(রাউন্ড আপ ) মহাগুরুর আশীর্বাদ নিয়ে প্রথম জেলা সফরে শুভেন্দু: পুলিশ বোর্ড ভাঙা থেকে ‘যোগী মডেলে’ উচ্ছেদ, ফলতায় দাঁড়িয়ে ‘পুষ্পা’ জাহাঙ্গিরকে চরম হুঁশিয়ারি মুখ্যমন্ত্রীর
কলকাতা ও ডায়মন্ড হারবার, ১৬ মে (হি.স.) : পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে পালাবদলের পর মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেই নজিরবিহীনভাবে অ্যাকশন মোডে অবতীর্ণ হলেন শুভেন্দু অধিকারী। শনিবার তিনি দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলায় তাঁর প্রথম হাইপ্রোফাইল জেলা ও
শুভেন্দু অধিকারী


কলকাতা ও ডায়মন্ড হারবার, ১৬ মে (হি.স.) : পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে পালাবদলের পর মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেই নজিরবিহীনভাবে অ্যাকশন মোডে অবতীর্ণ হলেন শুভেন্দু অধিকারী। শনিবার তিনি দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলায় তাঁর প্রথম হাইপ্রোফাইল জেলা ও প্রশাসনিক সফর সম্পন্ন করলেন। তবে এই ব্যস্ত এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সফর শুরু করার ঠিক আগেই একবারে অন্য মেজাজে ধরা দিলেন রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী। সমস্ত সরকারি ও প্রশাসনিক কাজ শুরুর আগে তিনি সাতসকালে সোজা পৌঁছে যান নিউটাউনে টলিউডের মেগাস্টার তথা বিজেপির তারকা প্রচারক মিঠুন চক্রবর্তীর বাসভবনে।

সকালে মহাগুরুর বাড়িতে গিয়ে তাঁর সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ একান্ত বৈঠক করেন মুখ্যমন্ত্রী। বৈঠক শেষে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে শুভেন্দু অধিকারী অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে জয়ের ‘নেপথ্য কারিগর’ মিঠুন চক্রবর্তীর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “জনগণের ভোট এবং মানুষের আশীর্বাদ মাথায় নিয়ে নির্বাচনে জয়ী হয়েছি, দলীয় সিদ্ধান্তে আজ মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বসেছি ঠিকই; কিন্তু এই দীর্ঘ ও কঠিন রাজনৈতিক লড়াইয়ের নেপথ্যে যাঁদের অবদান সবচেয়ে বেশি, তাঁদের মধ্যে মিঠুনদা অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব।” মুখ্যমন্ত্রীর মুখে এমন অকুণ্ঠ প্রশংসা শুনে স্বভাবতই কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন রুপোলি পর্দার ‘মহাগুরু’। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শুভেন্দু অধিকারীকে স্নেহের আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরেন তিনি। এরপর শুভেন্দুর কাজের ভূয়সী প্রশংসা করে মিঠুন চক্রবর্তী দরাজ সার্টিফিকেট দিয়ে বলেন, “এর চেয়ে ভালো মুখ্যমন্ত্রী আর হবে না। পশ্চিমবঙ্গ এর থেকে ভালো মুখ্যমন্ত্রী পাবে না। শপথ নেওয়ার পর মুহূর্ত থেকে ইনি কাজ শুরু করেছেন। আগামী দিনে আর কী কী হয়, তা সকলে দেখবেন।”

মহাগুরুর ঘর থেকে সোজা ‘পাওয়ার করিডোর’-এ পা রাখেন মুখ্যমন্ত্রী। এই সৌজন্য সাক্ষাতের পরেই তিনি কনভয় নিয়ে রওনা দেন দক্ষিণ ২৪ পরগনার ডায়মন্ড হারবারের উদ্দেশে। সেখানে পৌঁছেই ‘সাগরিকা’ সরকারি টুরিস্ট লজে জেলা প্রশাসন ও রাজ্য পুলিশের শীর্ষ আধিকারিকদের নিয়ে একটি মেগা প্রশাসনিক ও আইনশৃঙ্খলা পর্যালোচনা বৈঠকে বসেন। এই বৈঠকেই তিনি রাজ্য পুলিশ সংস্কার, কাটমানি উদ্ধার, সিন্ডিকেট রাজের অবসান এবং সরকারি সম্পত্তি রক্ষার্থে একগুচ্ছ যুগান্তকারী ও কড়া সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন, যা একপ্রকার ‘যোগী মডেল’-এর প্রতিফলন বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।

ডায়মন্ড হারবারের প্রশাসনিক বৈঠক শেষে আয়োজিত জনবহুল সাংবাদিক সম্মেলনে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, “পশ্চিমবঙ্গে আর কোনোভাবেই ‘শাসকের আইন’ চলবে না, প্রতিষ্ঠা করা হবে শুধুমাত্র ‘আইনের শাসন’। রাজ্য পুলিশ ও প্রশাসনকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করতে হবে।” মুখ্যমন্ত্রী পুলিশ কর্তাদের নির্দেশ দেন, এখন থেকে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (বিএনএস)-এর অধীনে কঠোরভাবে এবং নিরপেক্ষভাবে প্রতিটি আইনি প্রক্রিয়া কার্যকর করতে হবে।

শুভেন্দুর স্পষ্ট বার্তা, “রাজ্যে পরিবর্তনের পর নতুন সরকারের প্রতি মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেড়েছে। সেই প্রত্যাশা পূরণ করাই আমাদের প্রধান দায়িত্ব।” তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, এখন থেকে প্রতিটি জেলার কাজের অগ্রগতি নবান্ন থেকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে এবং কোথাও কোনো প্রশাসনিক স্তরে গাফিলতি বা ঢিলেমি পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট আধিকারিকের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গ্রামীণ এলাকার রাস্তাঘাট, স্বাস্থ্য এবং শিক্ষা ব্যবস্থার পরিকাঠামো উন্নয়নকে এই মুহূর্তে সরকারের অগ্রাধিকারের তালিকায় শীর্ষে রাখা হয়েছে।

এদিনের প্রশাসনিক বৈঠকের সবচেয়ে বড় ও চাঞ্চল্যকর সিদ্ধান্তটি ছিল পুলিশ মহলের সংস্কার সংক্রান্ত। পূর্বতন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে ২০১২ সালে গঠিত হওয়া ‘পুলিশ ওয়েলফেয়ার বোর্ড’ এবং পুলিশের সমান্তরাল ফেডারেশনকে সম্পূর্ণভাবে ভেঙে দেওয়ার ঘোষণা করেন নতুন মুখ্যমন্ত্রী। ২০১১ সালে তৃণমূল সরকার ক্ষমতায় আসার পর পুলিশ ও পুলিশ পরিবারের স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং অবসরকালীন সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে এই বোর্ড গঠন করা হয়েছিল, যার সেন্ট্রাল কমিটিতে ছিলেন রাজ্য পুলিশের ডিরেক্টর জেনারেল (ডিজি)।

শুভেন্দু অধিকারী এদিন প্রকাশ্যেই ঘোষণা করেন, “পুলিশ ওয়েলফেয়ার বোর্ড আর থাকবে না। আগামী সোমবার (১৮ মে) এই বিষয়ে নবান্ন থেকে সরকারিভাবে বিজ্ঞপ্তি জারি করা হবে।” প্রশাসনিক মহলের মতে, পুলিশের অন্দরে পূর্বতন শাসকদলের যে একচেটিয়া রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ছিল, এই বোর্ড ভেঙে দেওয়ার মাধ্যমে তা এক ঝটকায় উপড়ে ফেলতে চাইলেন নতুন মুখ্যমন্ত্রী। তবে এর পাশাপাশি পুলিশ কর্মীদের স্বাচ্ছন্দ্য ও সুযোগ-সুবিধার বিষয়টি সরকার নিজে খতিয়ে দেখবে এবং রাজ্য পুলিশকে সম্পূর্ণ ‘মুক্ত হস্তে’ কাজ করার স্বাধীনতা দেওয়া হবে বলেও তিনি আশ্বস্ত করেছেন।

গ্রামাঞ্চলে সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার নামে বিগত দিনে যারা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ‘কাটমানি’ বা ঘুষ নিয়েছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে এবার সরাসরি ফৌজদারি পদক্ষেপ শুরু করতে চলেছে নতুন সরকার। মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, কাটমানি এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে বর্তমান সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ বা শূন্য সহনশীলতার নীতি নিয়ে চলবে।

মুখ্যমন্ত্রী সাধারণ মানুষের উদ্দেশ্যে বার্তা দিয়ে বলেন, “যদি কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের কোনো প্রকল্পের (যেমন আবাস যোজনা, ১০০ দিনের কাজ বা অন্যান্য সরকারি সুবিধা) টাকা পেতে কাউকে কাটমানি দিতে হয়ে থাকে, তবে তাঁরা সরাসরি তথ্যপ্রমাণ নিয়ে থানায় গিয়ে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করতে পারবেন।” তিনি আরও খোলসা করেন যে, যদি ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক প্রমাণ— যেমন অনলাইন টাকা ট্রান্সফারের নথি, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট স্টেটমেন্ট বা কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ থাকে, তবে পুলিশ সরাসরি অভিযুক্তকে গ্রেফতার করবে।

যাঁদের কাছে এই মুহূর্তে কোনো লিখিত বা ডিজিটাল ডকুমেন্ট নেই, তাঁরাও থানায় লিখিত অভিযোগ জানাতে পারবেন। পুলিশ প্রাথমিক তদন্ত করে যদি দেখে অভিযোগের সত্যতা রয়েছে, তবে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে একই সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী সতর্ক করে দিয়ে বলেন, “ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরে কেউ যেন আবার কারও বিরুদ্ধে কোনো মিথ্যা অভিযোগ না করেন। কারণ, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করলে অভিযোগকারীর বিরুদ্ধে কী কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যায়, সে কথাও ভারতীয় ন্যায় সংহিতায় (বিএনএস) স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে।”

বিগত ৫ বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গে পঞ্চায়েত নির্বাচন, বিধানসভা নির্বাচন বা অন্যান্য সময়ে যে ব্যাপক রাজনৈতিক হিংসা ও সন্ত্রাস হয়েছে, তার শিকার হওয়া সাধারণ মানুষদের সুবিচার দিতে বড় পদক্ষেপের কথা ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। শুভেন্দু অধিকারী বলেন, “বিগত বছরগুলিতে যারা রাজনৈতিক হিংসার শিকার হয়েছেন, অথবা পুলিশের একাংশের দ্বারা অন্যায়ভাবে অত্যাচারিত হয়েছেন, তাঁরা নতুন করে তথ্যপ্রমাণ সহ থানায় গিয়ে অভিযোগ জানান। প্রতিটির নতুন করে এফআইআর গ্রহণ করা হবে।”

বিশেষ করে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা এবং ভোট-পরবর্তী হিংসায় ঘরছাড়া বা অত্যাচারিত মহিলারা যাতে পুনরায় নির্ভয়ে থানায় গিয়ে অভিযোগ জানাতে পারেন, তার জন্য পুলিশকে সংবেদনশীল হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী সাফ জানান, অতীতে প্রভাবশালীদের চাপে যেসব অভিযোগ ধামাচাপা দেওয়া হয়েছিল, এবার সেই সব ফাইল নতুন করে খোলা হবে।

পরিবহন ক্ষেত্র এবং ফুটপাথের ছোট ব্যবসায়ীদের স্বস্তি দিয়ে শুভেন্দু অধিকারী এদিন ডায়মন্ড হারবার থেকে তোলাবাজদের উদ্দেশ্যে চরম হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি বলেন, “আজ থেকে অটো, টোটো কিংবা হকারদের কাছ থেকে কোনো রাজনৈতিক সিন্ডিকেট বা ইউনিয়ন এক টাকাও তোলা তুলতে পারবে না। রাস্তায় সমস্ত ধরনের বেআইনি টোল প্লাজা ও গেট বন্ধ করতে হবে। যদি কেউ জোর করে টাকা চাইতে আসে, সাধারণ মানুষ ও চালকরা সোজা থানায় চলে যাবেন। বাকিটা থানা বুঝে নেবে।”

আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কোনো ধরনের আপস করা হবে না জানিয়ে তিনি বলেন, কোনোভাবেই সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর করা বা ক্ষতিগ্রস্ত করা রেয়াত করা হবে না। একই সঙ্গে পুলিশ কর্মীদের ওপর হামলার ঘটনাতেও কড়া অবস্থান নিয়েছেন তিনি। শুভেন্দু বলেন, “কোনো পুলিশ কর্মীর গায়ে যদি কেউ হাত তোলে, তবে তাকে ছেড়ে কথা বলা হবে না।” রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং পুলিশের ঘাটতি মেটাতে আগামী আরও দু’মাস কেন্দ্রীয় বাহিনী (সিএপিএফ) যাতে রাজ্যে মোতায়েন থাকে, তার জন্য তিনি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে ব্যক্তিগতভাবে অনুরোধ জানাবেন বলেও সাংবাদিক বৈঠকে উল্লেখ করেন।

শুক্রবার আসানসোলের জাহাঙ্গীর মহল্লা পুলিশ ফাঁড়িতে ধর্মীয় স্থানে লাউডস্পিকার বাজানোর আইনি বিধির বিরোধিতা করে একদল দুষ্কৃতী যে নজিরবিহীন তাণ্ডব ও ভাঙচুর চালিয়েছে, সেই ঘটনার প্রেক্ষিতে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের স্টাইল বা ‘যোগী মডেলে’ কড়া পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।

তিনি স্পষ্ট জানান, যারা এই সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ঘটনার সঙ্গে যুক্ত, তাদের চিহ্নিত করে এমন কড়া শাস্তি দেওয়া হবে যা উদাহরণ হয়ে থাকবে। উত্তরপ্রদেশে যেমন অপরাধীদের বিরুদ্ধে ‘বুলডোজার অ্যাকশন’ এবং ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নেওয়া হয়, বাংলায় সরকারি সম্পত্তি ধ্বংসকারীদের বিরুদ্ধে ঠিক একই অবস্থান নেওয়া হবে বলে ‘সাগরিকা’ টুরিস্ট হলের বৈঠক থেকে হুঁশিয়ারি দেন শুভেন্দুবাবু।

প্রশাসনিক বৈঠকের মাঝেই রাজ্য পুলিশের ডিরেক্টর জেনারেল (ডিজি)-কে এক অত্যন্ত মানবিক ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, মহিলা পুলিশ অফিসার এবং মহিলা কনস্টেবলদের পোস্টিং বা বদলির ক্ষেত্রে তাঁদের স্বাচ্ছন্দ্যের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে হবে। দূরদূরান্তের জেলায় বদলি না করে তাঁদের পার্শ্ববর্তী জেলাতে কাজের সুযোগ দেওয়া উচিত। উদাহরণস্বরূপ তিনি বলেন, “যিনি আলিপুরদুয়ারের বাসিন্দা, তাঁকে উত্তর দিনাজপুর বা শিলিগুড়িতে কাজের সুযোগ দিলে ভালো হয়, যাতে তাঁকে সংসার ছেড়ে সুদূর পুরুলিয়া বা বাঁকুড়ায় এসে কাজ করতে না হয়।” একই সঙ্গে যে সব মহিলা পুলিশ কর্মীরা দীর্ঘ ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে চাকুরিরত, তাঁদের নিজেদের হোম-ডিস্ট্রিক্ট বা নিজস্ব জেলাতেই পোস্টিং দেওয়া যায় কি না, তা নিয়ে ইতিবাচক চিন্তাভাবনার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

ডায়মন্ড হারবারের মেগা প্রশাসনিক বৈঠক শেষ করেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী রওনা দেন ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রের উদ্দেশ্যে, যেখানে আগামী ২১ মে হাইভোল্টেজ পুনর্নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। তবে মুখ্যমন্ত্রীর ফলতায় পা রাখার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেই ফলতা থানার পুলিশ এক বড়সড় সাফল্য পায়। উচ্ছেদ ও গ্রেফতারি অভিযানে পুলিশ গ্রেফতার করে ফলতার দাপুটে তৃণমূল নেতা জাহাঙ্গির খানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং আত্মীয় হিসেবে পরিচিত সাইদুল খানকে।

স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে সাইদুল খান অত্যন্ত পরিচিত মুখ এবং তিনি ফলতা পঞ্চায়েত সমিতির সহ-সভাপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও সামলেছেন। এলাকায় তাঁকে জাহাঙ্গির খানের ‘ডান হাত’ বলেই সবাই জানত। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি কয়েকজন ভুক্তভোগী ফলতা থানায় সাইদুলের বিরুদ্ধে জোরপূর্বক জমি দখল, চাঁদাবাজি এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছিলেন। তদন্তে নেমে প্রয়োজনীয় তথ্যপ্রমাণ হাতে আসতেই পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে। মুখ্যমন্ত্রীর সভার ঠিক আগে এই হেভিওয়েট গ্রেফতারিতে ফলতার রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে।

বিকেলের দিকে ফলতার নির্বাচনী প্রচার সভায় পৌঁছান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সেখানে জনসমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে বিজেপি প্রার্থী দেবাংশু পণ্ডাকে এক লাখের বেশি ভোটে জেতানোর ডাক দেন তিনি। একই সঙ্গে মঞ্চ থেকে সুর চড়িয়ে তীব্র আক্রমণ করেন ফলতার তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গির খানকে, যিনি উত্তরপ্রদেশের পুলিশ পর্যবেক্ষক অজয়পাল শর্মার সঙ্গে ঠান্ডা লড়াইয়ের পর নিজেকে সিনেমার কায়দায় ‘পুষ্পা’ বলে দাবি করেছিলেন এবং স্লোগান দিয়েছিলেন ‘ঝুঁকেগা নেহি’।

জাহাঙ্গিরকে তীব্র কটাক্ষ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “কোথায় গেল ওই ডাকাতটা? পুষ্পা না কী যেন নাম! এখন আর দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না কেন? ওর সমস্ত গুন্ডামির ব্যবস্থা আমি নিজে করব, সেই দায়িত্ব আপনারা আমার উপর ছেড়ে দিন।” শুভেন্দু মনে করিয়ে দেন, ২০২১ সালের বিধানসভা ভোট-পরবর্তী হিংসার ঘটনার পর জাতীয় মানবাধিকার কমিশন যে ১৯ জন ‘নটোরিয়াস ক্রিমিনাল’ বা কুখ্যাত অপরাধীর তালিকা পেশ করেছিল, তার মধ্যে এই জাহাঙ্গির খানের নামও জ্বলজ্বল করছিল। রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পর দিন দশেক অন্তরালে থাকার পর গতকালই পুলিশের পাহারায় বেলসিংহের বাড়িতে ফিরেছেন জাহাঙ্গির এবং পুনরায় দলীয় কার্যালয় খুলে অবাধ্য সুর চড়ানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে দিয়েছেন, ফলতার মাটিতে আর কোনো গুন্ডামি বরদাস্ত করা হবে না।

জাহাঙ্গিরের পাশাপাশি ডায়মন্ড হারবারের বিদায়ী তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কেও নাম না করে তুলোধনা করেন শুভেন্দু। তিনি বলেন, “যাঁদের নির্দেশে ও উসকানিতে এতদিন ফলতার শান্তিকামী মানুষের ওপর অত্যাচার হয়েছে, তাঁদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে কড়া আইনি পদক্ষেপ করা হবে। কার কার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল, সব কল রেকর্ডস এবং হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট খতিয়ে দেখা হচ্ছে।” তবে একই সঙ্গে রাজনৈতিক সৌজন্যের বার্তা দিয়ে তিনি বলেন, “বিজেপি মানেই সংস্কৃতি। আমরা তৃণমূলের মতো বলি না যে ভোটের ফলের পর বিরোধী দমনের ডিজে বাজবে। আমাদের রাজ্য সভাপতি স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন, অভিনন্দন যাত্রা করুন, কিন্তু কোনো অনিচ্ছুক সাধারণ মানুষের গায়ে যেন জোর করে আবির দেওয়া না হয়।”

ফলতা অঞ্চলের সামগ্রিক ভোলবদল এবং গ্রামীণ অর্থনীতির পরিকাঠামো মজবুত করতে এদিন মঞ্চ থেকে একটি ‘স্পেশাল ডেভেলপমেন্ট প্যাকেজ’ বা বিশেষ অর্থনৈতিক উন্নয়নমূলক প্যাকেজেরও ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দু অধিকারীর এই প্রথম দক্ষিণ ২৪ পরগনা সফর এবং একই দিনে প্রশাসনিক কড়া পদক্ষেপ ও রাজনৈতিক আক্রমণের মিশেল আগামী ২১ মে-র ফলতা পুনর্নির্বাচনের ভাগ্য নির্ধারণে অত্যন্ত বড় ভূমিকা নিতে চলেছে।

হিন্দুস্থান সমাচার / সোনালি




 

 rajesh pande