
দুর্গাপুর, ২০ মে (হি.স.): “‘মূর্ত্তিমান নরেনবাবু দেখো কেমন লাগছে, তৃণমূলে একে একে সবাই এখন ভাবছে!’”— বিধানসভা নির্বাচনে জেলা জুড়ে দলের নজিরবিহীন ভরাডুবির পর এবার খোদ জেলা সভাপতি তথা প্রাক্তন বিধায়ক নরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে প্রকাশ্য ক্ষোভে ফেটে পড়লেন পশ্চিম বর্ধমানের নীচুতলার তৃণমূল নেতা ও কর্মীরা। জেলা সভাপতির বিতর্কিত ভিডিও বার্তার পাল্টা হিসেবে নীচুতলার এক নেতার লেখা এই শ্লেষাত্মক কবিতা এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক ভাইরাল। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শিল্পাঞ্চলের রাজনৈতিক মহলে তীব্র জল্পনা ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত পশ্চিম বর্ধমান জেলা তৃণমূল সভাপতি নরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর একটি ভিডিও বার্তাকে কেন্দ্র করে। ওই ভিডিওতে তিনি দাবি করেন, “জেলার প্রতিটি বিধানসভায় তৃণমূল কর্মীরা আক্রান্ত হচ্ছেন, ঘরছাড়া হচ্ছেন। তাঁদের পরিবার কাঁদছে। এই অত্যাচার চোখে দেখা যাচ্ছে না। আমার বিরুদ্ধেও চক্রান্ত হচ্ছে। বিজেপি স্পষ্ট করে বলুক, কোথায় এবং কখন কোন থানায় যেতে হবে। প্রয়োজনে ১০ হাজার কর্মী নিয়ে আমি নিজেই সেখানে গিয়ে গ্রেফতার হব, এতে যদি আপনারা শান্তি পান।”
জেলা সভাপতির এই মন্তব্য ঘিরেই দলের অন্দরে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও ক্ষোভের আগুন জ্বলে উঠেছে। নরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর এই ভিডিও বার্তার পাল্টা হিসেবে দুর্গাপুর-ফরিদপুর ব্লকের প্রাক্তন সভাপতি তথা জেলা পরিষদের কর্মাধ্যক্ষ সুজিত মুখোপাধ্যায় অপর একটি ভিডিও বার্তায় বলেন, “ভোট গণনায় কোনো কারচুপি হয়নি। আমরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত গণনা কেন্দ্রে ছিলাম। সেখানে কেন্দ্রীয় বাহিনী ও রাজ্য পুলিশ উপস্থিত ছিল। সুতরাং, শুধু শুধু গণনায় কারচুপির অবাস্তব অভিযোগ তুলে মানুষকে বিভ্রান্ত করবেন না নরেনবাবু। আপনার এই ধরনের মিথ্যা ও উসকানিমূলক বার্তার কারণে নিচু স্তরের তৃণমূল কর্মীরা আরও বেশি বিপদে পড়বেন। ২০০৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত আমি ব্লক সভাপতি ছিলাম। তারপর আমাকে অন্যায়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হলেও আমি দল ছাড়িনি। দয়া করে কর্মীদের আর বিপদে ফেলবেন না, বরং তাঁদের পাশে থাকুন।”
বুধবার সকালে পান্ডবেশ্বরের বর্তমান তৃণমূল ব্লক সভাপতি কিরীটী মুখোপাধ্যায়ও একটি ভিডিও বার্তা প্রকাশ করে জেলা সভাপতির কড়া সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “ভুল বার্তা দিয়ে পরিবেশ উত্তপ্ত করবেন না। গণনায় কোনও কারচুপি হয়নি। বিজেপি এখানে কোনও অত্যাচার করছে না। আসল বিষয় হলো, গণনার পরেই যে সমস্ত তৃণমূল কর্মীরা রাতারাতি দল বদলে বিজেপি হয়ে গেছে, তারাই এখন অশান্তি করার চেষ্টা করছে। আমরা এখানে তৃণমূল ও বিজেপি কর্মীরা সবাই বেশ ভালোই আছি। এই শান্ত পরিবেশকে আপনি আর বিবৃত বা ভয়ভীত করে তুলবেন না।”
অন্য দিকে, পান্ডবেশ্বরের প্রাক্তন ব্লক সহ-সভাপতি তথা প্রাক্তন উপপ্রধান গুরুপ্রসাদ চক্রবর্তী জেলা সভাপতির ওপর একরাশ অভিমান ও ক্ষোভ উগরে দিয়ে একটি কবিতা লিখেছেন। তিনি তাঁর কবিতায় লিখেছেন:
“মূর্ত্তিমান নরেনবাবু। দেখো কেমন লাগছে।
তৃণমূলে একে একে সবাই এখন ভাবছে।
পান্ডবেশ্বরের বাহুবলী, তুমিই ছিলে রাজা।
তোমার পাপে তৃণমূলিরা খাচ্ছে আজ সাজা।
সৎ লোকেদের দূরে সরিয়ে গুন্ডা পুষলে পাশে,
চুপ করেছি মানবিকতায় তোমার ভয়ে চাপা সন্ত্রাসে।”
সব মিলিয়ে, নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর ঘরের ভেতরে ও বাইরে প্রবল রাজনৈতিক চাপে পড়েছেন তৃণমূলের জেলা সভাপতি নরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। তবে শাসক শিবিরের এই তীব্র গৃহযুদ্ধ নিয়ে আপাতত কোনও মন্তব্য করতে চাননি পান্ডবেশ্বরের বিজেপি বিধায়ক জীতেন্দ্র তিওয়ারি। তিনি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়ায় জানান, “আপাতত পান্ডবেশ্বরের সামগ্রিক উন্নয়ন ছাড়া আমি অন্য কিছু ভাবছি না।”
হিন্দুস্থান সমাচার / জয়দেব লাহা