
- চাকরি থেকে বরখাস্ত হবেন বহুবিবাহের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত সরকারি কর্মচারী
গুয়াহাটি, ১০ জুলাই (হি.স.) : আজ শুক্রবার অসম বিধানসভায় ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের পূর্ণাঙ্গ বাজেট পেশ করে রাজ্যের অর্থমন্ত্রী জয়ন্তমল্ল বরুয়া আগামী পাঁচ বছরের উন্নয়নের রূপরেখা তুলে ধরেছেন। পরিকাঠামো উন্নয়ন, জনকল্যাণ, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও আর্থিক স্বনির্ভরতাকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রণীত এবারের বাজেটে উন্নয়নের জন্য ১০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দের ঘোষণা করা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী জানান, পরিকাঠামো উন্নয়নে ১০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে উচ্চাভিলাষী গুয়াহাটি রিং রোড প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে ৪,৯৫৪ কোটি টাকা।
জনকল্যাণমূলক বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে ৬ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবর্ষে ৩৫ হাজারেরও বেশি মহিলাকে বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ‘দিব্যাঙ্গ বাহন প্রকল্প’-এর মাধ্যমে ৩ লক্ষ ৭৫ হাজার প্রতিবন্ধীদের সুবিধা প্রদানের পরিকল্পনাও ঘোষণা করা হয়েছে।
চা-বাগান এলাকায় বসবাসকারী অন্তঃসত্ত্বা মহিলাদের জন্য ১৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। পাশাপাশি উচ্চশিক্ষায় অধ্যয়নরত ৪৮ হাজার ৩৬৬ জন স্নাতক শিক্ষার্থীকে মাসিক ২,৫০০ টাকা আর্থিক সহায়তা প্রদান অব্যাহত থাকবে।
কৃষি খাতে মুখ্যমন্ত্রীর কৃষি সরঞ্জাম প্রকল্প চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা করেছেন অৰ্থমন্ত্ৰী। এই প্রকল্পের অধীনে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের ১১ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। এছাড়া ন্যূনতম সহায়ক মূল্য (এমএসপি)-এর অতিরিক্ত প্রতি কুইন্টাল ধান ও গমের জন্য ২০০ টাকা এবং সরিষার জন্য অতিরিক্ত ৩০০ টাকা প্রণোদনা দেওয়া হবে।
আগামী আগস্ট মাস থেকে রাজ্যের ৬২১ জন উদাসীন ভকতকে (বৈষ্ণব) প্রতি মাসে ১,৫০০ টাকা করে সাম্মানিক দেওয়া হবে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী জানান, ‘মুখ্যমন্ত্রী নিযুত মইনা প্রকল্প’-এর আবেদন আগামী আগস্ট মাসে শুরু হবে এবং অক্টোবর থেকে উপভোক্তাদের আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হবে। চলতি বছরে এই প্রকল্পের আওতায় ৫.৩ লক্ষেরও বেশি শিক্ষার্থী উপকৃত হবেন বলে আশা করছে সরকার।
তিনি জানান, ‘অরুণোদয় প্রকল্প’ রাজ্যের সর্ববৃহৎ প্রত্যক্ষ আর্থিক সহায়তা কর্মসূচি হিসেবে অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে ‘জীবন প্রেরণা প্রকল্প’-এর সুবিধাও চালু থাকবে।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে আগামী পাঁচ বছরে দুই লক্ষের বেশি সরকারি চাকরি দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই উদ্দেশ্যে ইতিমধ্যে একটি বিশেষ টাস্ক ফোর্স গঠন করা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আরও ঘোষণা করেন, কোনও সরকারি কর্মচারী বহুবিবাহের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হবে।
রাজ্যের অর্থনৈতিক অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরে জয়ন্তমল্ল বরুয়া বলেন, অসমে মাথাপিছু আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লক্ষ ৮৫ হাজার ৪২৯ টাকা। পাশাপাশি সরকারের লক্ষ্য, রাজ্যের নিজস্ব রাজস্ব আয়ের অংশ আগামী দিনে মোট রাজস্ব প্রাপ্তির ৫০ শতাংশে উন্নীত করা। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে মূলধনী ব্যয় বেড়ে ২৬ হাজার ৫৩১ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা দীর্ঘমেয়াদি পরিকাঠামো-নির্ভর উন্নয়নের প্রতি সরকারের অঙ্গীকারের প্রতিফলন।
এক দশকে তিনগুণ বাজেট, শক্তিশালী হয়েছে অসমের অর্থনীতি। বাজেটে বলা হয়েছে, গত এক দশকে অসমের আর্থিক ও অর্থনৈতিক অবস্থায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। ২০১৫-১৬ সালের তুলনায় ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে রাজ্যের বাজেটের আকার প্রায় তিনগুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লক্ষ ৭৮২ কোটি টাকায়।
বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য সাফল্য এসেছে। বাজেট ব্যবহারের হার ৫৮ শতাংশ থেকে বেড়ে রেকর্ড ৮৫ শতাংশে পৌঁছেছে, যা সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা ও সরকারি অর্থের কার্যকর ব্যবহারের পরিচয় বহন করে।
রাজ্যের নিজস্ব কর রাজস্ব ২০১৫-১৬ সালে ১২ হাজার ৮৪৮ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২০২৫-২৬ সালে ৩৯ হাজার ২৯৪ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। কর আদায়ে স্বচ্ছতা, প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ফলে এই বৃদ্ধি সম্ভব হয়েছে। বর্তমানে মোট রাজস্ব প্রাপ্তির ৩৬ শতাংশই নিজস্ব উৎস থেকে আসে। ২০৩১ সালের মধ্যে তা ৫০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, মূলধনী ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৫-১৬ সালে যেখানে মূলধনী ব্যয় ছিল মাত্র ২ হাজার ৯৫১ কোটি টাকা, সেখানে ২০২৫-২৬ সালে তা বেড়ে ২৬ হাজার ৫৩১ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। আগামী দিনেও প্রতি বছর অন্তত ১০ শতাংশ হারে মূলধনী ব্যয় বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
অসমের আর্থিক সুশাসনের স্বীকৃতি দিয়েছে ষোড়শ অর্থ কমিশন। কমিশন রাজ্যের অংশীদারিত্ব ৩.১২৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩.২৫৮ শতাংশ করেছে। এর ফলে চলতি অর্থবর্ষে কেন্দ্রীয় কর বণ্টনের মাধ্যমে অসম প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিদেশি সহায়তাপ্রাপ্ত প্রকল্পের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। চতুর্দশ অর্থ কমিশনের সময় যেখানে প্রায় ৭,৫০০ কোটি টাকার নয়টি প্রকল্প ছিল, সেখানে পঞ্চদশ অর্থ কমিশনের সময় তা বেড়ে প্রায় ৫৩ হাজার কোটি টাকার ২১টি প্রকল্পে উন্নীত হয়েছে। প্রকল্পগুলিতে মোট অর্থ ছাড়ের পরিমাণ ৩,৭৪৮ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১৪ হাজার ৪০০ কোটির বেশি হয়েছে। বর্তমানে বছরে ৬ হাজার কোটিরও বেশি টাকা ব্যয় হচ্ছে এ-সব প্রকল্পে।
উন্নয়ন ব্যয় বৃদ্ধি সত্ত্বেও রাজ্য আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে রাজ্যের ঋণ-জিএসডিপি অনুপাত ২৪.৮১ শতাংশ, যা এফআরবিএম আইনে নির্ধারিত ৩২ শতাংশ সীমার অনেক নীচে। ফলে আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা রাজ্যগুলির মধ্যে অসম অন্যতম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
ব্যাংকিং ক্ষেত্রেও ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। ২০১৬ সালের মার্চ মাসে যেখানে রাজ্যের ক্রেডিট-ডিপোজিট অনুপাত ছিল ৪১.১০ শতাংশ, তা ২০২৬ সালের মার্চে বেড়ে ৭৩.৫২ শতাংশে পৌঁছেছে। এর ফলে অসমে সংগৃহীত আমানতের বড় অংশ এখন রাজ্যের উৎপাদনশীল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিনিয়োগ হচ্ছে।
বাজেট নথিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, গত এক দশকে রাজ্যের মাথাপিছু আয় তিনগুণেরও বেশি বেড়েছে। ২০১৫-১৬ অর্থবর্ষে মাথাপিছু আয় ছিল ৬০ হাজার ৮১৭ টাকা, যা ২০২৫-২৬ সালে বেড়ে ১ লক্ষ ৮৫ হাজার ৪২৯ টাকায় পৌঁছেছে। সরকারের দাবি, এর মাধ্যমে অসমের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরও বিস্তৃত, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং টেকসই ভিত্তি লাভ করেছে।
হিন্দুস্থান সমাচার / সমীপ কুমার দাস