
গুয়াহাটি, ২৭ মে (হি.স.) : নারীদের সুরক্ষা দিয়ে প্রতারণা, জোরজবরদস্তি এবং ঠগবাজি থেকে রক্ষা করবে ‘অভিন্ন দেওয়ানি বিধি, অসম ২০২৬’ (‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড, আসাম ২০২৬’ সংক্ষেপে ইউসিসি) আইন, রাজ্য বিধানসভায় বলেছেন মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্তবিশ্ব শর্মা।
আজ বুধবার ষোড়শ অসম বিধানসভার প্রথম অধিবেশনে ধ্বনী ভোটে গৃহীত হয়েছে ইউসিসি বিল। এই বিলের উদ্দেশ্য জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে রাজ্যের সকল নাগরিকের জন্য অভিন্ন আইন প্রণয়ন করা, নারীর অধিকার সুনিশ্চিত করা, বহুবিবাহ রোধ, বিবাহ বিচ্ছেদ, বিবাহ নিবন্ধন ইত্যাদির মাধ্যমে সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা গড়ে তুলে দেশের ঐক্য ও অখণ্ডতাকে আরও শক্তিশালী করা।
কংগ্রেস সহ বিরোধী সদস্যরা বিলে উল্লিখিত বিষয়গুলির ক্ষেত্রে আগে থেকেই আইন প্রচলিত রয়েছে বলে উল্লেখ করে ইউসিসির কোনও প্রয়োজন নেই বলে দাবি করে বিধানসভায় হট্টগোলের পরিবেশ সৃষ্টি করেন।
বিরোধীদের উত্থাপিত অভিযোগ এবং নানা প্রশ্নের জবাব দেন মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্তবিশ্ব শর্মা। বিলের ওপর আলোচনার জবাবে মুখ্যমন্ত্রী ড. শর্মা বলেন, এই বিল নারীদের সুরক্ষার ঢাল প্রদান করেছে। এটি নারীদের প্রতারণা, জোরজবরদস্তি এবং ঠকবাজি থেকে রক্ষা করবে বিল। বহুবিবাহ রোধ, মহিলাদের সুরক্ষা, বিবাহ নিবন্ধন ইত্যাদির মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তার ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
কংগ্রেস এবং বিরোধী বিধায়কদের মন্তব্যে দুঃখ প্রকাশ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, কংগ্রেস শুধুমাত্র ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেই এর বিরোধিতা করছে। তাদের প্রতিটি আপত্তিই কোরআন ও শরিয়তের ভিত্তিতে তোলা হয়েছে। কংগ্রেস সব জাতি, জনগোষ্ঠী ও ভাষাভাষী মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে না, কেবল একটি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করছে। কংগ্রেস হিন্দু, খ্রিষ্টান, জনজাতি বা তফশিলি জাতির দৃষ্টিকোণ থেকে বিরোধিতা করেনি, শুধুমাত্র কোরআন ও শরিয়তের দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতেই যুক্তি প্রদর্শন করছে।
ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সমালোচনা করে তিনি অভিযোগ করেন, কংগ্রেস এমন ধারণাকে সমর্থন করছে যেখানে স্ত্রীর অসুস্থ হলে তাঁর স্বামীকে আরেকটি বিয়ে করার সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। বলেন, ‘আমাদের হিন্দু সমাজে আমরা বিশ্বাস করি, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক একটি পবিত্র সম্পর্ক। যদি আমার স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়েন, তা-হলে আমার কাজ আবার বিয়ে করা নয়, আমার কাজ হলো তাঁর চিকিৎসা করানো।’ কংগ্রেসের এই অবস্থানকে ‘নিষ্ঠুরতা’ বলে আখ্যা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘একটি মর্যাদাপূর্ণ রাজনৈতিক দল কখনও বলতে পারে না যে আপনার স্ত্রী অসুস্থ হলে তাঁর চিকিৎসা ও যত্ন নেওয়ার বদলে আপনি আবার বিয়ে করুন। এতে আপনি তাঁকে মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে ঠেলে দেবেন। এ কেমন সমাজ?’
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের বক্তব্য সর্বধর্ম ও সর্বজাতিকে প্রতিনিধিত্ব করা উচিত। এই ভারতে যদি আমরা কোরআনকে সম্মান করি, তবে বাইবেল ও গীতাকেও সম্মান করতে হবে। কংগ্রেস ধর্মনিরপেক্ষতা হারিয়ে ফেলেছে, তবে তারা ভবিষ্যতে গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতিনিধিত্ব করবে বলে আশা করি।’
তিনি বলেন, ভারতের মানুষ ১৯২৫ সাল থেকেই ইউসিসির পক্ষে কাজ করে আসছে। বিজেপি বা জনসংঘ গঠনের আগেই ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের মঞ্চ থেকেই ইউসিসির দাবি উঠেছিল। ১৯২৫ সালে জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে ইউসিসির দাবি উত্থাপিত হয়। ১৯৩৭ সালে নেহরু কমিটির সুপারিশেও ইউসিসির কথা বলা হয়েছিল। ১৯৬১ সালে পর্তুগিজ শাসিত গোয়া, দমন ও দিউ ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং সেখানে একটি সিভিল কোড কার্যকর ছিল। ভারতের প্রথম অভিন্ন দেওয়ানি বিধি গোয়ায় চালু হয়েছিল এবং তা কংগ্রেসের পৃষ্ঠপোষকতাতেই হয়েছিল। তিনি বলেন, সংবিধান সভায় কমন সিভিল কোড নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছিল। ড. আম্বেদকর, কেএম মুন্সি, কৃষ্ণস্বামী আয়ারের মতো নেতারা জোরালোভাবে বলেছিলেন, এই দেশে কোনও ধর্মগ্রন্থের শাসন চলবে না, চলবে সংবিধানের শাসন। আমাদের জীবন, দায়িত্ব ও কর্তব্য সংবিধানই নির্ধারণ করবে।
মুখ্যমন্ত্রী ড. শর্মা আরও বলেন, ‘বৈবাহিক বিরোধের ক্ষেত্রে আইনি পথ অনুসরণ করাই উচিত। আপনি বলতে পারেন, তিনি বিশ্বস্ত নন, তা-হলে আপনাকে আইনের দ্বারস্থ হতে হবে এবং বিবাহবিচ্ছেদ নিতে হবে। যথাযথ আদালতের রায় পাওয়ার পরই আপনি দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারবেন অথবা বিচ্ছেদের পরে পুনরায় বিবাহ করতে পারবেন।’
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, আজ অসমের জন্য এক বিরল গৌরবের দিন। প্রথমে উত্তরাখণ্ড, পরে গুজরাট এবং এখন অসম ইউসিসি কার্যকর করার পথে এগোচ্ছে। অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, কেন জনজাতীয় জনগোষ্ঠীকে ইউসিসির আওতায় আনা হয়নি। তিনি বলেন, জনজাতীয় জনগণ এই দেশ ও এই ভূমিতে আদিম যুগ থেকে বসবাস করে আসছেন। তাঁদের নিজস্ব বিশেষ রীতি-নীতি রয়েছে, যার মাধ্যমে তাঁরা ব্যক্তিগত জীবন পরিচালনা করেন। আমাদের মাটি, জল, বন ও সভ্যতাকে তাঁরা প্রাচীনকাল থেকেই রক্ষা করে আসছেন। তাই তাঁদের ধন্যবাদ জানানো উচিত। ইউসিসি থাক বা না-থাক, জনজাতীয় সমাজ কখনও বহুবিবাহকে স্বীকৃতি দেয় না, মেয়েদের সমান অধিকার দেয় এবং লিভ-ইন সম্পর্ককে স্বীকৃতি দেয় না। তাঁরা বহু আগেই নিজেদের সমাজে সিভিল কোডের মতো নিয়ম চালু করেছেন।
‘অভিন্ন দেওয়ানি বিধি, অসম ২০২৬’ বিবাহ ও বিবাহবিচ্ছেদকে নিয়ন্ত্রণ করবে। উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পত্তি পাওয়ার ক্ষেত্রে আইনি স্থায়িত্ব আনবে। লিভ-ইন সম্পর্কের বিষয়টিও সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছে। বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ এবং লিভ-ইন সম্পর্ক সংক্রান্ত সমস্ত বিষয় এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ইউসিসির ভিত্তি হলো সংবিধানের ৪৪ নম্বর অনুচ্ছেদ। এই অনুচ্ছেদের ভিত্তিতেই ইউসিসি আনার চেষ্টা করা হয়েছে। এই বিলের মাধ্যমে রাজ্যে যাতে বাল্যবিবাহ না হয় এবং তাকে স্বীকৃতি না দেওয়া হয়, তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই আইনের মাধ্যমে ধর্ম নির্বিশেষে একজন ব্যক্তি কেবল একজনকেই বিয়ে করতে পারবেন।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, এই বিল আমাদের অসভ্য যুগ থেকে সভ্য যুগে নিয়ে এসেছে। এটি নারী সমাজকে সুরক্ষা দেবে, লিভ-ইন সম্পর্কের নামে প্রতারণা থেকে রক্ষা করবে এবং মা, বোন ও কন্যাদের নতুন সুরক্ষার কবচ দেবে। তিনি আরও বলেন, ভারতীয় সংস্কৃতি মূলত নারীর সম্মানকেই শিক্ষা দিয়ে এসেছে।
বিধানসভায় বিল পাস হওয়ার পর মুখ্যমন্ত্রী একে ‘ঐতিহাসিক’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, ইউনিফর্ম সিভিল কোড কার্যকর করা বিজেপি সরকারের নির্বাচনী ইস্তেহারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি ছিল। তিনি বলেন, ‘আমরা অত্যন্ত খুশি এবং আনন্দিত যে নির্বাচনের পর অসম বিধানসভার প্রথম অধিবেশনেই এই ঐতিহাসিক বিল গ্রহণ করতে পেরেছি।’ এই আইনকে সমর্থন করার জন্য মুখ্যমন্ত্রী অসম বিধানসভার সমস্ত সদস্যকে ধন্যবাদ জানান।
ড. শর্র্মা আরও জানান, বিলটি এখন পঠানো হবে রাজ্যপালের কাছে। তিনি পাঠাবেন ভারতের রাষ্ট্রপতির কাছে, অনুমোদনের জন্য। রাষ্ট্রপতির সম্মতি পাওয়ার পরই এটি রাজ্যে কার্যকর করা হবে।
তিনি আরও জানান, আইন কার্যকরের জন্য প্রয়োজনীয় নিয়মাবলি ইতিমধ্যেই প্রস্তুত করা হয়েছে। তবে রাষ্ট্রপতির অনুমোদন না পাওয়া পর্যন্ত সেগুলি আনুষ্ঠানিকভাবে জারি করা যাবে না। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘সাধারণত রাষ্ট্রপতির অনুমোদন পাওয়ার পর আমাদের ছয় থেকে সাতটি নিয়ম জারি করতে হয়। আমার মনে হয় পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ হতে তিন থেকে ছয় মাস সময় লাগতে পারে।’
হিন্দুস্থান সমাচার / সমীপ কুমার দাস