
শিবগঙ্গা, ১১ জুলাই (হি.স.) : তামিলনাড়ুর শিবগঙ্গা জেলায় ত্রয়োদশ শতাব্দীর একটি গুরুত্বপূর্ণ শিলালিপির সন্ধান পেয়েছেন গবেষকরা। তিরুপ্পত্তুরের কাছে কারাইয়ুর পুদুভলভু গ্রামের ভান্নিক্কণ্মাই জলাশয়ের তীরে উদ্ধার হওয়া এই শিলালিপি থেকে এলাকার ধর্মীয়, সামাজিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব সম্পর্কে একাধিক নতুন তথ্য সামনে এসেছে। গবেষকদের মতে, শিলালিপিতে এক বৈষ্ণব আচার্যের উল্লেখ রয়েছে, যিনি মানুষকে বেদের আদর্শ অনুসরণ করতে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন।
কারাইয়ুর পুদুভলভু গ্রামের ছাত্র সুরেশ প্রথম শিলালিপিটির খবর গবেষকদের জানান। পরে শিবগঙ্গা প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা কে. কালীরাসা, সম্পাদক ইরা. নরসিম্মান এবং কারাইকুড়ি আলগাপ্পা সরকারি আর্টস কলেজের ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ভেলায়ুধরাজা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
গবেষকদের বক্তব্য, প্রায় দু'ফুট দীর্ঘ শিলালিপিটিতে সাতটি পংক্তি উৎকীর্ণ রয়েছে। শেষ অংশে একটি পূর্ণকুম্ভ এবং তার দু'পাশে ঐতিহ্যবাহী কুথু প্রদীপের চিত্র খোদাই করা হয়েছে। লিপি ও শৈলীর ভিত্তিতে এর সময়কাল ত্রয়োদশ শতাব্দী বলে মনে করা হচ্ছে।
শিলালিপিতে উৎকীর্ণ “স্বস্তিশ্রী ভণ্ণক্ক নল্লুর মেভিক্ কুলম সিয়র বেদ নেরি কাট্টিনান সিয়র রক্ষৈ” লেখাটি থেকে জানা যায়, ভণ্ণক্ক নল্লুর গ্রামের এক বৈষ্ণব আচার্য (সিয়র) স্থানীয় মানুষকে বেদের পথ অনুসরণ করতে শিক্ষা দিয়েছিলেন এবং তাঁদের আধ্যাত্মিক কল্যাণে কাজ করেছিলেন।
শনিবার গবেষকরা দাবি করেন , কারাইয়ুরের অলগিয়া মণবাল পেরুমাল মন্দিরে প্রথম মারাভর্মন সুন্দরপাণ্ড্য ও সদয়বর্মন সুন্দরপাণ্ড্যের আমলের শিলালিপিতেও ভণ্ণক্ক নল্লুর গ্রামের উল্লেখ রয়েছে। সেখানে ‘ভণ্ণক্ক নল্লুর দূতন আণ্ডপিল্লাই’-এর স্বাক্ষরও পাওয়া গেছে, যা এই অঞ্চলের ঐতিহাসিক গুরুত্বের প্রমাণ বহন করে।
শিলালিপি থেকে আরও জানা যায়, কারাইয়ুরের অলগিয়া মণবাল পেরুমাল মন্দিরের নম্বিমারদের (মন্দির সেবক) জন্য কারাইয়ুর, মনক্কুড়ি, ভণ্ণক্ক নল্লুর, থোট্টুর, উগালুর ও পনাইভয়াল গ্রামে করমুক্ত ধর্মীয় দানভূমি বা ‘তিরুভিডাইয়াট্টম’ বরাদ্দ ছিল। এর মাধ্যমে সেই সময়কার মন্দিরের অর্থনৈতিক কাঠামো ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতার চিত্রও স্পষ্ট হয়।
গবেষকদের মতে, জলাশয়ের পাশের অয়্যনার মন্দিরটি আজও ‘ভান্নিকুন্নি অয়্যনার মন্দির’ নামে পরিচিত এবং জলাশয়টি ‘ভান্নিক্কণ্মাই’ নামে পরিচিত। এই নামগুলির সঙ্গে শিলালিপির তথ্য মিলিয়ে তাঁদের ধারণা, প্রাচীনকালে গোটা অঞ্চলই ‘ভণ্ণক্ক নল্লুর’ নামে পরিচিত ছিল।
সমীক্ষার সময় অয়্যনার মন্দিরের প্রাচীন মূর্তিটিও গবেষকদের বিশেষ আকর্ষণ কেড়েছে। সাধারণত গ্রামরক্ষক দেবতা অয়্যনারকে তাঁর দুই পত্নী পূর্ণা ও পুষ্পকলার সঙ্গে দেখা যায়। কিন্তু এই মন্দিরে তাঁকে এককভাবে উৎকুটি আসনে (বসা অবস্থায়) প্রতিষ্ঠিত অবস্থায় দেখা গেছে, যা এই প্রতিমার বিশেষ বৈশিষ্ট্য।
মূর্তিতে মাথায় জটাজুট, কপালে অলংকার, বুকে সন্নবীরম, কানে মকরকুণ্ডল, কোমরে উদরবন্ধ, ডান হাতে অস্ত্র এবং বাঁ হাতে দণ্ডহস্ত মুদ্রা দেখা যায়। পাশে দুটি হাতির প্রতিকৃতিও খোদাই রয়েছে। শিল্পরীতি বিচার করে গবেষকদের ধারণা, প্রতিমাটিও দ্বাদশ বা ত্রয়োদশ শতাব্দীর।
গবেষকদের মতে, এই আবিষ্কার শুধু শিবগঙ্গা জেলার প্রাচীন ইতিহাসই নয়, মধ্যযুগীয় তামিল সমাজ, বৈষ্ণব ঐতিহ্য, মন্দির ব্যবস্থা এবং গ্রামীণ প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্যপ্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হবে।
---------------
হিন্দুস্থান সমাচার / সৌমি বৈদ্য