
শ্রীভূমি (অসম) ১৮ মে (হি.স.) : অমর উনিশের চেতনাকে হৃদয়ে ধারণ করে সোমবার প্রতিকূল আবহাওয়াকেও উপেক্ষা করে শ্রীভূমির রাজপথে নেমে এল অগণিত ভাষাপ্রেমী মানুষ। মাতৃভাষার অধিকার, ভাষা শহিদদের আত্মবলিদান এবং বাঙালির আত্মমর্যাদার স্মৃতিকে সামনে রেখে মাতৃভাষা উদযাপন সমিতির উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয় এক বিশাল মহামিছিল। বিকেল চারটায় শম্ভু সাগর উদ্যানে অবস্থিত জাতীয় শহিদ বেদীতে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে মহামিছিলের শুভ সূচনা করেন ১৯৬১ সালের ভাষা আন্দোলনের ভাষা সেনানী সতু রায় সহ অন্যান্য বিশিষ্টজনেরা।
শহরের মেইন রোড পরিক্রমা করে মিছিলটি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর মূর্তির পাদদেশে গিয়ে সমাপ্ত হয়। এদিনের মহামিছিলে শ্রীভূমির রাজপথ যেন ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি ও আবেগে নতুন করে জেগে ওঠে। হাজারো কণ্ঠে ধ্বনিত হয় — “ভাষা শহিদ অমর রহে”। রাত পোহালেই ১৯ মে, সেই ঐতিহাসিক দিনকে সামনে রেখে ভাষাপ্রেমীদের আবেগে উদ্বেল হয়ে ওঠে গোটা সীমান্ত শহর।
এদিন ভাষা সেনানী সতু রায় আক্ষেপের সুরে বলেন, একাদশ ভাষা শহিদের আত্মবলিদানের ৬৫ বছর পেরিয়ে গেলেও আজও সরকারি স্বীকৃতি মেলেনি। তিনি বলেন, “ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখতে যুব সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। আমরা আজ ভাষাকে পিছনে ফেলে ধর্ম নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। আগে ভাষাকে রক্ষা করতে হবে, তাহলেই ধর্মও রক্ষা পাবে।” তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে ভাষা ও সংস্কৃতির অস্তিত্ব রক্ষার গভীর উদ্বেগ।
প্রতিকূল আবহাওয়ার পূর্বাভাস থাকা সত্ত্বেও বিকেলের অনেক আগেই শম্ভু সাগর উদ্যানে জড়ো হন হাজার হাজার মানুষ। জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক সংগঠন, সাহিত্য মঞ্চ, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক-শিক্ষিকা, ছাত্র-ছাত্রী ও সচেতন নাগরিকরা মিছিলে যোগ দেন। বাজারিছড়া, রামকৃষ্ণনগর, পাথারকান্দি, বদরপুর, শ্রীগৌরী, নিলামবাজার, চরগোলা সহ গ্রামাঞ্চলের বহু সংগঠন ও সাধারণ মানুষও এদিনের পথচলায় শামিল হন।
মহামিছিলে অংশগ্রহণকারী সংগঠনগুলির মধ্যে ছিল নূপুর নৃত্যালয়, সরস্বতী বিদ্যানিকেতন, গীতবিতান সাংস্কৃতিক সংস্থা, শ্রীভূমি সরস্বতী মহাবিদ্যালয়, সুরমন্দির, সুরসপ্তক, সর্বভারতীয় সিলেটি ফোরাম, খুশি স্মৃতি সংস্থা, নৃত্যগাঁথা কলাকেন্দ্র, যোগমায়া সংগীত মহাবিদ্যালয়, সুর মন্দির সাংস্কৃতিক কলা কেন্দ্র, নৃত্য কলা ক্ষেত্র, রবিবারের সাহিত্য আড্ডা, নবতরঙ্গ, মহর্ষি বিদ্যামন্দির, কত সুর কত গান মিউজিক একাডেমি, সপ্তসুর সাংস্কৃতিক সংস্থা, করিমগঞ্জ সিনিয়র সেকেন্ডারি স্কুল অফ সায়েন্স, বিবেকানন্দ কলেজ অফ এডুকেশন, বিশ্ববীণা নাট্য ও সাংস্কৃতিক সংস্থা, মোহনা সাহিত্য পত্রিকা এবং ডিস্ট্রিক্ট অ্যাডভোকেটস বার শ্রীভূমি সহ অসংখ্য সংগঠন।
মহামিছিল উপলক্ষে আয়োজিত সভায় ভাষা আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ের সংগ্রামী ব্যক্তিত্বরা গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন। ১৯৬১ সালের ভাষা আন্দোলনের সৈনিক সুখেন্দু বিকাশ পাল বলেন, মাতৃভাষার অধিকার এবং বহুভাষিক ঐক্যকে অক্ষুণ্ণ রাখতে নতুন প্রজন্মকে সচেতন হতে হবে। তিনি বলেন, “সময়ের সঙ্গে সবকিছুর পরিবর্তন হচ্ছে, কিন্তু ভাষা ও সংস্কৃতির পরিবর্তন যাতে না হয় সেদিকে নজর রাখতে হবে।”
আইনজীবী জ্যোতিষ পুরকায়স্থ ভাষা আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সতর্ক করে বলেন, “ভাষা আগ্রাসনের একটি গভীর ষড়যন্ত্র আজও সক্রিয়। এই মহামিছিল আমাদের মধ্যে ভাষা সচেতনতার চেতনা জাগিয়ে তোলে।” ১৯৮৬ সালের ভাষা আন্দোলনের সৈনিক মিশন রঞ্জন দাস বলেন, কেন্দ্র সরকার নতুন শিক্ষাবর্ষে মাতৃভাষায় শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করার কথা বলেছে। তিনি অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানান সন্তানদের মাতৃভাষার প্রতি মনোযোগী করে তুলতে।
ভাষা সৈনিক রজত চক্রবর্তী বলেন, “ভাষা আগ্রাসন এখনও চলছে। তাই আমাদের সবসময় সচেতন ও সতর্ক থাকতে হবে।” বঙ্গ সাহিত্য ও শহিদ সমিতির সভাপতি সৌমিত্র পাল বলেন, “বিগত বছরের মতো এবারও উনিশের চেতনায় সমৃদ্ধ এক অরাজনৈতিক পথচলার নীরব সাক্ষী থাকল শ্রীভূমির রাজপথ।”
চেতনার উনিশ আয়োজক কমিটির পক্ষে অরূপ রায় ১৯ মে সকালে শহিদ শ্রদ্ধা নিবেদন এবং সন্ধ্যায় প্রদীপ প্রজ্বলন কর্মসূচিতে সকলকে উপস্থিত থাকার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি ঘোষণা করেন, ১৯৮৬ সালের ২১ জুলাই ভাষা আন্দোলনের ৪০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বর্ষব্যাপী নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে।
এদিনের মহামিছিলে উপস্থিত ছিলেন রতি রঞ্জন শর্মা, সুব্রত চৌধুরী, অমিতাভ চৌধুরী, সিদ্ধার্থ শেখর পাল চৌধুরী, হুসেন আহমেদ, তাপস পুরকায়স্থ, সুব্রত ভট্টাচার্য, বিষ্ণু নাগ সহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি ও ভাষাপ্রেমী মানুষ।
হিন্দুস্থান সমাচার / স্নিগ্ধা দাস