পরাজয়ের প্রধান চাবিকাঠি।
আলিপুরদুয়ারের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হলো চা-বাগান এবং কৃষি। কিন্তু বর্তমানে সেই অর্থনীতি চরম সংকটের সম্মুখীন। জেলায় ৬০টিরও বেশি চা-বাগান থাকলেও তার মধ্যে একাধিক বাগান দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। শ্রমিকদের নুন আনতে পান্তা ফুরনোর দশা। এই চা-বলয়ের প্রায় সব রাজনৈতিক দলই এখন ‘মজুরি বৃদ্ধি’কে প্রধান অস্ত্র করেছে। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের চা-শ্রমিকরা দৈনিক ২৫০ টাকা মজুরি পান। ভোটের মুখে দাঁড়িয়ে সব দলই এই মজুরি ৩০০ টাকা করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে।
তৃণমূল কংগ্রেসের দাবি, বাম আমলে ধুঁকতে থাকা একের পর এক চা-বাগান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় খুলেছেন এবং শ্রমিকদের মাথার ওপর ছাদ দিতে ‘চা সুন্দরী’ প্রকল্পের মাধ্যমে ঘর তৈরি করে দিচ্ছেন। অন্যদিকে, বিজেপির পাল্টা প্রতিশ্রুতি—ক্ষমতায় এলে তারা শ্রমিকদের চা-বাগানের জমির মালিকানা দেবে এবং পাকা বাড়ি, শৌচালয় ও গ্যাসের সংযোগ নিশ্চিত করবে। তবে চা-শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, ভোট আসে ভোট যায়, কিন্তু কর্মসংস্থানের অভাব এবং দারিদ্র্যের অন্ধকার থেকে তাঁদের মুক্তি মেলে না।
শুধু চা-বাগান নয়, কৃষিভিত্তিক এই জেলার সাধারণ মানুষের কাছে পানীয় জলের সংকট একটি বিশাল সমস্যা। আদিবাসী ও জনজাতি অধ্যুষিত এলাকাগুলিতে শিক্ষার অভাব এবং স্কুলছুটের হার উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। দারিদ্র্যের কারণে অনেক পরিবারই শিশুদের স্কুলে না পাঠিয়ে ছোট কাজ বা অসংগঠিত শ্রমের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এছাড়া স্কুলের দূরত্ব এবং যাতায়াতের সুব্যবস্থা না থাকায় শিশুদের মধ্যে শিক্ষার প্রতি অনীহা তৈরি হচ্ছে। এই স্কুলছুটের হার কমানো বা এলাকার কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করা নিয়ে নেতাদের আশ্বাসের বন্যা বইলেও মাঠপর্যায়ে পরিস্থিতির বিশেষ বদল ঘটেনি।
প্রকৃতি পর্যটকদের কাছে আলিপুরদুয়ারকে স্বর্গসম করে তুললেও স্থানীয়দের কাছে বর্ষাকাল মানেই আতঙ্ক। তোর্ষা ও রায়ডাক নদীর ভয়াল রূপ প্রতি বছর জেলার আর্থ-সামাজিক অবস্থাকে লণ্ডভণ্ড করে দেয়। নদীভাঙন ও বন্যার ফলে ভিটেমাটি হারান কয়েক হাজার মানুষ। এর পাশাপাশি সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান এবং বনভূমি সংলগ্ন অঞ্চলে হাতি-মানুষের দ্বন্দ্ব এখানকার নিত্যদিনের সমস্যা। এই সমস্যাগুলির স্থায়ী সমাধানের বদলে প্রতি নির্বাচনেই তা কেবল নির্বাচনী ইস্তেহারের পাতাতেই সীমাবদ্ধ থাকে বলে অভিযোগ জেলাবাসীর।
স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর অপ্রতুলতা আলিপুরদুয়ারের মানুষের অন্যতম বড় দুশ্চিন্তা। নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা আইসিইউ-এর অভাব, দক্ষ চিকিৎসক ও উন্নত যন্ত্রপাতির ঘাটতি থাকায় জটিল রোগের চিকিৎসার জন্য আজও মানুষকে শিলিগুড়ি বা কলকাতায় ছুটতে হয়। গ্রামীণ উপকেন্দ্রগুলোতে পৌঁছানোর রাস্তাঘাট অত্যন্ত শোচনীয় হওয়ায় জরুরি অবস্থায় সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছানো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।
আলিপুরদুয়ার জেলার ৮০ শতাংশেরও বেশি মানুষ সংরক্ষিত সম্প্রদায়ের—রাজবংশী, রাভা, সাঁওতাল, টোটো ও ওঁরাও জনজাতিরা এখানে প্রধান শক্তি। ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি এই জেলায় এগিয়ে থাকলেও, তৃণমূলের ‘চা সুন্দরী’ প্রকল্প এবং বামেদের গ্রামীণ সংগঠন এবার লড়াইকে জোরদার করে তুলেছে। চা-শ্রমিকদের ঘর আর মজুরির স্বপ্ন কি এবার বাস্তব হবে? নাকি বর্ষার ভাঙনে আগের প্রতিশ্রুতির মতোই ভেসে যাবে সাধারণ মানুষের সব আশা? উত্তর মিলবে আগামী ৪ মে।
হিন্দুস্থান সমাচার / সোনালি