
দুর্গাপুর, ২০ মে (হি.স.): নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর প্রথম দক্ষিণবঙ্গ সফরের আগেই দুর্গাপুরে বড়সড় সাফল্য পেল রাজ্য পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স । উদ্ধার হলো ৪টি আগ্নেয়াস্ত্র, বিপুল পরিমাণ তাজা কার্তুজ এবং দুটি ম্যাগাজিন। বুধবার এই ঘটনাকে ঘিরে শিল্পাঞ্চল তথা রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক শোরগোল ও জল্পনা শুরু হয়েছে। আগামী বৃহস্পতিবার দুর্গাপুরে দক্ষিণবঙ্গের পাঁচ জেলার আধিকারিকদের নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর প্রথম হাইপ্রোফাইল প্রশাসনিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে চলেছে।
পুলিশ ও এসটিএফ সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার রাতে আসানসোল-দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চলে এক গোপন অভিযান চালিয়ে দুই অস্ত্র পাচারকারীকে গ্রেফতার করা হয়। ধৃতদের নাম ফিরোজ হাসান (বাসিন্দার দুর্গাপুর নইম নগর) এবং মহম্মদ সনু (বাসিন্দার আসানসোল উত্তর থানার বাবুতলা)। এসটিএফ জানিয়েছে, ধৃতদের কাছ থেকে ২টি ৭.৬৫ এমএম ) পিস্তল, ২টি দেশি ওয়ান শটার বন্দুক, ২টি ম্যাগাজিন এবং ৩০ রাউন্ড তাজা কার্তুজ উদ্ধার হয়েছে। পুলিশি সূত্রে খবর, ধৃত ফিরোজ হাসান তৃণমূল কংগ্রেস ঘনিষ্ঠ এবং সে মূলত বেআইনি আগ্নেয়াস্ত্র তৈরি ও পাচারের সঙ্গে যুক্ত। এর আগেও সে অস্ত্র পাচারের অভিযোগে ধরা পড়েছিল। অন্য দিকে, মহম্মদ সনু একজন কুখ্যাত ক্যারিয়ার বা পাচারকারী হিসেবে পরিচিত। মুখ্যমন্ত্রীর সফরের ঠিক আগে এত অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় ধৃতদের কোনও নাশকতার ছক ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে এসটিএফ তদন্ত শুরু করেছে।
প্রসঙ্গত, বৃহস্পতিবার দুপুর দুটোয় দুর্গাপুরের ‘সৃজনী’ প্রেক্ষাগৃহে পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমান, বীরভূম, বাঁকুড়া এবং পুরুলিয়া—এই পাঁচ জেলার প্রশাসন, পুলিশ আধিকারিক ও বিধায়কদের নিয়ে একটি মেগা প্রশাসনিক পর্যালোচনা বৈঠক করবেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। রাজ্য রাজনীতি ও অর্থনীতির নিরিখে এই পাঁচ জেলার গুরুত্ব অপরিসীম। বিশেষ করে আসানসোল-দুর্গাপুর এবং বাঁকুড়ার শিল্পাঞ্চলে নতুন করে শিল্পায়ন নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী কী বার্তা দেন, সেদিকে চাতক পাখির মতো তাকিয়ে রয়েছেন দক্ষিণবঙ্গবাসী।
উল্লেখ্য, সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনে এই পাঁচ জেলায় অভূতপূর্ব ফল করেছে বিজেপি। বাঁকুড়া, পুরুলিয়া ও পশ্চিম বর্ধমানে তৃণমূল কংগ্রেস খাতা খুলতে পারেনি। পূর্ব বর্ধমানে মাত্র কয়েকটি আসন পেয়েছে তারা এবং বীরভূমেরও সিংহভাগ আসন গেরুয়া শিবিরের দখলে। ফলে এই ‘গেরুয়া অধ্যুষিত’ অঞ্চলের জন্য মুখ্যমন্ত্রী কোনও বিশেষ প্যাকেজ বা উপহার ঘোষণা করেন কি না, তা নিয়ে আগ্রহ তুঙ্গে।
বিগত দিনে এই বিস্তীর্ণ অঞ্চল বালি, কয়লা, গরু এবং মাদক পাচারের ‘গ্রিন করিডোর’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল। মাফিয়া ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে নাজেহাল ছিলেন সাধারণ মানুষ। অজয় ও দামোদর নদকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বালি মাফিয়ারাজ এবং কয়লা খনি অঞ্চলের মাফিয়াদের দমনে মুখ্যমন্ত্রী প্রশাসনকে কী কড়া বার্তা দেন, সেদিকেও নজর রয়েছে বাসিন্দাদের। নতুন সরকার গঠনের পর থেকেই পুলিশকে ‘ফ্রি হ্যান্ড’ বা স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়ায় রাজ্য জুড়ে পুরনো বকেয়া মামলায় ধরপাকড় শুরু হয়েছে।
এদিকে, প্রশাসনিক বৈঠককে ঘিরে দুর্গাপুর শহর জুড়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিরেট করা হয়েছে। মোড়ে মোড়ে চলছে নাকা চেকিং এবং রাতে বাসস্ট্যান্ডগুলিতে মহিলা যাত্রীদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে বিশেষ পুলিশি টহলদারি চলছে। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, কোন কোন উন্নয়নমূলক কাজ কী পর্যায়ে আটকে রয়েছে, তা এই স্ক্যানিং বৈঠকের আগে সংশ্লিষ্ট জেলাশাসকরা নিজেরা খতিয়ে দেখছেন। এর আগে তৃণমূল সরকারের আমলেও দুর্গাপুরে এই ধরনের বৈঠক হতো, তবে শেষ কয়েক বছর তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখানে এসে রিভিউ বৈঠক করেননি। যার ফলে প্রশাসনিক কাজে একপ্রকার স্থবিরতা তৈরি হয়েছিল বলে ওয়াকিবহাল মহলের মত।
শিল্পশহরের বাসিন্দাদের আরেকটি বড় প্রত্যাশা হলো বন্ধ ও ধুঁকতে থাকা কারখানাগুলির পুনরুজ্জীবন। রাজ্য সরকারের ধুঁকতে থাকা ‘দুর্গাপুর প্রজেক্টস লিমিটেড’ , বন্ধ হয়ে যাওয়া ‘দুর্গাপুর কেমিক্যালস’ এবং কেন্দ্রের অধীনে থাকা বন্ধ এমএএমসি, ফার্টিলাইজার, বিওজিএল ও বার্ন স্ট্যান্ডার্ডের মতো কারখানাগুলির ভবিষ্যৎ নিয়ে এই ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকারের নীতি কী হয়, তা দেখতে উদগ্রীব সকলে। ইতিমধ্যেই বৈঠককে কেন্দ্র করে সৃজনী প্রেক্ষাগৃহকে সুন্দর করে সাজিয়ে তোলা হয়েছে।
এই বিষয়ে দুর্গাপুর পূর্বের বিজেপি বিধায়ক চন্দ্রশেখর বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “আমাদের লক্ষ্য একটাই, কলকাতার পরই বিজেপি সরকারের প্রধান গন্তব্য হলো দুর্গাপুর। এবারের বাজেটে কেন্দ্র সরকার দুর্গাপুরকে ‘শিল্প করিডোর’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। শপথ নেওয়ার পর প্রথমবার মুখ্যমন্ত্রী এখানে আসছেন এবং দুর্গাপুরকে কেন্দ্র করেই দক্ষিণবঙ্গের উন্নয়নের মূল নকশা তৈরি হবে।” অন্যদিকে, দুর্গাপুর পশ্চিমের বিজেপি বিধায়ক লক্ষ্মণ ঘোরুই বলেন, “দুর্গাপুরের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা এবার পূরণ হতে চলেছে। শিল্প করিডোর তৈরি, বন্ধ কারখানা পুনরুজ্জীবনের আশার পাশাপাশি আসন্ন দুর্গাপুর পুরসভার নির্বাচন নিয়েও এই সফরে ইতিবাচক আলোচনা হতে পারে।”
হিন্দুস্থান সমাচার / জয়দেব লাহা