
দুর্গাপুর, ১৫ জুন (হি. স.) : আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন করতে গিয়ে কলকারখানার দূষণে জেরবার পানাগড় শিল্পতালুক। জনবসতি লাগোয়া শিল্পতালুকে পাথর ক্রাশারে দিনভর চলছে পাথর ভাঙার কাজ। তার জেরে বাতাসে মিশছে ধূলিকণা। আর ওই ধূলিকণায় মাত্রাতিরিক্ত বাড়ছে দূষণ। দূষণের জেরে নাকাল পানাগড় শিল্পতালুক লাগোয়া কাঁকসা, পানাগড়, মাধবমাঠ-সহ গোটা এলাকা।
প্রসঙ্গত, গত কয়েক বছর ধরে পানাগড়, পাণ্ডবেশ্বর, দুর্গাপুর শহরে মাত্রাতিরিক্ত বায়ু দূষণে জেরবার শহরবাসী। কখনও কখনও কেন্দ্রীয় পরিবেশ দফতরের তালিকায় বায়ু দূষণে দিল্লিকে ছাপিয়ে গেছে পানাগড় ও দুর্গাপুর। বিশেষত রাতুড়িয়া, অঙ্গদপুর, সগড়ভাঙা, বাঁশকোপা, বামুনাড়া, পানাগড় এলাকায় বাতাসে ধূলিকণা ও কারখানার কালো ছাইয়ে নাকাল শহরবাসী। বিজ্ঞানীমহল সূত্রে জানা গেছে, PM_{2.5} ও PM_{10}-এর মতো উপাদানগুলি ৬০ মাইক্রোগ্রাম প্রতি ঘনমিটারে থাকা স্বাভাবিক মানা হয়। সোমবার সকাল সাড়ে ৫টায় দুর্গাপুরে বায়ুর গুণমান সূচক (একিউআই) ছিল ৩৭৪। PM_{10} প্রতি ঘনমিটারে ২৩৩ মাইক্রোগ্রাম এবং PM_{2.5} ছিল ২১৬ মাইক্রোগ্রাম প্রতি ঘনমিটারে। আবার দুর্গাপুর পিসিবিএল, রাতুড়িয়া, অঙ্গদপুর কিংবা বামুনাড়া, বাঁশকোপা শিল্পতালুকে এই মাত্রা আরও একটু বেশি রয়েছে, যা স্বাভাবিকের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি।
অন্যদিকে, পাণ্ডবেশ্বর ও পানাগড়ে বায়ুর গুণমান সূচক পরিমাপের মনিটরিং স্টেশন না থাকলেও, দূষণের মাত্রা তুলনামূলকভাবে অনেকটাই বেশি বলে দাবি করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বায়ুর গুণমান সূচক বৃদ্ধিতে উদ্বিগ্ন শিল্পাঞ্চলবাসী। অণ্ডালে ডিভিসির ছাই বাতাসে মেশায় তা আতঙ্কের কারণ হয়ে উঠেছে। আবার পাণ্ডবেশ্বর বাজার ও তৎসংলগ্ন এলাকায় কারখানার ছাই এবং বাতাসে ধূলিকণা মাত্রাতিরিক্ত বেড়েছে। বাতাসে গুণমান সূচক বৃদ্ধিতে দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের উদাসীনতাকেই দায়ী করছে এলাকাবাসী।
পানাগড় শিল্পতালুকের ১৯ নম্বর জাতীয় সড়কের পাশেই রয়েছে একটি বেসরকারি সংস্থার পাথর ক্রাশার। সেখানে দিনভর চলছে স্ল্যাগ বোল্ডার ভাঙার কাজ। তার জেরেই বাতাসে মিশছে মাত্রাতিরিক্ত পাথরের গুঁড়ো ও ধূলিকণা। বাসিন্দাদের অভিযোগ, খনি অঞ্চলে রাস্তায় ভারী যানবাহন চলাচলের ফলে ধূলিকণা বেড়েছে। তার ওপর ভাঙাচোরা রাস্তার দরুন বাতাসে ধূলিকণা বাড়ছে। সেগুলো শরীরের ফুসফুসে গিয়ে ক্ষতি করছে; হাঁপানি, অ্যাজমার মতো রোগ হচ্ছে। আর এই মাত্রাতিরিক্ত দূষণে উদ্বিগ্ন গোটা শিল্পশহরবাসী। প্রশ্ন উঠছে, জনবসতি এলাকায় কীভাবে ক্রাশার তৈরির অনুমতি পেল? যদিও ওই ক্রাশার সংস্থার তরফে সুরজিৎ মজুমদার বলেন, পরিবেশ দপ্তরের বৈধ অনুমতি নিয়েই ক্রাশারের কাজ চলছে।
ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন -এর দাবি, একিউআই ১৫১-২০০ এর মধ্যে থাকলে বায়ুর গুণমানকে 'অস্বাস্থ্যকর এবং স্বাস্থ্যের ঝুঁকি' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সোমবার দুর্গাপুরের বায়ুর গুণমান সূচক ডব্লুএইচও-এর দাবি অনুযায়ী খুবই তীব্র, অস্বাস্থ্যকর ও ক্ষতিকর। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি দিনে প্রায় ১৫ থেকে ২০টি সিগারেট ধূমপানের সমতুল্য, যা শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা, হাঁপানি এবং কার্ডিওভাসকুলার স্ট্রেসের ঝুঁকি বাড়ায়।
সিলিকোসিস মূলত একটি পেশাগত ফুসফুসের রোগ। এটি কোনো সংক্রমণ বা ভাইরাস নয়, বরং দীর্ঘ সময় ধরে বাতাসে থাকা সিলিকা ধূলিকণার সূক্ষ্ম কণা নিঃশ্বাসের সাথে ফুসফুসে প্রবেশ করার ফলে এই রোগটি হয়ে থাকে। সিলিকোসিস রোগের মূল কারণ পাথর কাটা, ভাঙা বা গুঁড়ো করার সময় সিলিকার সূক্ষ্ম ধূলিকণা বাতাসে ওড়ে। এই অদৃশ্য ধূলিকণাগুলো শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ফুসফুসে প্রবেশ করে। ফুসফুসে জমা হওয়া সিলিকার কণাগুলো শরীর বের করতে পারে না। এর ফলে ফুসফুসের টিস্যুগুলোতে ক্ষত বা দাগ তৈরি হয় এবং ফুসফুস শক্ত হয়ে যায়। এর ফলে শ্বাস নিতে প্রচণ্ড কষ্ট হয়।
দুর্গাপুরের পরিবেশকর্মী কবি ঘোষ বলেন, দুর্গাপুরে দূষণ বেড়েছে। আমরা উদ্বিগ্ন। প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাতে হবে। আমরা দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদে অভিযোগ জানিয়েছি। কিন্তু দূষণ নিয়ন্ত্রণে কোনো কাজ হচ্ছে না। তার জন্য রাজ্য ও কেন্দ্র উভয় সরকারের সজাগ দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। এক কথায়, শিল্পাঞ্চলে দূষণ নিয়ন্ত্রণ লাটে উঠেছে।
যদিও এই বিষয়ে দুর্গাপুর পরিবেশ দফতর কোনো মন্তব্য করতে চায়নি।
হিন্দুস্থান সমাচার / জয়দেব লাহা