
উদয়পুর (ত্রিপুরা), ১৮ মে (হি.স.) : শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অসংখ্য ভক্তের আস্থা, বিশ্বাস ও ভক্তির কেন্দ্র হয়ে রয়েছে ত্রিপুরার অন্যতম শ্রেষ্ঠ তীর্থক্ষেত্র মাতাবাড়ি, ত্রিপুরাসুন্দরী মন্দির। সোমবার সেই ভক্তির এক অনন্য বহিঃপ্রকাশের সাক্ষী থাকল মন্দির প্রাঙ্গণ। সকাল থেকে একে একে খোলা হয় মন্দিরের ১৬টি সিন্দুক ও প্রণামী বাক্স। দিনভর চলে গণনার কাজ, আর প্রতিটি নোট ও মুদ্রার সঙ্গে যেন ধরা পড়ে ভক্তদের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও প্রার্থনা।
প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, শুধু ভারতীয় মুদ্রাই নয়, প্রণামী বাক্স থেকে উদ্ধার হয়েছে বিভিন্ন দেশের বৈদেশিক মুদ্রাও। এর মধ্যে রয়েছে মার্কিন ডলার, সৌদি আরব ও কুয়েতের দিনার, নেপালের মুদ্রা এবং বাংলাদেশের টাকা। এই বৈদেশিক মুদ্রার উপস্থিতি যেন নিঃশব্দে জানিয়ে দিল—মাতা ত্রিপুরা সুন্দরীর মাহাত্ম্য আজ আর কেবল রাজ্য বা দেশের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়; দেশ-বিদেশের অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে সমানভাবে বিরাজ করছেন তিনি।
প্রণামী গণনার কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে গোমতী জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে জেলাশাসক দফতর থেকে ১৬ সদস্যের একটি বিশেষ দল গঠন করা হয়। সকাল থেকেই কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে শুরু হয় গণনার প্রক্রিয়া। মাঝেমধ্যে বৃষ্টির কারণে কিছুটা ব্যাঘাত ঘটলেও প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে কাজ অব্যাহত থাকে। ডেপুটি কালেক্টর চন্দ্রশেখর চট্টোপাধ্যায় জানান, সন্ধ্যা ৮টা থেকে ৯টার মধ্যেই গণনার কাজ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
মন্দির কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রাপ্ত অর্থ মন্দিরের সংস্কার, রক্ষণাবেক্ষণ, নিয়মিত পূজা-পার্বণ এবং ভক্তদের জন্য আরও উন্নত পরিষেবা প্রদানে ব্যয় করা হবে। অর্থাৎ ভক্তদের অর্ঘ্য আবারও ফিরে আসবে মায়ের সেবায় এবং তাঁর দর্শনার্থীদের কল্যাণে।
এদিনের গণনার মধ্যে এক হৃদয়স্পর্শী ঘটনা সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সিআরপিএফ-এর জওয়ান বুদ্ধদেব দাস নিজের চাকরির প্রথম মাসের সম্পূর্ণ বেতন—৩৩ হাজার ৩১০ টাকা—মায়ের চরণে প্রণামী হিসেবে অর্পণ করেন। তাঁর এই আত্মনিবেদিত দান উপস্থিত সকলের হৃদয় স্পর্শ করে। অনেকের চোখে জল এসে যায়, কারণ এই দানের মধ্যে ছিল কৃতজ্ঞতা, বিশ্বাস এবং এক সন্তানের অন্তরের নিবেদন।
মাতাবাড়ির প্রণামী বাক্সে জমা হওয়া প্রতিটি টাকা যেন এক একটি মনের কথা—কেউ প্রার্থনা করেছেন সন্তানের মঙ্গল কামনায়, কেউ রোগমুক্তির আশায়, কেউবা কৃতজ্ঞতায় নত হয়ে। দেশ-বিদেশের মানুষের এই অগাধ বিশ্বাস আবারও প্রমাণ করল, মাতা ত্রিপুরা সুন্দরী শুধু একটি মন্দিরের অধিষ্ঠাত্রী নন; তিনি কোটি ভক্তের আশ্রয়, ভরসা ও আধ্যাত্মিক শক্তির উৎস।
সোমবারের এই প্রণামী গণনা তাই শুধু অর্থ গণনার ঘটনা নয়, এটি ছিল ভক্তি, আবেগ ও অটুট বিশ্বাসের এক অনন্য দলিল। মাতাবাড়ির পবিত্র প্রাঙ্গণ যেন আবারও সাক্ষ্য দিল—মায়ের ডাকে সাড়া দিয়ে পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে মানুষ আজও এসে মাথা নত করেন তাঁর চরণে।
হিন্দুস্থান সমাচার / গোবিন্দ দেবনাথ