
কলকাতা, ২২ জুন (হি.স.): সোমবার রাজ্য সরকারের পূর্ণাঙ্গ বাজেট পেশ হলো পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায়। ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের জন্য মোট ৪ লক্ষ ৩৮ হাজার ৭৭৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে বাজেটে। দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনিক কাঠামোয় জোর দিয়েছে রাজ্য সরকার। বাজেট পেশ করার সময় অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত বলেন, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনিক কাঠামো গঠন করা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির মূল স্তম্ভ। রাজ্যের জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে হবে আমাদের। রাজ্য সরকার নাগরিকদের কাছে পৌঁছোতে ‘আপনার সরকার, আপনার পাশে’ নামে একটি নতুন উদ্যোগ নিয়েছে।
অর্থমন্ত্রী এও বলেন, রাজ্যে চালু থাকা সকল সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প অব্যাহত থাকবে। তিনি বলেন, সরকারি প্রকল্পের সুবিধা যাতে সকলের কাছে পৌঁছয়, তা দেখার চেষ্টা করা হবে। সরকারি প্রকল্পের সুবিধা সমাজের সবচেয়ে দুর্বল শ্রেণির কাছে পৌঁছে দেওয়া নিশ্চিত করতে হবে। এই প্রকল্পগুলির প্রয়োজনীয় পরিবর্তন ঘটাতে হবে। পাশাপাশি, কেন্দ্রের আর্থিক সাহায্য এবং সংস্কারের হাত ধরে রাজ্যের ঋণের অঙ্ক কমিয়ে আয়ের পথে হাঁটা হবে। রাজ্যে মোট ঋণ রয়েছে ৮ লক্ষ ১৫ হাজার ৮৯১ কোটি টাকার। ঘোষণা করলেন অর্থমন্ত্রী।
এদিন অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্তর পেশ করা রাজ্য বাজেটের অন্যতম ঘোষণাগুলি :
রাজ্য সরকারি ১ লক্ষ শূন্যপদে নিয়োগ। ৩৩ শতাংশ মহিলাদের জন্য সংরক্ষণ। পুলিশে ২০ হাজার নিয়োগ। ৫০ হাজার শিক্ষক নিয়োগের প্রস্তাব। আগামী দু'বছর বয়সের ক্ষেত্রে বাড়তি ছাড়।
২১ থেকে ৪৫ বছর বয়সি যোগ্য-শিক্ষিত বেকার যুবকদের মাসিক ভাতা দেওয়ার জন্য অক্টোবর থেকে ভরসা কর্মসূচি চালু হবে। এই প্রকল্পে স্নাতক বেকারদের জন্য মাসে ৩ হাজার টাকা এবং অন্যদের মাসে ২ হাজার টাকা ভাতা দেওয়া হবে। যে পরিবারের আয় এক লক্ষ টাকার কম এবং যাঁরা অন্য কোনও সামাজিক প্রকল্পের সুবিধা পাচ্ছেন না, তাঁদের জন্য এটি প্রযোজ্য হবে।
বিধায়ক তহবিলে অর্থের পরিমাণ ৭০ লক্ষ থেকে বেড়ে ১ কোটি, বাজেটে ঘোষণা অর্থমন্ত্রীর।
নারী ক্ষমতায়নে বিশেষ জোর। অন্নপূর্ণা যোজনায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ। ২৫ থেকে ৬০ বছরের মহিলারা সরাসরি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পাবেন টাকা। মহিলাদের বিনামূল্যে বাস পরিষেবার জন্য বরাদ্দ করা হচ্ছে ৫৫০ কোটি টাকা। এই উদ্দেশ্যে শীঘ্রই পিঙ্ক কার্ড চালু করা হবে বলে ঘোষণা করেন অর্থমন্ত্রী।
স্টেট ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশনে চুক্তিভিত্তিক কন্ডাক্টরদের পারিশ্রমিক বৃদ্ধি করে মাসে ১৬ হাজার টাকা করা হবে। সিভিক ভলান্টিয়ার, ভিলেজ পুলিশ ও গ্রিন পুলিশের পারিশ্রমিক মাসিক ২ হাজার টাকা বৃদ্ধি। এনভিএফ কর্মী, প্রাণীবন্ধু, প্রাণীমিত্রদের পারিশ্রমিক ২ হাজার টাকা বৃদ্ধি। আগস্ট থেকে মিলবে বাড়তি টাকা। অঙ্গনওয়াড়ি ও আশাকর্মীদের মাসিক ৫ হাজার টাকা বেতন বৃদ্ধির ঘোষণা অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্তর। বয়স্ক, বিধবা এবং বিশেষভাবে সক্ষমদের মাসিক ভাতা ৫০০ টাকা করে বৃদ্ধির ঘোষণা করা হল বাজেটে। অবসরপ্রাপ্ত সাংবাদিকদের ৫ হাজার টাকা পেনশন।
সরকারি কর্মচারীদের জন্য ২০ শতাংশ মহার্ঘভাতা বৃদ্ধির ঘোষণা করলেন অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত। আগামী ১ অক্টোবর থেকে এটি কার্যকর হবে বলে জানান তিনি। এত দিন সরকারি কর্মীরা ১৮ শতাংশ হারে ডিএ পেতেন। নতুন ঘোষণা কার্যকর হলে বর্ধিত হারে সব মিলিয়ে ৩৮ শতাংশ ডিএ পাবেন রাজ্যের সরকারি কর্মীরা। এই ঘোষণার ফলে কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীদের সঙ্গে রাজ্যের সরকারি কর্মীদের ডিএ-র ফারাক রইল ২২ শতাংশ। অর্থমন্ত্রীর ঘোষণায় খুশি সরকারি কর্মীরা। ১২৫ দিনের জি রাম জি-তে ১৪ হাজার কোটি বরাদ্দ বৃদ্ধি।
শহরাঞ্চলে বাড়ছে আরও ৪টি মা আহার কেন্দ্র। ৫ টাকায় মিলবে মাছ-ভাত। এছাড়া, রাজ্যের সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের মাথাপিছু দৈনিক খাবারের জন্য টাকা বাড়ানো হল। সোমবার রাজ্য বাজেটে সেটি বাড়িয়ে দৈনিক ১১০ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, বাড়ছে প্রাথমিক স্কুলে মিড ডে মিল উপকরণের ব্যয় বরাদ্দ। বাজেট ভাষণে প্রস্তাব পেশ করলেন অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত। প্রাথমিক স্কুলে মিড ডে মিলের উপকরণের খরচ ১০ টাকা করা হবে। এতদিন মিড ডে মিলে মাথাপিছু বরাদ্দ প্রায় ৬ টাকা ৭৮ পয়সা। উচ্চ প্রাথমিকের ক্ষেত্রে ৮ টাকা ১৭ পয়সার কাছাকাছি। এছাড়়াও কলকাতা পুরসভা এলাকায় স্কুলে স্কুলে পুষ্টিকর রান্না করে মিড ডে মিল দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এই উদ্যোগে ইসকনের সহযোগিতা নেবে রাজ্য সরকার। কলকাতা পুরসভা এলাকায় স্কুলে স্কুলে পুষ্টিকর রান্না করে মিড ডে মিল পৌঁছে দেবে ইসকন।
পিপিপি মডেলে দাদনপাত্রবাড়ে গভীর সমুদ্রবন্দর তৈরির প্রস্তাব অর্থমন্ত্রীর। বীরভূমে ময়ূরাক্ষীর উপর ৪ লেনের ব্রিজ। দুর্গাপুর, আসানসোল, শিলিগুড়িতে মেট্রো পরিষেবা চালুর প্রস্তাব।
বাজেট ঘোষণায় উত্তরবঙ্গের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে। উত্তরবঙ্গে একটি আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়াম এবং একটি ইনডোর স্টেডিয়াম তৈরি হবে। ক্রীড়া সংস্কৃতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে রাজ্যে খেলো ইন্ডিয়া কার্যক্রম শুরু হবে। রাজ্যে প্রতিটি বিধানসভা এলাকায় ৫ কোটি টাকা ব্যয় করে মিনি ইনডোর স্টেডিয়াম তৈরি হবে। উত্তরবঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, সেমি কন্ডাক্টরে ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ। পাটশিল্প পুনরুজ্জীবনে উদ্যোগ। গঙ্গারামপুর, কুশমান্ডিতে কার্পেট শিল্প চাঙ্গা করতে উদ্যোগ। উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলে ব্যাটারচালিত গাড়ির কারখানা হবে। উত্তরবঙ্গে আইআইটি ও এইমস হবে। কালিম্পং ও দক্ষিণ দিনাজপুরে মেডিক্যাল কলেজ হবে।
প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য বিনাখরচের কোচিং সেন্টার চালু হবে। রাজ্যের প্রতিটি জেলায় তৈরি হবে বিনামূল্যের কোচিং সেন্টার। রাজ্যে আদর্শ বিদ্যালয় তৈরির জন্য ২১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হচ্ছে। সংস্কৃত কলেজ ও সংস্কৃত ভাষার প্রসারের জন্য বরাদ্দ করা হচ্ছে ৫০ কোটি টাকা। ঝাড়গ্রাম ও বাঁকুড়ায় দু’টি কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হবে। ঝাড়গ্রামে আদিবাসী বিশ্ববিদ্যালয় তৈরির ঘোষণা করলেন অর্থমন্ত্রী।
রাজ্য সরকারের নতুন বাজেটে জোর দেওয়া হয়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নেও। কলকাতার কাছে আরও একটি বিমানবন্দর তৈরির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বাজেটে। কল্যাণীর কাছে একটি ‘গ্রিনফিল্ড’ বিমানবন্দর তৈরি করতে এক হাজার- দেড় হাজার একর জমি চিহ্নিত করবে সরকার। পাশাপাশি কেন্দ্রের উড়ান প্রকল্পের আওতায় পুরুলিয়া, বালুরঘাট এবং মালদাতেও বিমানবন্দর তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
রাজ্যে মোট পাঁচটি নতুন জেলা গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বাজেটে। এই পাঁচটি প্রস্তাবিত জেলা হল— কলকাতা, বসিরহাট, সুন্দরবন, জঙ্গিপুর এবং আরামবাগ। পাশাপাশি কাঁথিতে একটি নতুন পুলিশ জেলা গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। গোপীবল্লভপুরে তৈরি হবে নতুন মহকুমা। পাশাপাশি শিবমন্দির, গাজোল, চাঁচল, বেলদা, বাগনান, জয়গাঁ, কোলাঘাট, কামারপুকুর এবং টুঙ্গিদিঘিতে নতুন পুরসভা গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
এছাড়াও অর্থমন্ত্রী এদিন ঘোষণা করেন, এখন থেকে কোনও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও ধর্মীয় স্থানের এক কিলোমিটারের মধ্যে কোনও মদের দোকানের লাইসেন্স দেওয়া হবে না। কলকাতা পুরসভার ক্ষেত্রে এই লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে ন্যূনতম দূরত্ব হবে ৫০০ মিটার। ব্যবসাকে সিন্ডিকেট চার্জ এবং অন্য বেআইনি অর্থ আদায় থেকে রক্ষা করার আইন আনা হবে বলে জানান অর্থমন্ত্রী।
দুর্গাপুজোকে ঘিরে বিশ্বজনীন পর্যটন ব্র্যান্ডিং। কঙ্কালীতলা, কালীঘাট, তারাপীঠ, মদনমোহন মন্দিরের সংরক্ষণ ও প্রসারের বন্দোবস্ত। শ্রীশ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু তীর্থযাত্রা সার্কিট ও শক্তিপীঠ সার্কিট গড়ে তোলা হবে। দার্জিলিংকে ইকো অ্যাডভেঞ্চার পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে। ঝাড়গ্রাম চিড়িয়াখানায় টাইগার সাফারি।
এ বার থেকে ৬ জুলাই রাজ্যে সরকারি ছুটি থাকবে। সোমবার রাজ্য বাজেটে এই বড় ঘোষণা করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের অনবদ্য অবদানকে স্মরণ ও সম্মান জানাতেই রাজ্যের বিজেপি সরকার এই বিশেষ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আগামী ৬ জুলাই শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ১২৫তম জন্মবার্ষিকী। এই বছর থেকে প্রতি বছর এই দিনটিতে রাজ্য সরকারি কর্মচারীরা ছুটি পাবেন।
শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ১২৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে এ বছর রাজ্য জুড়ে নানা অনুষ্ঠান ও বড়সড় উদ্যোগের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বলাগড়ের জীরাটে তাঁর যে পৈতৃক বাড়ি রয়েছে, তা সম্পূর্ণ সংস্কার করা হবে। শুধু তাই নয়, সেখানে তাঁর একটি ১২৫ ফুট উঁচু বিশাল মূর্তি স্থাপন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সামগ্রিক এই প্রকল্পের জন্য রাজ্য বাজেটে ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের সৃষ্টি এবং ইতিহাসের পটভূমিতে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের অবদানকে আমজনতার সামনে তুলে ধরতে একাধিক পদক্ষেপ করছে বর্তমান রাজ্য সরকার। সম্প্রতি ২০ জুন দিনটিকে ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ হিসেবে পালন করার যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তার সঙ্গেও জড়িয়ে রয়েছে তাঁর ঐতিহাসিক ভূমিকা। এ ছাড়াও গত ২১ জুন থেকে তাঁর স্মৃতি-পক্ষ পালনেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
---------------
হিন্দুস্থান সমাচার / সৌম্যজিৎ