
সোনামুড়া (ত্রিপুরা), ২০ মে (হি.স.) : উন্নয়নের আশায় বুক বেঁধেছিলেন এলাকাবাসী। বহু বছরের বেহাল রাস্তা অবশেষে সংস্কার হবে—এই প্রত্যাশায় দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসান ঘটবে বলে মনে করেছিলেন তাঁরা। কিন্তু বাস্তবে সেই স্বপ্নই যেন পরিণত হয়েছে নতুন এক দুঃস্বপ্নে। রাস্তা সংস্কারের নামে অবৈজ্ঞানিক কাজ, নিম্নমানের নির্মাণ এবং পানীয় জলের পাইপলাইন কেটে ফেলার ঘটনায় চরম ক্ষোভ ও উদ্বেগ ছড়িয়েছে সিপাহীজলা জেলার কাঁঠালিয়া উত্তর ও দক্ষিণ মহেশপুর পঞ্চায়েত এলাকায়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ৭০ বছরের পুরনো এই গুরুত্বপূর্ণ গ্রামীণ সড়কটি কাঁঠালিয়া বাজার এলাকা থেকে পশ্চিম দিকে উত্তর ও দক্ষিণ মহেশপুর পঞ্চায়েতের সীমান্ত ঘেঁষে প্রায় ৫০০ মিটার দূরে বাংলাদেশ সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত। প্রতিদিন এই রাস্তা দিয়ে ছোট, মাঝারি থেকে বড় যানবাহন চলাচল করে। পাশাপাশি রাস্তার দু’ধারে রয়েছে বহু পুরনো বসতি।
দীর্ঘদিন ধরে রাস্তার বেহাল অবস্থার কারণে এলাকাবাসীর দুর্ভোগ চরমে উঠেছিল। দুই বছর আগে প্রায় ২২ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করে রাস্তা সংস্কারের কাজ করা হলেও অভিযোগ, বরাদ্দের পুরো অর্থ ব্যয় না করেই তড়িঘড়ি কাজ শেষ করা হয়। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই রাস্তা আবারও আগের মতো ভেঙে পড়ে।
পরে স্থানীয় বাসিন্দারা তাঁদের সমস্যার কথা বিধায়ক বিন্দু দেবনাথের কাছে তুলে ধরেন। তিনি নিজে এলাকাটি পরিদর্শন করেন এবং এরপর কাঁঠালিয়া পূর্ত দফতরের মাধ্যমে প্রায় এক কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয় নতুন করে রাস্তা সংস্কারের জন্য।
প্রায় তিন মাস আগে শুরু হয় এই সংস্কারকাজ। কিন্তু কাজের শুরু থেকেই এলাকাবাসীর মধ্যে অসন্তোষ দানা বাঁধতে থাকে। অভিযোগ, কোনও বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা ছাড়াই রাস্তার দু’ধারে সাইডওয়াল নির্মাণ করা হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমের মুখে রাস্তার মাঝখানে জল ও কাদার স্তূপ জমে চলাচল কার্যত দুঃসাধ্য হয়ে উঠেছে। খালি পায়ে হাঁটা তো দূরের কথা, বাইক, সাইকেল এমনকি ছোট গাড়িও চলাচল করতে পারছে না।
এর মধ্যেই বাবুল পালের জমির পাশ দিয়ে সাইডওয়াল নির্মাণের জন্য জেসিবি দিয়ে মাটি কাটার সময় পানীয় জলের পাইপলাইন কেটে ফেলা হয়। এর ফলে গত দু’দিন ধরে রাস্তার দুইপাশের অন্তত ৮২টি পরিবার পানীয় জল থেকে বঞ্চিত। তীব্র গরমে জল না পেয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন মহিলা, শিশু ও প্রবীণরা। কারও রান্না বন্ধ, কারও দৈনন্দিন কাজকর্ম থমকে গেছে। অনেকেই কলস ও বালতি হাতে দূরদূরান্ত থেকে জল সংগ্রহ করতে বাধ্য হচ্ছেন।
বুধবার সকাল থেকেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ক্ষুব্ধ এলাকাবাসীরা অভিযোগ করেন, একদিকে রাস্তা খুঁড়ে কৃষিজমিতে মাটি ভরাট হয়ে ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে পানীয় জলের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। অথচ সংশ্লিষ্ট দফতরের তরফে এখনও পর্যন্ত কার্যকর কোনও পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের কথায়, “রাস্তা সংস্কারের নামে আমাদের আরও বিপদের মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়েছে। চলাচল বন্ধ, পানীয় জল বন্ধ, শিশু-বৃদ্ধদের নিয়ে আমরা মানবেতর জীবন কাটাচ্ছি।”
এলাকাবাসীর স্পষ্ট হুঁশিয়ারি, অবিলম্বে পানীয় জলের ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার এবং রাস্তা সংস্কারের কাজে বৈজ্ঞানিক ও টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ না করা হলে তাঁরা ঐক্যবদ্ধভাবে রাস্তা অবরোধে নামবেন।
উন্নয়নের নামে মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে—এই অভিযোগে এখন সরব গোটা মহেশপুর। প্রশ্ন উঠছে, কোটি টাকার প্রকল্প যদি মানুষের জীবনযাত্রাকেই বিপর্যস্ত করে তোলে, তবে সেই উন্নয়নের প্রকৃত সুফল কোথায়?
হিন্দুস্থান সমাচার / গোবিন্দ দেবনাথ