
হুগলি , ২২ মে (হি.স.) : সমাজ সংস্কারক ও ভারতীয় নবজাগরণের অগ্রদূত রাজা রামমোহন রায়ের ২৫৪-তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে শুক্রবার খানাকুলের রাধানগরে নানা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। রামমোহনের জন্মস্থান হওয়ায় সকাল থেকেই গোটা এলাকায় উৎসবের আবহ তৈরি হয়।
জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে এদিন একটি বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। শোভাযাত্রায় অংশ নেন বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সদস্য, ছাত্র-ছাত্রী, বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব এবং সাধারণ মানুষ। পাশাপাশি রাজা রামমোহন রায়ের জীবন, আদর্শ ও সমাজ সংস্কারে তাঁর অবদানকে স্মরণ করে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পুরশুড়ার বিধায়ক বিমান ঘোষ। তিনি রাজা রামমোহন রায়ের মূর্তিতে মাল্যদান করে শ্রদ্ধা জানান। বক্তব্য রাখতে গিয়ে বিধায়ক বলেন, “রাজা রামমোহন রায় শুধু বাংলার নয়, সমগ্র ভারতের গর্ব। নারী শিক্ষা, সামাজিক সংস্কার এবং কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তাঁর লড়াই আজও আমাদের পথ দেখায়। নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর আদর্শ পৌঁছে দেওয়াই আমাদের দায়িত্ব।”
দিনভর বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে রাধানগরে রাজা রামমোহন রায়ের জন্মবার্ষিকী পালিত হয়। অনুষ্ঠানে বিপুল মানুষের উপস্থিতি মহান এই সমাজ সংস্কারকের প্রতি এলাকার মানুষের গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার পরিচয় বহন করে।
প্রসঙ্গত, রাজা রামমোহন রায়— নামটা শুধু একজন সমাজসংস্কারকের নয়, আধুনিক ভারতের নবজাগরণের সূচনার সঙ্গেও জড়িয়ে আছে। ১৭৭২ সালের ২২ মে হুগলির রাধানগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ছোটবেলা থেকেই ছিল অসাধারণ মেধা। বাংলা, সংস্কৃত, ফার্সি, আরবি ও পরে ইংরেজি ভাষাতেও দক্ষতা অর্জন করেছিলেন।
সেই সময়ের ভারতীয় সমাজ ছিল নানা কুসংস্কার, ধর্মীয় গোঁড়ামি ও নারী নির্যাতনে জর্জরিত। বিশেষ করে সতীদাহ প্রথা সমাজকে অমানবিক করে তুলেছিল। স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রীকে জীবন্ত চিতায় পুড়িয়ে মারা হত। এই প্রথার বিরুদ্ধে সরব হন রামমোহন রায়। প্রবল বিরোধিতা, আক্রমণ ও সামাজিক চাপের মধ্যেও তিনি আন্দোলন চালিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত ১৮২৯ সালে ব্রিটিশ সরকার সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ করতে বাধ্য হয়।
শুধু সমাজসংস্কার নয়, শিক্ষাক্ষেত্রেও তাঁর অবদান বিশাল। তিনি বিশ্বাস করতেন, আধুনিক শিক্ষা ও বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তাভাবনাই সমাজকে বদলাতে পারে। তাই ইংরেজি শিক্ষা, বিজ্ঞান শিক্ষা ও যুক্তিবাদের পক্ষে তিনি জোরালো সওয়াল করেন। ১৮২৮ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘ব্রাহ্ম সমাজ’, যেখানে একেশ্বরবাদ, মানবতা ও সামাজিক সমতার বার্তা দেওয়া হত।
রামমোহন রায় সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও পথিকৃৎ ছিলেন। ‘সম্বাদ কৌমুদী’-র মতো পত্রিকা প্রকাশ করে তিনি সমাজের নানা অন্যায়ের বিরুদ্ধে কলম ধরেন। নারীশিক্ষা, বিধবা পুনর্বিবাহ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা— এসব বিষয়েও তিনি ছিলেন সময়ের থেকে অনেক এগিয়ে।
ভারতীয় সমাজকে অন্ধবিশ্বাস থেকে বের করে আধুনিক চিন্তার পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যই তাঁকে “ভারতীয় নবজাগরণের জনক” বলা হয়। আজও তাঁর চিন্তা, সাহস এবং সমাজ বদলের লড়াই প্রাসঙ্গিক।
হিন্দুস্থান সমাচার / SANTOSH SANTRA