পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের প্রভাবে সংকটে পড়তে পারে নেপালের অর্থনীতি ও মানব উন্নয়ন : ইউএনডিপি রিপোর্ট
কাঠমান্ডু, ১১ মে (হি.স.) : পশ্চিম এশিয়ায় চলতে থাকা সংঘাতের জেরে নেপালের অর্থনীতি ও মানব উন্নয়নের উপর গভীর প্রভাব পড়তে পারে বলে সতর্ক করল রাষ্ট্রসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি)। সংস্থার প্রকাশিত সাম্প্রতিক সমীক্ষা রিপোর্টে বলা হয়েছে, আন্তর্জা
পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের প্রভাবে সংকটে পড়তে পারে নেপালের অর্থনীতি ও মানব উন্নয়ন : ইউএনডিপি রিপোর্ট


কাঠমান্ডু, ১১ মে (হি.স.) : পশ্চিম এশিয়ায় চলতে থাকা সংঘাতের জেরে নেপালের অর্থনীতি ও মানব উন্নয়নের উপর গভীর প্রভাব পড়তে পারে বলে সতর্ক করল রাষ্ট্রসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি)। সংস্থার প্রকাশিত সাম্প্রতিক সমীক্ষা রিপোর্টে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থা, রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং আমদানি নির্ভর অর্থনীতির কারণে নেপাল এই সংঘাতের অভিঘাতে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

ইউএনডিপি-র “মিলিটারি এস্কেলেশন ইন দ্য মিডল ইস্ট: হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট ইমপ্যাক্টস অ্যাক্রস এশিয়া অ্যান্ড দ্য প্যাসিফিক” শীর্ষক প্রাথমিক মূল্যায়ন রিপোর্টে জানানো হয়েছে, গত দু’মাস ধরে চলা সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে মানব উন্নয়নের ক্ষেত্রে নেপাল ও পাকিস্তান সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। রিপোর্টে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, যুদ্ধের ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনীতি দুর্বল হলে রেমিট্যান্সের পরিমাণ কমে যাবে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে সাধারণ পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা ও খাদ্য নিরাপত্তার উপর।

রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে কৃষিক্ষেত্রে বহুল ব্যবহৃত ফসফেট সার তৈরির অন্যতম উপাদান সালফারের পরিবহণ ব্যাহত হচ্ছে। পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের সহ-উৎপাদ সালফারের সরবরাহ ও মূল্য বৃদ্ধি নেপালের ধান উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, যা দেশের কৃষি অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি।

ইউএনডিপি-র পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, নেপালের কর্মসংস্থানের বড় অংশ বিদেশমুখী শ্রমবাজারের সঙ্গে যুক্ত। প্রায় ৮০ শতাংশ অভিবাসী শ্রমিক উপসাগরীয় দেশ ও মালয়েশিয়ায় কাজ করতে যান। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে শ্রমিকদের যাতায়াত কমবে এবং রেমিট্যান্সনির্ভর পরিবারগুলির আয় ও কর্মসংস্থান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

রিপোর্টে বলা হয়েছে, রেমিট্যান্স ও কৃষিক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়লে নেপালের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) বৃদ্ধির হার কমে যাবে। এর ফলে মানব উন্নয়ন সূচকের আয় সংক্রান্ত সূচকগুলিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো ক্ষেত্রেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

২০১৩ থেকে ২০২৩ সালের মানব উন্নয়ন সংক্রান্ত অগ্রগতির ভিত্তিতে তৈরি এই রিপোর্টে বলা হয়েছে, বহিরাগত ধাক্কা মোকাবিলায় শক্তিশালী নীতিগত ব্যবস্থার অভাবে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলি পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের কারণে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তুলনামূলকভাবে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলির উপর প্রভাব কম পড়বে।

অর্থনীতিবিদ পুষ্কর বজ্রাচার্যের মতে, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে মুদ্রাস্ফীতি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বাণিজ্য ও পর্যটন খাতে বড় ধাক্কা লাগবে এবং সাধারণ মানুষের ভোগক্ষমতা কমে যাবে। তাঁর কথায়, “অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার প্রায় ৩ শতাংশে নেমে আসতে পারে, যা গত ৭০ বছরের গড় ৪ শতাংশ বৃদ্ধির হারের থেকেও কম।”

তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, আগামী দু’বছর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মন্থর থাকতে পারে এবং দারিদ্র্যের হার বাড়তে পারে। তাঁর মতে, বর্তমানে নেপালের বড় অংশের মানুষই দারিদ্র্যসীমার নিচে বা তার কাছাকাছি অবস্থান করছেন। এই পরিস্থিতিতে আরও বড় অর্থনৈতিক ধাক্কা এলে বহু মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের মধ্যে চলে যেতে পারেন। সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের ২৫ থেকে ৩৩ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নীচে পৌঁছে যেতে পারেন বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি।

রিপোর্ট অনুযায়ী, রেমিট্যান্স কমে গেলে পারিবারিক আয় দুর্বল হবে এবং ক্রয়ক্ষমতাও কমে যাবে। নেপালের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক ‘নেপাল রাষ্ট্র ব্যাঙ্ক’-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ৪০ শতাংশই আসে উপসাগরীয় দেশগুলি থেকে। চলতি অর্থবর্ষের প্রথম আট মাসে নেপাল ১ খর্ব ৮৮ अरब নেপালি টাকা রেমিট্যান্স পেয়েছে। গত অর্থবর্ষে মোট ১ খর্ব ৭০ अरब টাকা রেমিট্যান্সের মধ্যে ৬৭ अरब ৩০ কোটি টাকা এসেছে উপসাগরীয় দেশগুলি থেকে।

বর্তমানে কাতার, সৌদি আরব, বাহরিন, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী ও ওমানে প্রায় ১৯ লক্ষ নেপালি শ্রমিক কাজ করছেন। প্রতি বছর বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য যাওয়া প্রায় ৭ লক্ষ নেপালি নাগরিকের মধ্যে সাড়ে ৪ লক্ষেরও বেশি উপসাগরীয় দেশগুলিতে যান।

ইউএনডিপি-র মতে, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় জীবনযাত্রার ব্যয়ও বেড়ে চলেছে। এর সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ছে দরিদ্র ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলির উপর। ধান রোপণের মরশুমের আগে খাদ্যশস্য ও সারের মূল্যবৃদ্ধি দক্ষিণ এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জের দেশগুলিতে খাদ্য সঙ্কট আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।

রিপোর্টে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, কর্মসংস্থান, অসংগঠিত ক্ষেত্র এবং ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পক্ষেত্র সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বে। বিশেষ করে মহিলা, অভিবাসী শ্রমিক এবং নিম্নআয়ের পরিবারগুলির উপর এই সংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে।

---------------

হিন্দুস্থান সমাচার / সৌমি বৈদ্য




 

 rajesh pande