
- বিলে রয়েছে রাজ্যের সমস্ত বাসিন্দার জন্য বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার এবং লিভ-ইন সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণে অভিন্ন দেওয়ানি আইনি কাঠামো প্রস্তাব
গুয়াহাটি, ২৭ মে (হি.স.) : ষোড়শ অসম বিধানসভার প্রথম অধিবেশনে ধ্বনি ভোটে পাস হয়ে গেছে ‘অভিন্ন দেওয়ানি বিধি, অসম ২০২৬’ বা ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড, আসাম ২০২৬’ (ইউসিসি) বিল। উত্তরাখণ্ড এবং গুজরাটের পর দেশের তৃতীয় রাজ্য হিসেবে অসমে কার্যকর হতে চলেছে ইউসিসি। এই বিলের মাধ্যমে রাজ্যের সমস্ত বাসিন্দার জন্য বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার এবং লিভ-ইন সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণে একটি অভিন্ন দেওয়ানি আইনি কাঠামো প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে সংবিধানপ্রদত্ত সুরক্ষা ও প্রথাগত রীতিনীতি বজায় রাখার স্বার্থে তফশিলি জনজাতিদের এই আইনের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে।
ইতিহাসের পাতায় স্থান করে আজ বুধবার ২৭ মে অসম বিধানসভায় পাস হলো ঐতিহাসিক ইউসিসি বিল। কংগ্রেস ইউসিসি বিলের উপর সাতটি সংশোধনী প্রস্তাব এনেছিল, রাইজর দল ১৭টি এবং তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) এনেছিল দুটি সংশোধনী। বিরোধীরা বিলটি সিলেক্ট কমিটির কাছে পাঠানোর দাবি জানালেও বিধানসভার অধ্যক্ষ তাঁদের দাবি খারিজ করে দেন।
সামাজিক ন্যায় এবং সমতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অসম সরকার ইউসিসি গ্রহণ করেছে। ইউসিসি বিলে লিভ-ইন সম্পর্ক নিয়ে একাধিক কঠোর নিয়ম রাখা হয়েছে। বিধি অনুযায়ী, কোনও বিবাহিত ব্যক্তি লিভ-ইন সম্পর্কে থাকতে পারবেন না। এছাড়া, রাজ্যে লিভ-ইন সম্পর্কের নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সঙ্গীর অধিকার সুরক্ষিত রাখার উদ্দেশ্যেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, জানিয়েছে সরকার।
এখন থেকে কোনও যুবক-যুবতী লিভ-ইন সম্পর্কে থাকলে তা উপ-নিবন্ধককে জানাতে হবে। উপ-নিবন্ধক স্থানীয় থানাকেও বিষয়টি জানাবেন। উপ-নিবন্ধককে না জানিয়ে এক মাস লিভ-ইন সম্পর্কে থাকলে সংশ্লিষ্ট যুবক-যুবতীকে দোষী সাব্যস্ত করা হবে। লিভ-ইন সম্পর্কের নিবন্ধন না করলে সর্বোচ্চ তিন মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা ১০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান থাকবে। এছাড়া লিভ-ইন সম্পর্ক সংক্রান্ত ঘোষণায় ভুয়া তথ্য প্রদান বা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করলে সর্বোচ্চ তিন মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। তাছাড়া সন্তানের পিতা-মাতার পরিচয় নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে রাজ্য সরকার জানিয়েছে।
ইউসিসি বিধি অনুযায়ী, বিয়ে এবং বিবাহ বিচ্ছেদের নিবন্ধন বাধ্যতামূলক হবে। লিভ-ইন সম্পর্কে থাকলে উভয় পক্ষের সম্মতিতে বিচ্ছেদ সম্ভব হবে। এছাড়া, লিভ-ইন সম্পর্কে থাকা কোনও যুবতী ভরণপোষণের দাবিতে আদালতের দ্বারস্থ হতে পারবেন। লিভ-ইন সম্পর্কে থাকার পর সম্মতি ছাড়া যুবতীকে ছেড়ে গেলে সংশ্লিষ্ট যুবক তাঁর (যুবতী) ভরণপোষণের দায়িত্ব নেবেন।
অসমের বাইরে থাকলেও অসমের যুবক-যুবতীদের ক্ষেত্রে লিভ-ইন সম্পর্কের জন্য একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে। লিভ-ইন সম্পর্কে থাকা কোনও ব্যক্তির বয়স ২১ বছরের কম হতে পারবে না। কারও বয়স ২১ বছরের কম হলে অভিভাবককে জানাতে হবে। আইন অমান্য করলে ১০ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে।
অসমে ইউসিসি বিলের উদ্দেশ্য সম্পর্কে রাজ্য সরকার বলেছে, বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার, সম্পত্তি এবং লিভ-ইন সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত নিয়মগুলোকে এক ও অভিন্ন করার লক্ষ্যে এই আইন আনা হয়েছে। সরকারের দাবি, বিভিন্ন ধর্মের জন্য আলাদা ব্যক্তিগত আইন থাকায় অনেক সময় আইনি জটিলতা ও বৈষম্যের সৃষ্টি হয়। সেই কারণেই একটি সাধারণ দেওয়ানি কাঠামো (কমন সিভিল ফ্র্যামওয়ার্ক) তৈরি করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত এই আইন ধর্মভিত্তিক ব্যক্তিগত আইনের পরিবর্তে একটি সাধারণ দেওয়ানি কাঠামো প্রবর্তনের লক্ষ্য নিয়েছে, যাতে আইনি সমতা, লিঙ্গ ন্যায়বিচার এবং আইনের দৃষ্টিতে সকলের সমান অধিকার নিশ্চিত করা যায়। একইসঙ্গে, বিলটিতে সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বৈচিত্র্যও সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। ফলে বিদ্যমান ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও ঐতিহ্য মেনে বিবাহ সম্পন্ন করার অনুমতি বহাল থাকবে।
অভিন্ন বিবাহ বিধান এবং বাধ্যতামূলক নিবন্ধন সম্পর্কে সরকার বলেছে, বিল অনুযায়ী একবিবাহ প্রথা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং বিবাহের আইনি বয়স পুরুষদের জন্য ২১ বছর ও নারীদের জন্য ১৮ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই আইনে স্বীকৃত ধর্মীয় বা প্রথাগত রীতিনীতি অনুসারে বিবাহ সম্পন্ন করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বৈদিক বিবাহ, আহোম চাকলোং, সপ্তপদী, আশীর্বাদ, নিকাহ, হোলি ইউনিয়ন এবং আনন্দ কারজ প্রভৃতি।
আইনি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং প্রতারণামূলক কার্যকলাপ রোধের লক্ষ্যে রাজ্যজুড়ে সব বিবাহ ও বিবাহবিচ্ছেদের নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বিবাহ সম্পন্ন হওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে দম্পতিকে সাব-রেজিস্ট্রারের কাছে বিবাহ সংক্রান্ত স্মারকলিপি জমা দিতে হবে।
বিলটিতে বিবাহবিচ্ছেদের জন্য অভিন্ন ভিত্তিও নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নিষ্ঠুরতা, পরিত্যাগ এবং পারস্পরিক সম্মতি। এছাড়া, পাঁচ বছরের কম বয়সি সন্তানের হেফাজত সাধারণত শৈশবের প্রাথমিক পর্যায়ে মায়ের কাছেই থাকবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিষয়ে প্রস্তাবিত ইউসিসিতে উইল ছাড়া মৃত্যুর ক্ষেত্রে সম্পত্তি বণ্টনের জন্য একটি অভিন্ন ও লিঙ্গনিরপেক্ষ উত্তরাধিকার কাঠামো প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে মৃত ব্যক্তির স্বামী বা স্ত্রী, সন্তান এবং পিতামাতাকে ‘ক্লাস-১ উত্তরাধিকারী’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বিলে আরও বলা হয়েছে, সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির লিখিত ও সাক্ষ্যপ্রমাণযুক্ত উইল করার আইনি অধিকার থাকবে, যাতে তাঁর মৃত্যুর পর সম্পত্তির উত্তরাধিকার নির্ধারণ করা যায়।
প্রস্তাবিত বিধান অনুযায়ী, দ্বিবিবাহ ও বহুবিবাহের ক্ষেত্রে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (বিএনএস), ২০২৩-এর ৮২ নম্বর ধারায় সর্বোচ্চ সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।
বাল্যবিবাহ অথবা বৈধ সম্মতি ছাড়া বিবাহের ক্ষেত্রে ‘প্রহিবিশন অব চাইল্ড ম্যারেজ অ্যাক্ট, ২০০৬’ অনুযায়ী সর্বোচ্চ দু বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান থাকবে।
জোরজবরদস্তি, ভয়ভীতি প্রদর্শন অথবা তথ্য গোপন করে প্রতারণামূলকভাবে সম্পন্ন করা বিবাহের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
বেআইনিভাবে বিবাহবিচ্ছেদ করা অথবা বৈধ বিচ্ছেদ প্রক্রিয়া লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ তিন বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং জরিমানার বিধান থাকবে। এছাড়া, পুনর্বিবাহের আগে কোনও বিবাহবিচ্ছিন্ন ব্যক্তিকে বেআইনি শর্ত মানতে বাধ্য করলে সর্বোচ্চ তিন বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং এক লক্ষ টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে।
নিষিদ্ধ সম্পর্কের মধ্যে বিবাহ, যদি তা বৈধ প্রথা দ্বারা অনুমোদিত না হয়, তবে সেই ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ছয় মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
বিলে বাধ্যতামূলক নিবন্ধন সংক্রান্ত নিয়ম না মানার ক্ষেত্রেও শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
ইচ্ছাকৃতভাবে ৬০ দিনের মধ্যে বিবাহ বা বিবাহবিচ্ছেদের নিবন্ধন না করলে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হবে। নিবন্ধনের সময় জাল বা ভুয়া নথি জমা দিলে সর্বোচ্চ তিন মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।
বিদ্যমান মুসলিম বিবাহ নিবন্ধন আইন বাতিলের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, রাজ্যের দেওয়ানি আইন কাঠামোর পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে বিলটিতে ‘অসম বাধ্যতামূলক মুসলিম বিবাহ ও বিবাহবিচ্ছেদ নিবন্ধন আইন, ২০২৪’ বাতিল করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
তবে, প্রস্তাবিত ইউসিসি কার্যকর হওয়ার আগে সম্পন্নকৃত বহুবিবাহকে বৈধ ও আইনগত সুরক্ষার আওতায় রাখার জন্য বিলে একটি সুরক্ষামূলক ধারা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
অসম সরকার জানিয়েছে, প্রস্তাবিত এই আইনি সংহতির লক্ষ্য হলো সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতা বজায় রেখে আইনি অভিন্নতা প্রতিষ্ঠা করা এবং একইসঙ্গে রাজ্যজুড়ে দেওয়ানি আইনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সমান আইনি সুরক্ষা আরও শক্তিশালী করা।
উত্তরাখণ্ড ও গুজরাটের তুলনায় অসমের ইউসিসি কীভাবে আলাদা?
রাজ্যের সামাজিক ও জনসংখ্যাগত বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে অসমের ইউসিসি মডেলকে উত্তরাখণ্ড ও গুজরাট থেক কিছুটা আলাদা বলে দেখা হচ্ছে। অসমে মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ৩৪ শতাংশ এবং এখানে বহু জনজাতীয় সম্প্রদায়ের মানুষও বসবাস করেন। এজন্য সরকার ইতিমধ্যেই স্পষ্ট করেছে, তফশিলি জনজাতিদের ইউসিসির আওতার বাইরে রাখা হবে। পাশাপাশি, ঐতিহ্যবাহী জনজাতীয় রীতি-নীতি ও ধর্মীয় প্রথাগুলিও এই আইনের দ্বারা প্রভাবিত হবে না। অসমে জনজাতীয় পরিচয় ও সাংস্কৃতিক অধিকার অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয় হওয়ায় এই ব্যবস্থাকে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, গত ২৫ মে ষোড়শ অসম বিধানসভার চলমান অধিবেশনের তৃতীয় দিন ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড আসাম, ২০২৬’ বিল মুখ্যমন্ত্রীর হয়ে পেশ করেছিলেন সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রী অতুল বরা।
হিন্দুস্থান সমাচার / সমীপ কুমার দাস