
নয়াদিল্লি, ২২ মে (হি.স.) : শুক্রবার সমাজ সংস্কারক রাজা রামমোহন রায়ের জন্মজয়ন্তীতে তাঁকে শ্রদ্ধা জানালেন লোকসভার অধ্যক্ষ ওম বিড়লা, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ-সহ একাধিক বিশিষ্টরা।
এদিন লোকসভার অধ্যক্ষ ওম বিড়লা এক্স হ্যান্ডলে লেখেন, “ভারতীয় নবজাগরণের মহান পথপ্রদর্শক ও সমাজ সংস্কারক রাজা রামমোহন রায়কে জন্মজয়ন্তীতে কোটি কোটি প্রণাম।” তিনি বলেন, সত্য, যুক্তি, শিক্ষা ও বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারাকে সমাজ পরিবর্তনের ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে রামমোহন রায় ভারতীয় সমাজকে নতুন চেতনা দিয়েছিলেন। ভারতীয় সংস্কৃতি ও আধুনিক চিন্তার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে তিনি এমন এক ভারতের স্বপ্ন দেখেছিলেন, যা হবে প্রগতিশীল, মানবিক ও যুক্তিবাদী।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেন, “ব্রাহ্ম সমাজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে রাজা রামমোহন রায় সমাজের কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে মানুষকে সচেতন করেছিলেন।” শিক্ষা, সমাজ সংস্কার ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে তাঁর অবদান আধুনিক ভারতের ভিতকে আরও শক্তিশালী করেছে বলেও মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান বলেন, শিক্ষা বিস্তার ও আধুনিক চিন্তাভাবনাকে সামাজিক জাগরণের ভিত্তি করেছিলেন রামমোহন রায়। তাঁর জীবন জ্ঞানচর্চা, সমাজ সংস্কার ও প্রগতিশীল ভারত গঠনের অনুপ্রেরণা দেয়।
কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান বলেন, ভারতীয় নবজাগরণের অন্যতম অগ্রদূত ছিলেন রাজা রামমোহন রায়। সমাজকে কুসংস্কারমুক্ত করে জাগ্রত সমাজ গঠনে তাঁর অবদান যুগ যুগ ধরে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নিতিন নবীন বলেন, সমাজের কুপ্রথা দূরীকরণ, নারী অধিকার রক্ষা এবং শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অনন্য। তাঁর আদর্শ ও চিন্তাভাবনা সমাজকে আজও পথ দেখায়।
কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বীরেন্দ্র কুমার বলেন, নারীশিক্ষার প্রসার ও সামাজিক কুপ্রথার বিরুদ্ধে রামমোহন রায়ের ঐতিহাসিক উদ্যোগ ভারতীয় সমাজকে নতুন দিশা দেখিয়েছিল। তাঁর মানবতা ও সমতার বার্তা আজও সমাজকে অনুপ্রাণিত করে।
প্রসঙ্গত, রাজা রামমোহন রায়— নামটা শুধু একজন সমাজসংস্কারকের নয়, আধুনিক ভারতের নবজাগরণের সূচনার সঙ্গেও জড়িয়ে আছে। ১৭৭২ সালের ২২ মে হুগলির রাধানগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ছোটবেলা থেকেই ছিল অসাধারণ মেধা। বাংলা, সংস্কৃত, ফার্সি, আরবি ও পরে ইংরেজি ভাষাতেও দক্ষতা অর্জন করেছিলেন।
সেই সময়ের ভারতীয় সমাজ ছিল নানা কুসংস্কার, ধর্মীয় গোঁড়ামি ও নারী নির্যাতনে জর্জরিত। বিশেষ করে সতীদাহ প্রথা সমাজকে অমানবিক করে তুলেছিল। স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রীকে জীবন্ত চিতায় পুড়িয়ে মারা হত। এই প্রথার বিরুদ্ধে সরব হন রামমোহন রায়। প্রবল বিরোধিতা, আক্রমণ ও সামাজিক চাপের মধ্যেও তিনি আন্দোলন চালিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত ১৮২৯ সালে ব্রিটিশ সরকার সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ করতে বাধ্য হয়।
শুধু সমাজসংস্কার নয়, শিক্ষাক্ষেত্রেও তাঁর অবদান বিশাল। তিনি বিশ্বাস করতেন, আধুনিক শিক্ষা ও বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তাভাবনাই সমাজকে বদলাতে পারে। তাই ইংরেজি শিক্ষা, বিজ্ঞান শিক্ষা ও যুক্তিবাদের পক্ষে তিনি জোরালো সওয়াল করেন। ১৮২৮ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘ব্রাহ্ম সমাজ’, যেখানে একেশ্বরবাদ, মানবতা ও সামাজিক সমতার বার্তা দেওয়া হত।
রামমোহন রায় সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও পথিকৃৎ ছিলেন। ‘সম্বাদ কৌমুদী’-র মতো পত্রিকা প্রকাশ করে তিনি সমাজের নানা অন্যায়ের বিরুদ্ধে কলম ধরেন। নারীশিক্ষা, বিধবা পুনর্বিবাহ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা— এসব বিষয়েও তিনি ছিলেন সময়ের থেকে অনেক এগিয়ে।
ভারতীয় সমাজকে অন্ধবিশ্বাস থেকে বের করে আধুনিক চিন্তার পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যই তাঁকে “ভারতীয় নবজাগরণের জনক” বলা হয়। আজও তাঁর চিন্তা, সাহস এবং সমাজ বদলের লড়াই প্রাসঙ্গিক।
---------------
হিন্দুস্থান সমাচার / সৌমি বৈদ্য