
দুর্গাপুর, ২৭ জুন (হি.স.) : দেশের দ্রুতগতির বন্দে ভারত এক্সপ্রেস-এর জন্য বিশেষ ইস্পাত তৈরির সাফল্যের পর এবার ভারতের প্রতিরক্ষা শক্তিকেও আরও মজবুত করার ইতিহাস গড়ল রাষ্ট্রায়ত্ত ইস্পাত সংস্থা সেইল। ভারতীয় নৌবাহিনীর তিনটি অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজ নির্মাণে ব্যবহৃত বিশেষ প্রতিরক্ষা-মানের ইস্পাত সরবরাহ করে দেশের কৌশলগত আত্মনির্ভরতার পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল মহারত্ন সংস্থাটি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু একটি শিল্প-সাফল্য নয়, বরং দেশের প্রতিরক্ষা উৎপাদনে স্বনির্ভরতার লক্ষ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।গত ২১ জুন কলকাতার শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বন্দরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ভারতীয় নৌবাহিনীতে তিনটি অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজ—স্টিলথ ফ্রিগেট আইএনএস দোনাগিরি, অগভীর জলে সাবমেরিন-বিধ্বংসী অভিযানের উপযোগী যুদ্ধজাহাজ আইএনএস অগ্রয় এবং সমুদ্রগর্ভ জরিপকারী বৃহৎ জাহাজ আইএনএস সংশোধক—আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করেন। এই তিনটি রণতরী নির্মাণে ব্যবহৃত হয়েছে সেইলের উৎপাদিত বিশেষ প্রতিরক্ষা-গ্রেডের ইস্পাত।সেইল সূত্রে জানা গিয়েছে, সংস্থার সরবরাহ করা ইস্পাতের মধ্যে রয়েছে অত্যাধুনিক ডিএমআর-২৪৯এ গ্রেডের হট-রোল্ড শিট ও প্লেট। প্রতিরক্ষা খাতের কঠোর আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে এই বিশেষ ইস্পাত তৈরি করা হয়েছে বোকারো, ভিলাই এবং রাউরকেলা ইস্পাত কারখানায়। প্রায় ৫ হাজার ৭০০ টন বিশেষ ইস্পাত সরবরাহের মাধ্যমে ভারতীয় নৌবাহিনীর আধুনিকীকরণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখল সেইল।এই সাফল্য অবশ্য হঠাৎ করে আসেনি। বহু দশক ধরেই দেশের প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে বিশেষ ইস্পাত উৎপাদনের অন্যতম নির্ভরযোগ্য সংস্থা সেইল। বিশেষ করে দুর্গাপুরের অ্যালয় স্টিল প্ল্যান্ট (এএসপি) দেশের কৌশলগত প্রতিরক্ষা উৎপাদনে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এশিয়ার অন্যতম বিশেষ ইস্পাত উৎপাদনকারী এই কারখানায় এখনও পর্যন্ত শতাধিক ধরনের উচ্চমানের বিশেষ ইস্পাত উৎপাদিত হয়েছে।এর আগে অগ্নি ক্ষেপণাস্ত্রের বিভিন্ন উপাদান, বোফর্স কামানের গোলার বিশেষ স্টিল, সেনাবাহিনীর বুলেটপ্রুফ সুরক্ষা ব্যবস্থা, প্রতিরক্ষা দফতরের জন্য স্পেড জ্যাকেট, কার্গিল যুদ্ধের সময় ব্যবহৃত আর্মাড যানবাহনের বুলেটপ্রুফ শিল্ডিং এবং দেশীয় বিমানবাহী রণতরী আইএনএস বিক্রান্ত-এর জন্যও বিশেষ ইস্পাত সরবরাহ করেছে দুর্গাপুর অ্যালয় স্টিল প্ল্যান্ট। সেই ধারাবাহিকতারই সাম্প্রতিক সংযোজন ভারতীয় নৌবাহিনীর এই তিন যুদ্ধজাহাজ।কেবল প্রতিরক্ষা নয়, দেশের রেল শিল্পেও আত্মনির্ভরতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে সেইল। সম্প্রতি দুর্গাপুর অ্যালয় স্টিল প্ল্যান্ট থেকেই বন্দে ভারত এক্সপ্রেস-এর চাকা ও এক্সেল তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ইএ-ওয়ানএন গ্রেডের বিশেষ ইস্পাত সরবরাহ করা হয়। প্রথম পর্যায়ে বেঙ্গালুরুর বন্দে ভারত ট্রেনের চাকা নির্মাণ কারখানায় ৩৩ টন বিশেষ স্টিল পাঠানো হয়েছিল। সেই সাফল্যের পর এবার প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রেও আরও এক নতুন অধ্যায় রচনা করল সংস্থাটি।প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে সেইল ইতিমধ্যেই তাদের প্লেট উৎপাদন কেন্দ্রগুলিতে ডিএমআর গ্রেডের ইস্পাত উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে। বিশেষ করে রাউরকেলা স্টিল প্ল্যান্টের স্পেশাল প্লেট প্ল্যান্টে এই উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। সংস্থার দাবি, এর ফলে প্রতিরক্ষা-গ্রেডের ইস্পাতের ক্ষেত্রে বিদেশের উপর নির্ভরতা অনেকটাই কমেছে এবং ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ ও ‘আত্মনির্ভর ভারত’ কর্মসূচি আরও শক্তিশালী হয়েছে।এই প্রথম নয়, এর আগেও সেইলের বিশেষ ইস্পাত ব্যবহার করা হয়েছে দেশীয় বিমানবাহী রণতরী আইএনএস বিক্রান্ত, প্রজেক্ট-১৭এ-র স্টিলথ ফ্রিগেট আইএনএস নীলগিরি, আইএনএস হিমগিরি, আইএনএস উদয়গিরি, পাশাপাশি আইএনএস অজয়, আইএনএস নিস্তার এবং আইএনএস অঞ্জদীপ-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌযান নির্মাণে। ফলে ভারতের সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে সেইলের সম্পর্ক এখন আরও গভীর ও কৌশলগত।উল্লেখ্য, কয়েক বছর আগে ‘আজাদি কা অমৃত মহোৎসব’ উপলক্ষে দুর্গাপুর ইস্পাত কারখানা পরিদর্শনে এসে তৎকালীন কেন্দ্রীয় ইস্পাতমন্ত্রী রামচন্দ্র প্রসাদ সিং দেশের ইস্পাত শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন, দেশে বছরে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন টন ইস্পাত উৎপাদিত হয়, যার একটি বড় অংশ রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলির অবদান। তাঁর লক্ষ্য ছিল, ভবিষ্যতে একাই সেইল ৫০ মিলিয়ন টন ইস্পাত উৎপাদন করবে। একই সঙ্গে তিনি হাইড্রোজেন-ভিত্তিক সবুজ শক্তি, ইলেক্ট্রোলাইসিস প্রযুক্তি এবং ভবিষ্যতের ইস্পাত শিল্পে পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থার কথাও তুলে ধরেছিলেন।সেইলের চেয়ারম্যান তথা সিএমডি ড. অশোক কুমার পান্ডা বলেন, “ভারতের প্রতিরক্ষা খাতের অন্যতম প্রধান অংশীদার হিসেবে জাতীয় আত্মনির্ভরতার প্রতি সেইল সম্পূর্ণভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। প্রতিরক্ষা খাতের ক্রমবর্ধমান চাহিদার কথা মাথায় রেখে আমরা ডিএমআর গ্রেডের ইস্পাত উৎপাদন আরও বৃদ্ধি করেছি। উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ডিএমআর-২৪৯এ স্টিল প্লেট সরবরাহের মাধ্যমে শুধু ভারতের কৌশলগত স্বাধীনতাই আরও শক্তিশালী হচ্ছে না, সেইলের প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও গবেষণার সক্ষমতাও আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছেছে।”শিল্প বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্দে ভারত থেকে যুদ্ধজাহাজ—দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও প্রতিরক্ষা প্রকল্পে দেশীয় প্রযুক্তিনির্ভর বিশেষ ইস্পাত উৎপাদনের মাধ্যমে সেইল আজ শুধু একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ইস্পাত সংস্থা নয়, বরং আত্মনির্ভর ভারতের শিল্প ও প্রতিরক্ষা শক্তির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
হিন্দুস্থান সমাচার / জয়দেব লাহা