
‘বাজেটে অসমের জ্বলন্ত সমস্যাগুলি সমাধানের কোনও স্পষ্ট দিশা নেই’
- শুধু ভাষার চাকচিক্য, এটি কোনও উন্নয়নের বাজেট নয় : রিপুন বরা
গুয়াহাটি, ১০ জুলাই (হি.স.) : আজ শুক্রবার রাজ্য বিধানসভায় অর্থমন্ত্রী জয়ন্তমল্ল বরুয়ার পেশকৃত হিমন্তবিশ্ব শর্মা নেতৃত্বাধীন সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেটকে ‘পরনির্ভরশীল বাজেট’, ‘একটি রচনা’ বলে কটাক্ষ করেছে অসম প্রদেশ কংগ্রেস কমিটি। দলের অভিযোগ, বাজেটে কিছু আকর্ষণীয় শব্দ ব্যবহার করা ছাড়া মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব, বন্যা ও ভূমিক্ষয়ের মতো রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলির সমাধানের কোনও সুস্পষ্ট পরিকল্পনা নেই।
রাজীব ভবনে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে রাজ্যসভার প্রাক্তন সাংসদ রিপুন বরা বলেন, আজকের বাজেট একটি ‘পরনির্ভরশীল বাজেট’। তাঁর দাবি, ‘এই বাজেটে অসম সরকারের নিজস্ব কিছু নেই। মোট বাজেটের প্রায় ৭০ শতাংশ অর্থই রাজ্য সরকারের নিজস্ব নয়। আগের বছরগুলির মতো এবারও কেন্দ্রের অর্থের ওপর নির্ভর করতে হবে।’
রিপুন বরার অভিযোগ, বাজেটে উন্নয়নমূলক কাজে ব্যয়ের অংশ অত্যন্ত সীমিত। তিনি একে ‘ভোট কেনার বাজেট’ বলেও মন্তব্য করেন। বলেন, এই বাজেট অসমের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারবে না।
কংগ্ৰেস নেতা বলেন, বাজেটে মূলত অরুণোদয় এবং অন্যান্য জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। কর্মচারীদের বেতন, সরকারি বাধ্যতামূলক খরচ মেটানোর পর বাজেটের বড় অংশ সুবিধাভোগীদের মধ্যে বিতরণের পরিকল্পনা করা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেছেন।
রিপুন বলেন, মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব, বন্যা ও নদীভাঙন রোধের মতো সমস্যাগুলির বিষয়ে বাজেটে বিশেষ কোনও উল্লেখ নেই। নির্বাচনের আগে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতিগুলিরও কোনও প্রতিফলন বাজেটে দেখা যায়নি বলে তিনি দাবি করেন।
বাজেটকে অর্থমন্ত্রী ‘অষ্টাদশ মুক্তার উন্নয়নী মালা’ নাম দেওয়াকে কটাক্ষ করে রিপুন বরা বলেন, ‘শুধু সুন্দর নাম দিলেই বা রচনা লিখলেই মিথ্যায় ভরা বাজেট ভালো বাজেটে পরিণত হয় না।’
তিনি আরও বলেন, ‘হিমন্তবিশ্ব শর্মা সরকার প্রথম মেয়াদে প্রতি বছর এক লক্ষ চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু পাঁচ বছরেও এক লক্ষ বেকারকে সম্পূর্ণভাবে চাকরি দিতে পারেনি। এখন আবার আট মাসে দুই লক্ষ চাকরি দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে, যা শুধুই আরেকটি মিথ্যা প্রতিশ্রুতি।’
রিপুন বরার দাবি, গত পাঁচ বছরে এডিআরই-র মাধ্যমে ৯৭ হাজার নিয়োগের কথা বলা হলেও অনেক প্রার্থী একাধিক বিভাগের চাকরির জন্য যোগ্য হওয়ায় একই ব্যক্তিকে একাধিক হিসাবের মধ্যে দেখানো হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘চকচকে কথার মোড়কে বাজেটকে এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যেন এটি চিনির প্রলেপ দেওয়া ক্ষতিকর মিষ্টির মতো।’
অসমের বিভিন্ন গ্রামে মানুষের দুর্ভোগ, গুয়াহাটিতে সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা, বন্যা ও নদীভাঙনে মানুষের ঘরবাড়ি ভেসে যাওয়ার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, এ সব সমস্যার সমাধান ছাড়া ‘সর্বাঙ্গীণ উন্নয়ন’ বা ‘কল্যাণমুখী যাত্রা’-র মতো শব্দ শুধুই বক্তৃতায় ভালো শোনায়।
বিদ্যুৎ ক্ষেত্রেও সরকারকে আক্রমণ করেছেন তিনি। বলেন, ঘন ঘন লোডশেডিং এবং বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির পর কীভাবে অসম শক্তিক্ষেত্রে আত্মনির্ভর হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়।
স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ক্ষেত্র নিয়ে সরকারকে নিশানা করে রিপুন বরা বলেন, গুয়াহাটি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মতো প্রতিষ্ঠানে ভুল চিকিৎসা ও নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনা সংঘটিত হওয়ার পর স্বাস্থ্যক্ষেত্রে অগ্রগতির দাবি মানুষ বিশ্বাস করবে না। একইভাবে স্কুল বন্ধ হওয়া, ড্রপআউট বৃদ্ধি এবং প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষকের পদ খালি থাকার পর উন্নত শিক্ষার কথা বলাও হাস্যকর।
বিনিয়োগ প্রসঙ্গে তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘সেমিকন্ডাক্টর প্রকল্প ছাড়া গত পাঁচ বছরে অসমে কারা বিনিয়োগ করেছে?’ আদানি ও আম্বানিকে নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর সাম্প্রতিক মন্তব্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘যদি তাঁরা না আসেন, তা-হলে জমি কেন দেওয়া হচ্ছে? চিড়িয়াখানার প্রাণী কেন আম্বানিকে দেওয়া হচ্ছে?’
বাজেটে ঋণের পরিমাণ এবং ঋণ পরিশোধের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ না করাকেও তিনি রহস্যজনক বলে মন্তব্য করেন। তাঁর অভিযোগ, বাজেটে সব কিছু পরিকল্পিত দেখানো হলেও সরকারকে প্রতি মাসে ঋণ নিতে হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ক্যাগ-এর প্রতিবেদনে গত পাঁচ বছরের বাজেট ব্যবস্থাপনার ত্রুটি স্পষ্ট হয়েছে। তাঁর দাবি, এবারের বাজেটও একটি ‘ভুয়ো বাজেট।
সাংবাদিক সম্মেলনে বিধানসভার বিরোধী উপনেতা জয়প্রকাশ দাস বলেন, ‘বাজেটটি বাইরে থেকে চকচকে, কিন্তু ভিতরে ফাঁপা।’ তিনি প্রশ্ন তুলেন, সরকার বিদেশি ভাষা শেখানোর কথা বললেও বড়ো, কার্বি, মিশিং-এর মতো স্থানীয় ভাষার উন্নয়নে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা বাজেটে উল্লেখ করা হয়নি কেন?
প্রাক্তন মন্ত্রী নীলমণি সেন ডেকা অভিযোগ করেন, বিজেপি সরকার বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে শুধু সুবিধাভোগী তৈরি করতে ব্যস্ত, পাশাপাশি মদ্যপানের প্রবণতা বৃদ্ধির পথও প্রশস্ত করছে।
তিনি বিজেপি সরকারকে ‘দাবি ও হুমকির সরকার’ বলে আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘বিজেপি সরকারের আমলে অসমের অর্থনীতি অ-অসমিয়াদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।’
প্রাক্তন মন্ত্রীর দাবি, এই সরকারের বাজেট থেকে সাধারণ মানুষ আশা ছাড়া আর কিছুই পাবে না। তিনি এবারের বাজেটকে অসমের ইতিহাসের ‘সবচেয়ে খারাপ বাজেট’ বলেও মন্তব্য করেন।
উল্লেখ্য, আজকের সাংবাদিক সম্মেলন পরিচালনা করেন প্রাক্তন সাংসদ ও প্রদেশ কংগ্রেসের মিডিয়া বিভাগের উপদেষ্টা আব্দুল খালেক।
হিন্দুস্থান সমাচার / সমীপ কুমার দাস