অপেক্ষার অন্ত, আজ রাত ০৯:০৮:৪২টায় অম্বুবাচির প্রবৃত্তি, সাধক-তান্ত্রিক-পুণ্যার্থীর ভিড়ে মুখরিত কামাখ্যা, তৎপর প্রশাসন
গুয়াহাটি, ২২ জুন (হি.স.) : অপেক্ষার অন্ত, গুয়াহাটির নীলাচল পাহাড়ে অবস্থিত বিখ্যাত শক্তিপীঠ কামাখ্যা মন্দিরে আজ রাতেই শুরু হয়ে যাবে অম্বুবাচির মহাযুগ। অন্যান্যবারের মতো এবারও অম্বুবাচি উপলক্ষে দেশ-বিদেশের লাখো ভক্ত এসেছেন কামাখ্যা মন্দির। সমস্ত নী
কামাখ্যা মন্দ্রিরে ভক্তকুলের ভিড় (ফাইল ফটো)


গুয়াহাটি, ২২ জুন (হি.স.) : অপেক্ষার অন্ত, গুয়াহাটির নীলাচল পাহাড়ে অবস্থিত বিখ্যাত শক্তিপীঠ কামাখ্যা মন্দিরে আজ রাতেই শুরু হয়ে যাবে অম্বুবাচির মহাযুগ। অন্যান্যবারের মতো এবারও অম্বুবাচি উপলক্ষে দেশ-বিদেশের লাখো ভক্ত এসেছেন কামাখ্যা মন্দির। সমস্ত নীলাচল পাহাড় লাল-গেরুয়া পোশাকে সজ্জিত সাধু-সন্ন্যাসীর ভিড়ে একাকার। এর মধ্যে রয়েছেন কালো পোশাক পরে তন্ত্র সাধক ও সাধিকা। যে দিকে চোখ যায় সে দিকে দেখা যায় সশরীরে নানা দেব-দেবীর সাজে সজ্জিত সাধু-সন্ন্যাসিনীদের পদচারণা। কেউ গায়ে ভস্ম মেখে শিব, তো কেউ নটরাজ, কেউ আবার কালী, নয়তো রাধা-কৃষ্ণ সেজে ভক্তদের আশিস দিচ্ছেন। আবার নিরালায় বহু তন্ত্রসাধক মগ্ন ধ্যানাসনে।

এদিকে অম্বুবাচি প্ৰসঙ্গে মন্দিরের প্রধান দলই কবীন্দ্রপ্রসাদ শর্মা জানান, মৃগশিরা নক্ষত্রের শেষ পাদ এবং আর্দ্রা নক্ষত্রের শুরুতে আজ সোমবার রাত ০৯-টা ০৮ মিনিট ৪২ সেকেন্ড মায়ের প্রবৃত্তি হবে। প্রবৃত্তির সঙ্গে সঙ্গে কামাখ্যাধামে শুরু হয়ে যাবে দেবীর অম্বুবাচি ষুগ। ২৬ তারিখ শুক্রবার সকাল ০৯টা ২৫ মিনিট ০২ সেকেন্ডে নিবৃত্তি হবে। নিবৃত্তির সঙ্গে সঙ্গে ওইদিনই সকালে বিশেষ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান নিত্যপূজা সম্পন্ন হওয়ার পর মন্দিরের মূল কপাট ভক্ত-দর্শকদের জন্য খুলে দেওয়া হবে, জানান প্রধান দলই কবীন্দ্রপ্রসাদ।

তিনি জানান, ইতিমধ্যে অম্বুবাচি মেলা কমিটি প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। আজ সন্ধ্যারতি এবং দেবী কামাখ্যাকে প্রদক্ষিণ করে মন্দিরের দরজা চারদিনের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হবে।

এদিকে প্রশাসনিক ব্যবস্থা সম্পর্কে জেলাশাসক স্বপ্নীল পাল জানান, শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার প্রতি খেয়াল রেখে এবার অম্বুবাচির কয়েকদিন অর্থাৎ আজ ২২ জুন থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত কামাখ্যাধামে ওঠা-নামা করতে কোনও গাড়িঘোড়া যাতায়াতের অনুমতি দেওয়া হবে না। সবাইকে নীলাচল পাহাড়ের পাদদেশ থেকে পায়ে হেঁটে উঠতে হবে কামাখ্যা মন্দির চত্বরে। কামাখ্যা মন্দির পর্যন্ত যাতায়াত পথে স্থানে স্থানে থাকবে পানীয় জলের ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত আলো ও সুরক্ষার বিশেষ ব্যবস্থা। এছাড়াও পাদুকা রাখার জন্যও বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়েছে। জুতো খুলে তীর্থযাত্রীরা কার্পেটের ওপর দিয়ে খোলা পায়ে হেঁটে যেতে পারবেন।

জেলাশাসক পাল আরও জানান, অন্যবারের মতো এবারও মেলাকে কেন্দ্র করে সুরক্ষার ওপর বিশেষ ব্যবস্থাস্বরূপ কামাখ্যা দেবালয় চত্বরে প্রায় ২০০ জন স্থায়ী সুরক্ষা কর্মী নিয়োজিত করা হয়েছে। রয়েছেন ৪০০ জন স্কাউটগাইড, ৪০০ জন স্বেচ্ছাসেবক এবং ১৪০ জন অস্থায়ী সুরক্ষাকর্মী। এছাড়া মন্দিরের আশপাশ সহ গোটা মন্দির চত্বরে ৫৮০টি সিসিটিভি ক্যামেরা সংস্থাপন করা হয়েছে।

তিনি জানান, রাখা হয়েছে ডেস্কস্ক্যানার, মেটাল ডিটেক্টর এবং সাদা পোশাকে পুলিশ। তাঁরা ভক্তকুলের ভিড়ে মিশে থাকবেন। বেলেল্লাপনা দেখলেই অন-স্পট ব্যবস্থা নেবেন তাঁরা। তাছাড়া, স্বচ্ছতার ওপর এবার অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়ে তিনি বলেন, এজন্য ১৫০ জনের বেশি স্থায়ী সাফাইকর্মী ছাড়াও ২০০ জন অস্থায়ী সাফাই কর্মী মন্দির পরিচালন কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে নিয়োগ করা হয়েছে।

অম্বুবাচির সময় তামাক বিক্রি ও কেনা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে বলে জানান জেলাশাসক। মেলার কয়দিন নিরবচ্ছিন্ন পরিষেবা ও কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করতে সরকারি আধিকারিক ও কর্মচারীদের পালাক্রমে ২৪ ঘণ্টা দায়িত্বে মোতায়েন করা হবে। জানান, মেলার সঙ্গে সম্পৃক্ত পূর্ত বিভাগ, জনস্বাস্থ্য ও কারিগরি বিভাগ, স্বাস্থ্য বিভাগ, বিদ্যুৎ কোম্পানি, গুয়াহাটি পুর নিগম, পুলিশ বিভাগ, পুলিশ ও স্বাস্থ্যের আপৎকালীন বিভাগ, পরিবহণ, এনডিআরএফ-এসডিআরএফ ইত্যাদি বিভাগের প্রস্তুতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগের শীর্ষ কর্তাদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেছেন। মেলাকে সর্বাঙ্গসুন্দর ও নির্ঝঙ্ঝাট করতে সকল বিভাগের কর্তাদের সংঘবদ্ধভাবে কাজ করতে আহ্বান জানিয়েছেন জেলাশাসক।

জেলাশাসক পাল জানান, প্ৰশাসনিক প্রস্তুতির অংশ হিসেবে কামাখ্যা রেলওয়ে স্টেশন এবং পাণ্ডুপোৰ্টে তিনটি অস্থায়ী তীর্থযাত্রী শিবির স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি আগত ভক্তদের জন্য ভাণ্ডারা (বিনামূল্যে সমবায় ভোজন) পরিচালনার উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট স্থানও বরাদ্দ করা হয়েছে।

তীর্থযাত্রীদের ভিড় নিয়ন্ত্রণের জন্য মালিগাঁওয়ের নার্সারি পয়েন্ট দিয়ে নীলাচল পাহাড়ে প্রবেশ নিয়ন্ত্রিত করা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নার্সারি পয়েন্ট থেকে মন্দির চত্বর পর্যন্ত চারটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ এবং সাতটি সহায়তা কেন্দ্র (হেল্প ডেস্ক) স্থাপন করা হয়েছে, যাতে ভক্তদের প্রয়োজনীয় তথ্য ও সহায়তা প্রদান করা যায়।

জেলাশাসক জানান, উত্তরপূর্ব ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব অম্বুবাচি মেলায় আগত বিপুল সংখ্যক তীর্থযাত্রীর জন্য নিরাপদ, সুশৃঙ্খল এবং আধ্যাত্মিকভাবে সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করাই এই সমস্ত ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য।

স্বপ্নীল পাল জানান, মন্দির চত্বর ও আশপাশ এলাকায় পরিচ্ছন্নতা ও স্যানিটেশনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। প্রবীণ নাগরিক ও বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তিদের জন্যও বিশেষ সুবিধার ব্যবস্থা করা হয়েছে, যাতে তাঁদের তীর্থযাত্রা নির্বিঘ্ন হয়। জনস্বাস্থ্যের কথা মাথায় রেখে মেলা চলাকালীন খাদ্যের গুণমান ও নিরাপত্তার মান পর্যবেক্ষণের জন্য খাদ্য পরিদর্শকদের মোতায়েন করা হয়েছে।

মেলায় দেশ-বিদেশের ভক্তবৃন্দের সম্ভাব্য আগমনের প্রতি লক্ষ্য রেখে তাঁদের যাতায়াত ব্যবস্থা, থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা, অনাময় (শৌচাদি ক্রিয়া) ব্যবস্থা ইত্যাদি সব বিষয়ে এক বিস্তৃত সরকারি পরিকল্পনার কথাও তিনি জানান। জানান, মেলায় আগত ভক্তবৃন্দের থাকা-খাওয়ায় স্বাচ্ছ্ন্দ্য আনতে এবারও ছয়টি বিশাল বিশাল শিবির তৈরি করা হয়েছে। ১০০-এর বেশি বাস এবং ফেরি ব্যবস্থা থাকবে যাতে নীলাচল পাহাড়ে ওঠে মা কামাখ্যা মন্দিরে ভক্তকুল যেতে পারেন।

এদিকে গুয়াহাটির ডেপুটি কমিশনার অব পুলিশ (ট্রাফিক) জয়ন্তসারথি বরুয়া মেলার জন্য বিস্তারিত যান নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনার কথা জানান। তিনি জানান, জরুরি পরিষেবার গাড়ি ছাড়া কোনও যানবাহন নার্সারি পয়েন্টের পর আর যেতে পারবে না। খাদ্য সরবরাহকারী যানবাহনগুলোকে রাত ১১টা থেকে ভোর ৫.০০টা পর্যন্ত চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

ডিসিপি জানান, ভক্তদের যাতায়াতের সুবিধার জন্য পাণ্ডু রুট এবং সোনারাম স্কুলের খেলার মাঠ থেকে ফেরি পরিষেবার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কামাখ্যা রেলওয়ে স্টেশন থেকে পাণ্ডু পোর্টের দিকে যাওয়া যানবাহন আদাবাড়ি হয়ে ঘুরিয়ে দেওয়া হবে। অন্যদিকে, জালুকবাড়ির দিক থেকে আগত যানবাহন ‘স্বাগত’ হাসপাতাল রুট দিয়ে যেতে পারবে না।

পাবলিক বাসগুলোকে ফ্লাইওভার ব্যবহার করার অনুমতি দেওয়া হবে। তবে ফ্লাইওভারের নিচের সার্ভিস রোডে চলাচলের অনুমতি থাকবে না। প্রশাসন একাধিক পার্কিংয়ের স্থান নির্ধারণ করেছে। রাস্তার পাশে গাড়ি রাখা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

এছাড়া ২৭ নম্বর জাতীয় সড়ক থেকে তেতেলিয়া হয়ে গোশালা অভিমুখে যাতায়াতকারী ভারী যানবাহনের ওপরও বিধিনিষেধ থাকবে। সম্ভাব্য যানজটের কথা বিবেচনা করে লোকপ্রিয় গোপীনাথ বরদলৈ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাতায়াতকারী যাত্রীদের আগেভাগে যাত্রার পরিকল্পনা করা এবং সম্ভব হলে ২৭ নম্বর জাতীয় সড়ক করিডর ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

নীলাচল ফ্লাইওভারের নিচের পুরো অংশকে সংরক্ষিত পার্কিং জোন হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি পাণ্ডু পোর্ট রোড, বড়বাজার রোড, ডিজি রোড, ভরলুমুখের এলিভেটেড করিডর এবং নীলাচল ফ্লাইওভারের বিভিন্ন অংশে রাস্তার ধারে পার্কিং সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যাতে যান চলাচল নির্বিঘ্ন থাকে।

অন্যদিকে পর্যটন দফতরের কমিশনার-সচিব দিগন্ত বরা জানান, ভক্তরা সকাল ৫.০০টা থেকে সন্ধ্যা ৬.০০টা পর্যন্ত কামাখ্যা মন্দিরের দিকে যেতে পারবেন। তিনি আরও জানান, মদ্যপ বা মাদকাসক্ত অবস্থায় পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে শহরবাসী, যাত্রী এবং আগত ভক্তদের ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে সহযোগিতা করতে এবং ঘোষিত নির্দেশিকা মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে, যাতে অম্বুবাচি মহাযোগ ২০২৬ সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করা যায়।

হিন্দুস্থান সমাচার / সমীপ কুমার দাস




 

 rajesh pande