
ডঃ মায়ঙ্ক চতুর্বেদী
ভারতীয় সাংবাদিকতার বর্তমান যুগে যেখানে একদিকে তথ্যের গতি অভূতপূর্বভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, ঠিক অন্যদিকে খবরের বিশ্বাসযোগ্যতা, আদর্শগত ভারসাম্য এবং সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে গভীর প্রশ্নও দেখা দিয়েছে। এমন একটি সময়ে ভারতের প্রথম বহুভাষী সংবাদ সংস্থা হিন্দুস্থান সমাচার তার মূল লক্ষ্য— 'রাষ্ট্র সর্বপ্রথম', ভারতীয় ভাষাগুলির প্রতি সম্মান এবং ইতিবাচক সাংবাদিকতাকে সঙ্গী করে নিরন্তর এগিয়ে চলেছে।
১০ এপ্রিল ১৯৪৮ সালে প্রখ্যাত চিন্তাবিদ দাদা সাহেব আপ্তে কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত 'হিন্দুস্থান সমাচার' ভারতের প্রথম বহুভাষী সংবাদ সংস্থা। বাংলা, ওড়িয়া, অসমীয়া, তেলুগু, মালয়ালম, উর্দু, পাঞ্জাবি, গুজরাটি, হিন্দি এবং মারাঠি সহ দশটি ভাষা নিয়ে শুরু হওয়া এই যাত্রা আজ ইংরেজি সহ ১৫টি ভারতীয় ভাষা পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছে। ২০০০ সালে শ্রীকান্ত জোশী এই সংস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করেন, যার ফলে আজ দেশের ২০০টিরও বেশি সংবাদপত্র, প্রসার ভারতীর অধীনস্থ দূরদর্শন ও আকাশবাণী, একাধিক নিউজ চ্যানেল, নিউজ ওয়েবসাইট এবং মিডিয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এর পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে।
সত্য, সংলাপ, সেবা এবং সমবায়কে মূল মন্ত্র হিসেবে মেনে কাজ করা এই সংস্থা সময়ে সময়ে অনেক উত্থান-পতন দেখেছে, কিন্তু নিজের মূল আদর্শগত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কখনো বিচ্যুত হয়নি। সম্প্রতি দ্বিতীয়বারের জন্য সর্বসম্মতিক্রমে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়া অরবিন্দ ভালচন্দ্র মার্ডিকর সাংবাদিকতার পরিবর্তিত রূপ, প্রযুক্তি, ফেক নিউজ (ভুয়ো খবর), ভারতীয় ভাষা এবং রাষ্ট্রদৃষ্টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। সেখানে তিনি সংবাদ মাধ্যমের বর্তমান রূপ এবং হিন্দুস্থান সমাচার সম্পর্কে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেছেন। সেই বিস্তারিত কথোপকথনের মূল অংশগুলি নিচে দেওয়া হলো :
প্রশ্ন : আপনি ২০১৬ সাল থেকে হিন্দুস্থান সমাচারের নেতৃত্বের বিভিন্ন ভূমিকার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা আপনাকে সংস্থার মূল চেতনা এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কী শিখিয়েছে?
উত্তর: সবচেয়ে বড় শিক্ষা যা আমি পেয়েছি, তা হলো সংযম। সাংবাদিকতার ক্ষেত্রটি প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জে ভরা থাকে। প্রতিটি চ্যালেঞ্জ আলাদা এবং তা কোনো পূর্ববিজ্ঞপ্তি ছাড়াই সামনে আসে। এমন সময়ে ধৈর্য বজায় রাখাই সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে দাঁড়ায়। আমার স্পষ্ট বিশ্বাস যে, হিন্দুস্থান সমাচারের প্রতিষ্ঠা অত্যন্ত শক্তিশালী আদর্শগত ভিত্তির ওপর হয়েছিল। আমাদের পূর্বসূরিরা একে কেবল একটি সংবাদ সংস্থা হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্রচেতনার এক অন্যতম মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। এই কারণেই সময় বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, মিডিয়ার রূপ বদলেছে, কিন্তু হিন্দুস্থান সমাচারের মূল চেতনা বদলায়নি। আমরা 'রাষ্ট্র সর্বপ্রথম'— এই ভাবনা নিয়ে এগিয়ে চলেছি এবং ভবিষ্যতেও এগিয়ে যাব। আমি বিশ্বাস করি, এই কারণেই এই সংস্থার ভবিষ্যৎ অত্যন্ত উজ্জ্বল।
প্রশ্ন: ডিজিটাল এবং সোশ্যাল মিডিয়ার এই যুগে ঐতিহ্যবাহী সংবাদ সংস্থাগুলির সামনে বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হিন্দুস্থান সমাচার এটিকে কীভাবে দেখে?
উত্তর: যদি খবর সত্য, ভারসাম্যপূর্ণ এবং তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়, তবে বিশ্বাসযোগ্যতার চ্যালেঞ্জ এমনিতেই শেষ হয়ে যায়। আজ সোশ্যাল মিডিয়া এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলি মানুষের কাছে দ্রুত তথ্য পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম মাত্র। আমরা সেগুলিকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং সহযোগী মাধ্যম বলে মনে করি।
হিন্দুস্থান সমাচার নতুন প্রযুক্তিকে আপন করে বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিজের শক্তিশালী উপস্থিতি তৈরি করেছে। তবে আমি সম্পূর্ণ বিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারি যে, আজও ঐতিহ্যবাহী ও মূলধারার সাংবাদিকতার ওপর মানুষের ভরসা সবচেয়ে বেশি। আর এই কারণেই খবরের কাগজের প্রাসঙ্গিকতা এখনও বজায় রয়েছে। আমাদের বিশ্বাস, ভবিষ্যৎ তাদেরই যারা ঐতিহ্যগত বিশ্বাসযোগ্যতা এবং আধুনিক প্রযুক্তি— দুটোকেই একসঙ্গে নিয়ে চলতে পারবে।
প্রশ্ন: আপনার নেতৃত্বে সংস্থার সম্পাদকীয় অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রে কী কী নতুন দিক দেখতে পাওয়া যাবে?
উত্তর: আমাদের প্রতিষ্ঠাই হয়েছিল ভারতীয়তা এবং রাষ্ট্রদৃষ্টিকে কেন্দ্রে রেখে। আমরা সংস্কার থেকে ইতিবাচক চিন্তাভাবনা এবং রাষ্ট্রস্বার্থের শিক্ষা পেয়েছি। তাই আমাদের ক্ষেত্রে দিক পরিবর্তন করা বা বিভ্রান্ত হওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। আমরা ইতিবাচক সাংবাদিকতায় বিশ্বাস করি। সমাজকে ভাঙা, বিভ্রান্তি ছড়ানো বা নেতিবাচকতা বাড়ানোর পরিবর্তে আমরা গঠনমূলক আলোচনাকে গুরুত্ব দিই। ভারতের সাংস্কৃতিক চেতনা, জাতীয় ঐক্য এবং জনাকাক্ষাকে কেন্দ্রে রেখে সাংবাদিকতা করাই আমাদের অগ্রাধিকার।
প্রশ্ন: আজ 'ফেক নিউজ' ( ভুয়ো খবর) সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আপনার সংস্থার তথ্য যাচাইয়ের নীতি কী?
উত্তর: এটা ঠিক যে, ফেক নিউজের শুরুর দিকে অনেক বড় বড় মিডিয়া সংস্থাও বিভ্রান্ত হয়েছিল। আমরাও তা থেকে শিক্ষা নিয়েছি। তবে আমরা আমাদের কার্যপদ্ধতিতে প্রয়োজনীয় সংস্কার করেছি। এখন যেকোনো খবর প্রকাশ করার আগে তার প্রাতিষ্ঠানিক উৎস, বিশেষজ্ঞদের মতামত, তথ্য এবং প্রমাণাদি গুরুত্ব সহকারে যাচাই করা হয়। আমাদের স্পষ্ট নীতি হলো—সত্য খবর, ঠিক যেমনটি ঘটেছে।
প্রশ্ন: ছোট শহর এবং আঞ্চলিক সাংবাদিকদের ক্ষমতায়নের জন্য হিন্দুস্থান সমাচার কী করছে?
উত্তর: ভারতের প্রকৃত রূপ ছোট শহর এবং গ্রামগুলিতেই বাস করে। তাই আঞ্চলিক প্রতিনিধিদের শক্তিশালী করা আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার। আমরা একটি আধুনিক মোবাইল অ্যাপ তৈরি করেছি, যার মাধ্যমে প্রতিনিধিরা যেকোনো জায়গা থেকে খবর লিখতে পারেন, ছবি যুক্ত করতে পারেন এবং তৎক্ষণাৎ আপলোড করতে পারেন। বিভিন্ন ভাষার সাংবাদিকদের সঙ্গে নিয়মিত ভার্চুয়াল আলোচনাও হয়। আমরা প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং মনোবল বাড়ানোর ওপর বিশেষ জোর দিই। যেকোনো প্রতিনিধির ভালো কাজের প্রশংসা করা আমাদের কার্যসংস্কৃতির অংশ।
প্রশ্ন: আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) এবং নতুন প্রযুক্তির এই যুগে সংস্থা কীভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছে?
উত্তর: প্রযুক্তি থেকে দূরে থেকে সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ গড়া সম্ভব নয়। হিন্দুস্থান সমাচার আগে থেকেই ক্লাউড-ভিত্তিক নিউজ প্রসেসিং সিস্টেম এবং মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করছে। এআই (এআই) নিয়ে আমাদের টিম ক্রমাগত কাজ করে চলেছে। সম্প্রতি আমরা কেন্দ্রীয় সরকারের ভাষিণী প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে অংশীদারিত্ব করেছি এবং তার একটি বড় অংশ আমাদের সিস্টেমের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গিয়েছে। ভারতীয় ভাষার সম্প্রসারণ এবং দ্রুত অনুবাদের ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি অত্যন্ত দরকারী প্রমাণিত হচ্ছে।
প্রশ্ন: ভারতীয় ভাষার সাংবাদিকতাকে আপনি কীভাবে দেখেন?
উত্তর: আমার মতে, ভারতীয় ভাষাগুলির ভবিষ্যৎ অত্যন্ত উজ্জ্বল। চ্যালেঞ্জ অবশ্যই আছে, তবে সম্ভাবনা তার চেয়েও অনেক বড়।
ভারত বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির দেশ। এই বৈচিত্র্যই আমাদের শক্তি। হিন্দুস্থান সমাচারের সবচেয়ে বড় জোর এখানেই যে, এটি একসঙ্গে ১৫টি ভারতীয় ভাষায় কাজ করছে এবং প্রতিটি ভাষাকে সমান সম্মান দেয়।
প্রশ্ন: আপনার গত কার্যকালের কোন কোন সাফল্য আপনাকে সবচেয়ে বেশি সন্তুষ্টি দেয়?
উত্তর: এমন অনেক সাফল্য রয়েছে যা সন্তুষ্টি দেয়; যেমন— জিএসটি, রেজিস্ট্রেশন, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, কাজের সঠিক বণ্টন, শৃঙ্খলা, আর্থিক পরিকল্পনা এবং সময়মতো সমস্ত আইনি প্রক্রিয়া মেনে চলা। তবে এর মধ্যেও সবচেয়ে বড় সন্তুষ্টি হলো, এই প্রতিষ্ঠানটি প্রতিনিয়ত আত্মনির্ভরতার দিকে এগিয়ে চলেছে।
প্রশ্ন: তরুণ সাংবাদিক এবং গণমাধ্যমের শিক্ষার্থীদের জন্য আপনার বার্তা কী?
উত্তর: কেউ যদি ভালো সাংবাদিক হতে চান, তবে তাঁকে সাধারণ জ্ঞান, ইতিহাস এবং নিজের ভাষার ওপর শক্তিশালী দখল তৈরি করতে হবে। কেবল প্রযুক্তি দিয়ে সাংবাদিকতা হয় না। ভালো সাহিত্য পড়া উচিত, প্রবীণ সাংবাদিক এবং অনুপ্রেরণাদায়ী ব্যক্তিত্বদের জীবনী পড়া উচিত। ইতিবাচক চিন্তাভাবনা, সচেতনতা এবং নিষ্কলঙ্ক আচরণ— এই তিনটি বিষয় একজন সাংবাদিককে দীর্ঘকাল ধরে সম্মান এনে দেয়।
প্রশ্ন: হিন্দুস্থান সমাচারকে প্রায়শই একটি নির্দিষ্ট আদর্শগত পটভূমির সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হয়। আপনি এটিকে কীভাবে দেখেন?
উত্তর: আমরা নিশ্চিতভাবেই একটি চিন্তাধারার প্রতিনিধিত্ব করি— আর তা হলো রাষ্ট্র সর্বপ্রথম। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য বোঝা প্রয়োজন। কোনো বিষয়ের পক্ষ নেওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু পক্ষপাতদুষ্ট হওয়া ভুল। আমরা জাতীয় স্বার্থ, সাংস্কৃতিক চেতনা এবং সামাজিক সম্প্রীতির পক্ষে, তবে কোনো রকম পূর্বানুমান বা কুসংস্কারের বশবর্তী নই। আমরা সমস্ত চিন্তাধারাকে স্থান দিই, কিন্তু রাষ্ট্রবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গিকে সাধারণ আলোচনার অংশ মনে করা উচিত বলে মনে করি না।
প্রশ্ন: আজ সংবাদ মাধ্যমের ওপর বাজার, টিআরপি এবং রাজনৈতিক মেরুকরণের চাপ দেখা যায়। এমন সময়ে ভারসাম্য বজায় রাখা কতটা কঠিন?
উত্তর: কঠিন নিশ্চয়ই, তবে অসম্ভব নয়। যদি সংবাদ মাধ্যম বিক্রি না হয়ে যায় এবং পক্ষপাতিত্ব থেকে দূরে থাকে, তবে তার ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। আমরা চাঞ্চল্য বা সেনসেশনের চেয়ে সত্যকে বেশি গুরুত্ব দিই। সবচেয়ে দ্রুত হওয়ার অন্ধ দৌড় থেকে দূরে থেকে আমরা খবর ঠিক যেমন ঘটে-সেই নীতিতে কাজ করি। ভারতীয় ভাষায় সাংবাদিকতা করা আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। মাটির সঙ্গে যুক্ত সাংবাদিকরাই আমাদের আসল ক্ষমতা।
প্রশ্ন: সবশেষে, যদি আপনাকে ভারতীয় সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এবং সবচেয়ে বড় সম্ভাবনাকে একটি করে বাক্যে বলতে বলা হয়, তবে কী বলবেন?
উত্তর: সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো— তথ্যের অতিমারির মধ্যে সত্যকে সুরক্ষিত রাখা। আর সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা হলো— ভারতীয় সমাজের শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত ইতিবাচক সাংবাদিকতার পুনর্জাগরণ। আমরা চ্যালেঞ্জকে সংকট নয়, সুযোগ মনে করি। হিন্দুস্থান সমাচার সেই বিশ্বাসের সঙ্গেই এগিয়ে চলেছে।
হিন্দুস্থান সমাচার / সোনালি