
আরামবাগ, ৬মে (হি.স.) : কামারপুকুর—ভোরের আলো ফোটার আগেই যেখানে জীবন ছন্দ খুঁজে পায়, সেই চেনা সবজি বাজার বহুদিন ধরেই নাকি বয়ে বেড়াচ্ছিল এক অদৃশ্য আতঙ্কের ভার। টাটকা সবজি, মাছ, ডিম আর ক্রেতাদের কোলাহলে ভরা এই বাজারের আড়ালেই বছরের পর বছর ধরে চলেছে ‘তোলা’ তোলার অভিযোগ—এমনটাই দাবি স্থানীয় ব্যবসায়ীদের একাংশের।
বাজারের চেহারা বাইরে থেকে যতই প্রাণবন্ত হোক, ভিতরে ছিল অন্য এক বাস্তবতা। ছোট ব্যবসায়ী থেকে বড় দোকানদার—কেউই নাকি এই অঘোষিত নিয়মের বাইরে ছিলেন না। ব্যবসায়ীদের কথায়, প্রতিদিনের আয়ের একটি অংশ বাধ্যতামূলকভাবে দিতে হতো ‘তোলা’ হিসেবে। কারও দোকানে দিনে কয়েকশো টাকার বিক্রি হলেও রেহাই ছিল না। এক বিক্রেতার কথায়, “একটা ডিম বিক্রি করলেও তোলা দিতে হতো”—এই সংক্ষিপ্ত বাক্যেই যেন স্পষ্ট হয়ে ওঠে বছরের পর বছর জমে থাকা ক্ষোভ আর অসহায়তা।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়, এই অর্থ আদায়ের কোনও লিখিত প্রমাণ বা রশিদ দেওয়া হতো না। ফলে পুরো প্রক্রিয়াটাই চলত অদৃশ্য নিয়মে, যেখানে প্রতিবাদের সুযোগ কার্যত ছিল না বললেই চলে। অনেকেই জানিয়েছেন, এই অতিরিক্ত অর্থের চাপ তাদের ব্যবসাকে ধীরে ধীরে দুর্বল করে দিয়েছে।
অভিযোগ আরও গুরুতর আকার নিয়েছে যখন সামনে এসেছে নতুন দোকান বা সেড তৈরির নাম করে বড় অঙ্কের টাকা নেওয়ার প্রসঙ্গ। ব্যবসায়ীদের দাবি, ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে এই বাবদ। অনেক ছোট ব্যবসায়ী এই টাকা জোগাড় করতে ঋণ নিতে বাধ্য হয়েছেন, যা তাদের আর্থিক অবস্থাকে আরও জটিল করে তুলেছে।
প্রতিবাদ করার চেষ্টা করলেই নাকি আসত চাপ—কখনও সরাসরি, কখনও পরোক্ষে। ফলে অধিকাংশই চুপ থাকাকেই নিরাপদ মনে করেছেন। এই নীরবতা ক্রমে অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল, আর সেই অভ্যাসই বাজারের ভিতরে এক অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি করেছিল।
তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পালাবদলের পর সেই দীর্ঘ নীরবতা যেন একটু একটু করে ভাঙতে শুরু করেছে। ব্যবসায়ীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে নতুন আশার সঞ্চার। পরিবর্তনের এই আবহেই বাজারে পৌঁছন আরামবাগ সাংগঠনিক জেলার বিজেপি নেত্রী দোলন দাস।
তার এই সফর শুধুমাত্র রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল না—বরং তা রূপ নেয় এক আবেগঘন সাক্ষাতে। তিনি একে একে প্রতিটি দোকানে যান, কথা বলেন ব্যবসায়ীদের সঙ্গে, শোনেন তাদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ ও কষ্টের কথা। এই কথোপকথনের সময় অনেকেই আবেগে ভেঙে পড়েন। কারও চোখে জল, কারও গলায় কাঁপন—এই দৃশ্য যেন তুলে ধরে বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা বঞ্চনা ও ভয়ের চিত্র।
ব্যবসায়ীদের এই অভিজ্ঞতা শুনে দোলন দাস স্পষ্ট বার্তা দেন, “আজ থেকে আর কেউ তোলা দেবেন না। আপনারা নির্ভয়ে ব্যবসা করুন।” তার এই ঘোষণায় বাজারজুড়ে যেন স্বস্তির হাওয়া বইতে শুরু করেছে। অনেকেই মনে করছেন, এতদিনের এক অদৃশ্য চাপ থেকে মুক্তির পথ হয়তো সত্যিই খুলছে।
তবে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এখন বড় প্রশ্ন উঠছে প্রশাসনিক ভূমিকা নিয়ে। এতদিন ধরে যদি সত্যিই এমন অভিযোগ চলতে থাকে, তাহলে তার তদন্ত হওয়া জরুরি—এমনটাই মত বিভিন্ন মহলের। অনেকেই মনে করছেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখে দোষীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি আর না তৈরি হয়।
কামারপুকুর সবজি বাজারের এই চিত্র শুধুমাত্র একটি এলাকার সমস্যা নয়, বরং বৃহত্তর এক বাস্তবতার প্রতিফলন। এখানে যেমন রয়েছে সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের সংগ্রাম, তেমনই রয়েছে ভয়, চাপে নীরবতা আর পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা।
এখন প্রশ্ন একটাই—এই পরিবর্তনের হাওয়া কি স্থায়ী হবে? ব্যবসায়ীরা কি সত্যিই নির্ভয়ে নিজেদের জীবিকা চালাতে পারবেন? নাকি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আবারও ফিরে আসবে পুরনো ছায়া?
উত্তর সময়ই দেবে। তবে আপাতত কামারপুকুরের বাজারে যে স্বস্তির হালকা বাতাস বইতে শুরু করেছে, সেটাই হয়তো অনেকের কাছে নতুন করে বাঁচার আশার আলো।
হিন্দুস্থান সমাচার / SANTOSH SANTRA