ইন্দিরা গান্ধীর ‘ভুল রাজনৈতিক অনুমান’ই শেষ পর্যন্ত ভারতের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল : রাম বাহাদুর রায়
নয়াদিল্লি, ২৬ জুন (হি.স.) : ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থা এমন এক অধ্যায়, যার অভিঘাত আজও বিভিন্ন ব্যাখ্যা ও বিতর্কের মধ্যে বেঁচে আছে। সেই ইতিহাসকেই নতুন করে ব্যাখ্যা করলেন প্রাক্তন মিসা বন্দি, বিশিষ্ট সাংবাদিক এবং আইজিএনসিএ-র সভা
ইন্দিরা গান্ধীর ‘ভুল রাজনৈতিক অনুমান’ই শেষ পর্যন্ত ভারতের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল : রাম বাহাদুর রায়


নয়াদিল্লি, ২৬ জুন (হি.স.) : ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থা এমন এক অধ্যায়, যার অভিঘাত আজও বিভিন্ন ব্যাখ্যা ও বিতর্কের মধ্যে বেঁচে আছে। সেই ইতিহাসকেই নতুন করে ব্যাখ্যা করলেন প্রাক্তন মিসা বন্দি, বিশিষ্ট সাংবাদিক এবং আইজিএনসিএ-র সভাপতি পদ্মভূষণ রাম বাহাদুর রায়। তাঁর মতে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ভুল ছিল এই বিশ্বাস—জনসমর্থন ও পরিস্থিতি তাঁর পক্ষেই থাকবে এবং তিনি সহজেই নির্বাচনে জয়ী হবেন। সেই ‘ভুল রাজনৈতিক অনুমান’ই শেষ পর্যন্ত তাঁর পরাজয় এবং দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পথ তৈরি করে দেয়।

শুক্রবার নয়াদিল্লির ইন্দিরা গান্ধী ন্যাশনাল সেন্টার ফর দ্য আর্টস (আইজিএনসিএ)-তে ‘প্রজ্ঞা জিজ্ঞাসা’ ট্রাস্টের উদ্যোগে জরুরি অবস্থার ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত “সংবাদ : ইমার্জেন্সির শিক্ষা” শীর্ষক আলোচনাসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি এই মন্তব্য করেন। অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল “ইমার্জেন্সি : আন্দোলন ও বিশ্বাসঘাতকতার অন্তর্কথা” শীর্ষক বইটির প্রকাশ। বইটির লেখক প্রবীণ সাংবাদিক ও গবেষক অজয় সেতিয়া।

রাম বাহাদুর রায় বলেন, ইন্দিরা গান্ধীর শাসনকালকে শুধুমাত্র প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা যায় না, বরং এটি ছিল ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, সাংবিধানিক সংশোধন এবং রাজনৈতিক চাপের এক দীর্ঘ প্রক্রিয়া। তাঁর দাবি, লোকসভার কার্যকাল দু’বার বাড়ানো হলেও রাজনৈতিক বাস্তবতা ও বিরোধী শিবিরের ক্রমবর্ধমান শক্তিকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা যায়নি।

তিনি বলেন, তৎকালীন গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্ট এবং ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক পরামর্শদাতাদের মূল্যায়নের ভিত্তিতে ইন্দিরা গান্ধীর মধ্যে এই ধারণা তৈরি হয়েছিল যে তিনি আসন্ন নির্বাচনে সহজেই জয়ী হবেন। কিন্তু বাস্তবে রাজনৈতিক সমীকরণ ছিল আরও জটিল, এবং সেই ব্যবধানই ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

রাম বাহাদুর রায়ের মতে, ১৯৭৫ সালের ১২ জুন ভারতের রাজনৈতিক পরিসরে একের পর এক ঘটনা ঘটে, যা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে। ওই দিন সকাল ৬টায় ইন্দিরা গান্ধীর ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা ডি.পি. ধর-এর মৃত্যু ঘটে, যা প্রশাসনিক মহলে গভীর শূন্যতা তৈরি করে। সকাল ১০টায় এলাহাবাদ হাইকোর্টের ঐতিহাসিক রায়ে তাঁর নির্বাচনী বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়, এবং বিকেল ৪টায় গুজরাট বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের পরাজয় রাজনৈতিক অস্থিরতাকে আরও ঘনীভূত করে তোলে।

এই তিনটি ঘটনার সম্মিলিত প্রভাবেই দিল্লির রাজনৈতিক পরিবেশ দ্রুত পরিবর্তিত হতে শুরু করে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

এরপর তিনি জানান, হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে দ্রুত সুপ্রিম কোর্টে আপিল দায়ের করা হয়। ২৪ জুন শীর্ষ আদালত অন্তর্বর্তী নির্দেশে জানায়, ইন্দিরা গান্ধী প্রধানমন্ত্রী পদে বহাল থাকতে পারবেন, তবে সংসদে ভোটাধিকার সীমিত থাকবে। এই সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক অস্থিরতাকে আরও গভীর করে তোলে এবং বিরোধী শিবিরকে আরও সক্রিয় করে।

এর ঠিক পরদিন, ২৫ জুন, দিল্লির রামলীলা ময়দানে জয়প্রকাশ নারায়ণের নেতৃত্বে এক বিশাল গণসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়, যা সরকারের বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষের প্রতীক হয়ে ওঠে। সেই রাতেই দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়—যা ভারতের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এক গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে।

রাম বাহাদুর রায়ের বিশ্লেষণে উঠে আসে জরুরি অবস্থা ঘোষণার পেছনে তিনটি মূল রাজনৈতিক উদ্দেশ্য—ক্ষমতায় টিকে থাকা, বিচারব্যবস্থার রায়কে কার্যত সীমিত বা অকার্যকর করা এবং বিরোধী রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও ভিন্নমতের কণ্ঠস্বরকে সম্পূর্ণভাবে দমন করা। এই লক্ষ্য পূরণে পরবর্তীতে ৩৮তম, ৩৯তম এবং ৪০তম সংবিধান সংশোধনী আনা হয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, ৪ জুলাই ১৯৭৫ সালে আরএসএস নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলেও সংগঠনটি ভিন্ন কৌশলে কাজ চালিয়ে যায়। ‘লোক সংগ্রাম সমিতি’-র ব্যানারে দেশজুড়ে গোপন আন্দোলন সংগঠিত হয় এবং প্রশাসনিক নজরদারি এড়িয়ে বিভিন্ন অঞ্চলে ছয়টি ভাগে সংগঠন পরিচালিত হয় বলে তাঁর দাবি।

রায় জানান, প্রায় ১১০০ প্রচারকের মধ্যে মাত্র ১১৭ জনকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়েছিল, বাকিরা দীর্ঘ সময় গোপনে থেকে আন্দোলন পরিচালনা করেন এবং প্রশাসনের নজর এড়িয়ে সংগঠনকে সক্রিয় রাখেন।

জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিরোধে বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির ভিন্ন মতাদর্শ থাকা সত্ত্বেও একত্রিত হওয়ার ঘটনাও তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, জর্জ ফার্নান্ডেজের নেতৃত্বে ‘ডায়নামাইট আন্দোলন’ ছিল তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত, যেখানে জনসংঘ নেতা ভীরেন জে. শাহ আর্থিক সহায়তা দেন। একই সময়ে সরকারের দ্বৈত নীতি লক্ষ্য করা যায়—কোথাও গ্রেফতার, আবার কোথাও তদন্ত স্থগিত।

রায় আরও বলেন, জয়প্রকাশ নারায়ণ ১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলনের আদলে বিভিন্ন মতাদর্শকে একত্রিত করেছিলেন—আরএসএস, সমাজবাদী এবং নকশালপন্থীরা একই মঞ্চে আসে। এই রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরিতে লালকৃষ্ণ আডবাণী ও ওমপ্রকাশ ত্যাগীর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি জানান, ১৯৭৫ সালের শেষ দিকে রাজনৈতিক মহলে এই ধারণা তৈরি হয় যে ইন্দিরা গান্ধী দ্রুত নির্বাচনের পথে যেতে পারেন। সেই তথ্য ‘ইকোনমিক টাইমস’-এর তৎকালীন সম্পাদক হিরণ্ময় কারলেকর রামনাথ গোয়েঙ্কার মাধ্যমে বিরোধী শিবিরে পৌঁছে দেন। এরপর ভাউরাও দেওরস উত্তরপ্রদেশে জনসংঘ নেতাদের ৪০টি আসন চিহ্নিত করার নির্দেশ দেন। জেল থেকে মুক্তির পর জয়প্রকাশ নারায়ণও স্পষ্ট করেন যে লক্ষ্য একটাই—সমস্ত গণতান্ত্রিক বিরোধী শক্তিকে একত্রিত করা।

হিন্দুস্থান সমাচার / সৌমি বৈদ্য




 

 rajesh pande