
কোটা, ১৭ জুন (হি.স.): ভারতের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার রাজধানী হিসেবে পরিচিত রাজস্থানের কোটা শহর। বহুদিন ধরেই লক্ষ লক্ষ ছাত্র-ছাত্রীর স্বপ্ন, সংগ্রাম, চাপ, ব্যর্থতা এবং কখনও কখনও মর্মান্তিক পরিণতির নীরব সাক্ষী এক কোটা শহর। সেই শহর থেকেই বুধবার দেশজুড়ে ‘ছাত্রোঁ কি গুঞ্জ’ কর্মসূচির সূচনা করলেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। সাম্প্রতিক নিট-ইউজি প্রশ্নপত্র ফাঁস, বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অনিয়ম এবং পড়ুয়াদের মানসিক চাপের প্রেক্ষাপটে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে দেশের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা করেন তিনি।
কোটার দশহরা ময়দানের শ্রী রাম রঙ্গমঞ্চে আয়োজিত অনুষ্ঠানে নিট ও জেইই পরীক্ষার্থীদের পাশাপাশি তাঁদের অভিভাবকদের সঙ্গেও সরাসরি কথা বলেন রাহুল। মঞ্চে উপস্থিত ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে থেকে সামিয়া মীনা, সানিয়া গুপ্তা এবং হিমাংশু ডাঙ্গি নামে তিনজনকে ডেকে তাঁদের অভিজ্ঞতা শোনেন তিনি।
নিজের বক্তব্যের শুরুতেই রাহুল বলেন, এটি কোনও রাজনৈতিক সভা নয়, কোনও বক্তৃতার মঞ্চও নয়। এটি দেশের ছাত্র-ছাত্রীদের কথা শোনার এবং তাঁদের যন্ত্রণা, উদ্বেগ, ভবিষ্যৎ এবং স্বপ্ন নিয়ে খোলা-মেলা আলোচনার একটি উদ্যোগ।
তিনি বলেন, ভারতের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা ধীরে ধীরে এমন এক জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে এটি আর ‘নির্বাচনের ব্যবস্থা’ নয়, বরং ‘অস্বীকৃতির ব্যবস্থা’ বা ‘রিজেকশন সিস্টেম’-এ পরিণত হয়েছে। লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রী বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম করে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সাফল্যের সুযোগ পায় মাত্র হাতে গোনা কয়েকজন।
উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, যদি তিন হাজার ছাত্র-ছাত্রীকে সামনে রাখা হয়, তাহলে তাঁদের মধ্যে মাত্র একজন আইএএস হওয়ার সুযোগ পাবে। প্রায় ৩০ জন আইআইটিতে পৌঁছাতে পারবে এবং মাত্র ১৮০ জন চিকিৎসক হওয়ার সুযোগ পাবে। অর্থাৎ অধিকাংশ পড়ুয়াই বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রমের পরও কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে না।
রাহুলের অভিযোগ, পরীক্ষার নামে এবং প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষা ব্যবস্থার নামে অভিভাবকদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ আদায় করা হচ্ছে। তাঁর দাবি, দেশের বিভিন্ন প্রবেশিকা পরীক্ষাকে ঘিরে যে কোচিং-নির্ভর ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে, সেখানে অভিভাবকদের কাছ থেকে এমন পরিমাণ অর্থ ব্যয় করানো হচ্ছে, যা পাঁচটি কেন্দ্রীয় মন্ত্রকের বাজেটের সমপরিমাণ বললেও অত্যুক্তি হবে না।
তিনি বলেন, আজকের শিক্ষা ব্যবস্থা এমন একটি দুষ্টচক্র তৈরি করেছে, যেখানে একটি পরিবারের অর্থনৈতিক সঞ্চয়, আশা এবং ভবিষ্যৎ সবকিছুই একটি পরীক্ষার ফলাফলের ওপর নির্ভর করে।
দেশের প্রযুক্তিগত শিক্ষার প্রসঙ্গ টেনে রাহুল বলেন, বাস্তবতা হল, দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ প্রকৌশলী বা ইঞ্জিনিয়ার বেকার। যদি একটি শিক্ষাব্যবস্থা লক্ষ লক্ষ যুবককে ডিগ্রি দেওয়ার পরও তাঁদের কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা দিতে না পারে, তাহলে সেই ব্যবস্থাকে সফল বলা যায় না।
তাঁর কথায়, “বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা দেয় না। তাই শুধু কিছু সংস্কার নয়, গোটা ব্যবস্থার পরিবর্তন প্রয়োজন।”
নিজের ‘ভারত জোড়ো যাত্রা’র অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই যাত্রাপথে তিনি দেশের নানা প্রান্তে লক্ষ লক্ষ যুবক-যুবতীর সঙ্গে কথা বলেছেন। অধিকাংশেরই লক্ষ্য ছিল ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আইনজীবী, প্রশাসনিক আধিকারিক বা সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া।
কিন্তু তাঁর মনে তখন একটি প্রশ্ন জেগেছিল ভারতের মতো বিশাল ও বহুমাত্রিক দেশে যুবসমাজের স্বপ্ন কি শুধুই এই পাঁচটি পেশাকে ঘিরে আবর্তিত হবে?
তিনি বলেন, কয়েকজন তরুণীর সঙ্গে কথা বলার সময় যখন তাঁদের মনের কথা জানতে চাওয়া হয়েছিল, তখন তাঁরা সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের স্বপ্নের কথা বলেছিলেন। কেউ শিল্পী হতে চেয়েছেন, কেউ উদ্যোক্তা, কেউ গবেষক, আবার কেউ অন্য কোনও সৃজনশীল ক্ষেত্রে কাজ করতে চেয়েছেন।
এই অভিজ্ঞতা থেকেই তাঁর উপলব্ধি হয়েছে যে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা শিশুদের স্বপ্নকে প্রসারিত করছে না, বরং একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে আটকে ফেলছে।
“আমাদের যুবসমাজের সম্ভাবনা অসীম। কিন্তু আমাদের নীতিনির্ধারণ এবং শিক্ষা ব্যবস্থা তাঁদের একটি সংকীর্ণ পরিসরের মধ্যে বেঁধে দেওয়ার চেষ্টা করছে,” বলেন রাহুল।
নিজের বক্তব্যে তিনি সম্প্রতি আত্মহত্যা করা কোটা-নিবাসী ছাত্রী আকাঙ্ক্ষার প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি ওই ছাত্রীর সুইসাইড নোট দেখান।
তিনি বলেন, আকাঙ্ক্ষার স্বপ্ন ছিল চিকিৎসক হওয়ার। তাঁর বাবা পক্ষাঘাতে আক্রান্ত। পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না। ঋণ নিয়ে মেয়েকে কোচিংয়ের জন্য কোটায় পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিল মেয়েটি।
নিজের শেষ চিঠিতে আকাঙ্ক্ষা লিখেছিল—“সরি মা-বাবা, আমি তোমাদের সব শেষ করে দিলাম।”
এই চিঠির প্রসঙ্গ টেনে রাহুল আবেগপ্রবণ হয়ে বলেন, “সত্যিটা হল, এতে আকাঙ্ক্ষার কোনও দোষ ছিল না। এটি একটি মেয়ের ব্যর্থতা নয়, বরং আমাদের গোটা ব্যবস্থার ব্যর্থতা।”
তিনি বলেন, দেশের কোনও ছাত্রছাত্রী যেন কখনও এমন পরিস্থিতিতে না পৌঁছায়, যেখানে তাকে নিজের জীবন শেষ করার কথা ভাবতে হয়—এটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্র এবং সমাজের যৌথ দায়িত্ব।
রাহুলের মতে, শিক্ষার নামে যে মানসিক নির্যাতন তৈরি হয়েছে, তার অবসান হওয়া প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, কোনও বাবা-মাকে সন্তানের পড়াশোনার জন্য ঋণের বোঝা বইতে হবে—এমন ব্যবস্থা সুস্থ সমাজের লক্ষণ হতে পারে না। প্রত্যেক শিশুর জন্য বিনামূল্যে, সহজলভ্য এবং উন্নতমানের শিক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
তাঁর অভিযোগ, সীমিত সুযোগ এবং তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে বর্তমানে প্রায় ২২ লক্ষ নিট পরীক্ষার্থীর পরিবারকে বিপুল আর্থিক চাপে পড়তে হচ্ছে। শিক্ষাকে কেন্দ্র করে যে লাগামছাড়া বাণিজ্য গড়ে উঠেছে, তা শুধু একটি অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, বরং একটি সামাজিক অপরাধ।
তিনি বলেন, দেশের প্রয়োজন এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা, যেখানে কম খরচে উন্নতমানের শিক্ষা পাওয়া যাবে, যেখানে ছাত্রছাত্রীদের ওপর অমানবিক চাপ সৃষ্টি হবে না এবং যেখানে প্রত্যেক তরুণ-তরুণী নিজের স্বপ্ন পূরণের জন্য সমান সুযোগ পাবে।
কোটার মঞ্চ থেকে রাহুল গান্ধীর এই বার্তা শুধু নিট বা জেইই পরীক্ষার্থীদের উদ্দেশে নয়, বরং দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে নতুন করে ভাবার আহ্বান বলেই রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে।
হিন্দুস্থান সমাচার / সৌমি বৈদ্য