
কলকাতা, ২০ মে (হি.স.) : দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রে বৃহস্পতিবার, ২১ মে অনুষ্ঠিত হতে চলা পুনর্নির্বাচনের সমস্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে নির্বাচন কমিশন। ইভিএম ভাঙচুর, কারচুপি এবং ভোটপ্রক্রিয়ায় গুরুতর অনিয়মের ভূরি ভূরি অভিযোগ সামনে আসার পর, সমগ্র বিধানসভা কেন্দ্রের সমস্ত ২৮৫টি বুথেই পুনরায় ভোটগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অবাধ, শান্তিপূর্ণ ও স্বচ্ছ ভোট সুনিশ্চিত করতে এবার নজিরবিহীন নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক নজরদারির ব্যবস্থা করেছে কমিশন।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রে মোট ভোটারের সংখ্যা ২,৩৬,৪৪৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১,২১,৩০০ জন, মহিলা ভোটার ১,১৫,১৩ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ৯ জন। এ ছাড়া ৯৩ জন সার্ভিস ভোটার রয়েছেন। এবার ৪,৩৪৩ জন নতুন ভোটার (১৮-১৯ বছর বয়সী) প্রথমবার তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। এলাকায় ৮৫ বছরের ঊর্ধ্বে ১,৪৪৫ জন এবং ১০০ বছরের ঊর্ধ্বে ২৬ জন প্রবীণ ভোটার রয়েছেন। পাশাপাশি প্রতিবন্ধী বা দিব্যাঙ্গ ভোটারের সংখ্যা ২,১০৯। পুনর্নির্বাচনের জন্য মোট ২৮৫টি ভোটগ্রহণ কেন্দ্র তৈরি করা হয়েছে, যার মধ্যে ২৬১টি মূল এবং ২৪টি সহায়তাকারী বুথ। নির্বাচনী ময়দানে এবার মোট ৬ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যাঁদের সকলেই পুরুষ।
মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের (সিইও) দফতরের এক পদস্থ আধিকারিক জানিয়েছেন, গত ২৯ এপ্রিলের নির্বাচনে প্রতিটি বুথে মাত্র ৪ জন করে কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ান মোতায়েন ছিলেন। কিন্তু এবার অনিয়মের সমস্ত সম্ভাবনা রুখে দিতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রায় দ্বিগুণ করা হয়েছে। প্রতিটি বুথে এবার ৮ জন করে কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর (সিএপিএফ) জওয়ান মোতায়েন থাকবেন, যা একটি পূর্ণাঙ্গ সেকশনের সমান। সমগ্র ফলতা বিধানসভা এলাকায় এবার প্রায় ৩৫ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন থাকছে। যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে ৩০টি কুইক রেসপন্স টিম (কিউআরটি) সার্বক্ষণিকভাবে সক্রিয় থাকবে। এ ছাড়া বুথের ভেতরে দুটি এবং বাইরে একটি করে সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে, যার লাইভ ওয়েবকাস্টিং জেলা নির্বাচনী আধিকারিক ও সিইও অফিস থেকে সরাসরি নজরদারি করা হবে। প্রয়োজনে ড্রোনের মাধ্যমেও আকাশপথে নজরদারি চালানো হতে পারে। নির্বাচন প্রক্রিয়ার ওপর কড়া নজর রাখতে ৩ জন বিশেষ পর্যবেক্ষক নিয়োগ করেছে কমিশন। ভোটগ্রহণের আগে পুলিশি অভিযানে ফলতা পঞ্চায়েত সমিতির উপপ্রধান সাইদুল খান সহ বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ২৯ এপ্রিলের ভোটের সময় ফলতার একাধিক বুথে ইভিএমের বোতামে আঠা, কালি ও সুগন্ধি লেপে দেওয়া, ভোটদানে বাধা এবং ওয়েবক্যামেরার রেকর্ডিংয়ে কারচুপির মারাত্মক অভিযোগ উঠেছিল। তত্কালীন বিশেষ পর্যবেক্ষক সুব্রত গুপ্ত এলাকা পরিদর্শন করে তদন্ত করার পর কমপক্ষে ৬০টি বুথে ব্যাপক রিগিং ও অনিয়মের প্রমাণ পান। এর পরেই নির্বাচন কমিশন সমগ্র বিধানসভা জুড়েই পুনর্নির্বাচনের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেয়।
এদিকে, পুনর্নির্বাচনের ঠিক আগে তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী জাহাঙ্গীর খানের নির্বাচনী লড়াই থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে তীব্র শোরগোল ফেলে দিয়েছে। মঙ্গলবার এক সাংবাদিক বৈঠকে জাহাঙ্গীর খান দাবি করেন, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ফলতার উন্নয়নের জন্য বিশেষ প্যাকেজ ঘোষণা করার পর তিনি এই পুনর্নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। নিজেকে “ফলতার ভূমিপুত্র” বলে দাবি করে এলাকার শান্তি ও উন্নয়নের স্বার্থেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানান।
যদিও অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে অবিলম্বে এক বিবৃতি জারি করে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর এই সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবে জাহাঙ্গীর খানের ব্যক্তিগত, এর সঙ্গে দলের কোনও সম্পর্ক নেই। দলের অভিযোগ, ভোটের ফলাফল ঘোষণার পর থেকে ফলতা এলাকায় তাদের ১০০-র বেশি কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং বহু দলীয় কার্যালয়ে হামলা চালানো হয়েছে।
অন্য দিকে, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী তৃণমূল প্রার্থীর এই সিদ্ধান্তকে তীব্র কটাক্ষ করে বলেন, “তৃণমূল প্রার্থী ভোট দেওয়ার জন্য কোনও এজেন্ট পর্যন্ত পাচ্ছিলেন না, তাই লজ্জায় মাঠ ছেড়ে পালিয়েছেন।” ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এই আসনে দেবাংশু পাণ্ডাকে প্রার্থী করেছে। রাজনৈতিকভাবে এই ফলতা আসনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি ডায়মন্ড হারবার লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত, যার প্রতিনিধিত্ব করেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং এটি দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূলের অন্যতম শক্তিশালী দুর্গ হিসেবে পরিচিত।
প্রসঙ্গত, পুনর্নির্বাচনের প্রচার অভিযান বুধবার বিকেল ৫টায় শেষ হয়েছে এবং বর্তমানে সমগ্র এলাকায় ‘নীরবতার সময়কাল’ জারি রয়েছে। নির্বাচন কমিশন ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলির দাবি, বৃহস্পতিবার একটি শান্তিপূর্ণ ও অবাধ ভোট উৎসব উপহার দিতে তারা সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
হিন্দুস্থান সমাচার / সোনালি