
দুর্গাপুর, ১৩ জুলাই (হি.স.) : বিলগ্নীকরণ থেকে পিছু হটল কেন্দ্র। এবার ইস্পাত উৎপাদনে লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে দুর্গাপুরের দুই রাষ্ট্রায়ত্ত ইস্পাত কারখানা অ্যালয় স্টিল (এএসপি) ও দুর্গাপুর স্টিল (ডিএসপি) সংযুক্তিকরণ করার উদ্যোগী হল কেন্দ্র সরকার। এমনকি বেসরকারি ও সেকেন্ডারি ইস্পাত কারখানার ওপর আস্থা রাখল কেন্দ্র সরকার। সোমবার দুর্গাপুরে কেন্দ্রীয় ইস্পাত মন্ত্রকের কোর কমিটির মিটিংয়ে এসে এমনটাই জানাল কেন্দ্রীয় ইস্পাতমন্ত্রী এইচ ডি কুমারস্বামী।
প্রসঙ্গতঃ, আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে ৩০০ মিলিয়ন টন ইস্পাত উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে কেন্দ্র সরকার। আর এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণে জোর তৎপরতা শুরু করেছে ভারী শিল্প ও ইস্পাত মন্ত্রক। তার জন্য দেশের বিভিন্ন ইস্পাত কারখানাগুলিকে আধুনিকীকরণ করার উদ্যোগ নিয়েছে। ইতিমধ্যে পশ্চিমবঙ্গের বার্নপুরে সেল এর ইস্কো কারখানার আধুনিকীকরণ কাজ চলছে। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে ক্রমাগত লোকসানের জেরে নীতি আয়োগের পরামর্শে ইস্পাত মন্ত্রক দুর্গাপুরে অ্যালয় স্টিল কারখানা বিলগ্নীকরণের সিদ্ধান্ত নেয়। ২০১৬ অক্টোবরে বিলগ্নীকরণের জন্য নীতিগত অনুমোদন দেয় কেন্দ্র। ১৯৫৬ সালের জানুয়ারিতে কানাডিয়ান প্রযুক্তি ও জাপানের যন্ত্রাংশ সহায়তায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল দুর্গাপুর অ্যালয় স্টিল কারখানা। ২০১৮ ফেব্রুয়ারিতে ক্রেতাদের আগ্রহ প্রকাশের জন্য একটি বিশ্বব্যাপী দরপত্রও জারি করা হয়। যদিও সেই সময় ক্রেতাদের কাছ থেকে আশানুরূপ কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে এএসপি কারখানার বিলগ্নীকরণের প্রতিবাদে সরব হয়ে লাগাতার আন্দোলন চালায় কারখানার একাধিক শ্রমিক সংগঠন। যদিও পরবর্তীকালে দুর্গাপুর অ্যালয় স্টিল বিলগ্নীকরণের প্রক্রিয়া আপাতত স্থগিত রাখে ইস্পাত মন্ত্রক। উল্লেখ্য, আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে ৩০০ মিলিয়ন টন ইস্পাত উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে কেন্দ্র সরকারের। যার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে দেশের পাবলিক সেক্টরগুলির। পাবলিক সেক্টরগুলির জমি, মেধা দক্ষতা রয়েছে। বার্নপুর ইস্কোর সম্প্রসারণ কাজ শুরু হলেও, লাল ফিতের ফাঁসে আটকে পড়ে দুর্গাপুরের দুই গুরুত্বপূর্ণ ইস্পাত কারখানার সম্প্রসারণ। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে রাজ্য সরকারের পালা বদল ঘটছে। এককথায় কেন্দ্র ও রাজ্য মিলিয়ে ডবল ইঞ্জিন সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ইতিমধ্যে দুর্গাপুর অ্যালয় স্টিল কারখানার একের পর এক ইস্পাত উৎপাদনে নজির গড়েছে।
২০২৩ সালে দেশে সেমি হাইস্পিড ইএমইউ 'ট্রেন ১৮' বন্দে ভারত ট্রেন চালু হয় ভারতে। ওই ট্রেনের এক্সেল তৈরির বিশেষ ইস্পাতের বরাত পায় সেলের দুর্গাপুর অ্যালয় স্টিল। যদিও প্রথমে এই বিশেষ ইস্পাতের বরাত পেয়েছিল ইউক্রেন। কিন্তু, রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে বিধ্বস্ত ইউক্রেন। আর তার জেরে বন্দে ভারত ট্রেনের এক্সেল তৈরির গুরুত্বপূর্ণ বিশেষ ইস্পাতে সরবরাহের বরাত পায় দুর্গাপুর অ্যালয় স্টিল।
দেশের গুরুত্বপূর্ণ বিশেষ ধরনের ইস্পাত তৈরিতে খ্যাতি ও নজির রয়েছে দুর্গাপুর অ্যালয় স্টিলের। মূলত, প্রতিরক্ষা দপ্তরের সামগ্রী তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে দুর্গাপুর অ্যালয় স্টিল কারখানা। এশিয়ার একমাত্র কারখানা যেখানে রঙিন ইস্পাত তৈরি হয়। তাছাড়াও অগ্নি ক্ষেপণাস্ত্রের চাদর তৈরির জন্য বরাত পেয়েছিল। অতীতে বোফর্স কামানের গোলার চাদর তৈরি করে নজির গড়েছিল। তাছাড়াও প্রতিরক্ষা দপ্তরের ৪০০ টন স্পেড জ্যাকেল তৈরি করেছে। বিক্রান্ত এয়ারক্রাফটের ক্যারিয়ার তৈরির স্টিল তৈরি করেছে এই কারখানা। কারগিল যুদ্ধের সময় আর্মাড গাড়ির বুলেট প্রুফ শিল্ডিং হয়েছিল অ্যালয় স্টিল কারখানার স্টিলে। এখনও পর্যন্ত শতাধিক ধরনের প্রোডাক্ট উৎপাদন করেছে অ্যালয় স্টিল। তারপর বন্দে ভারতের মতো গুরুত্বপূর্ণ ট্রেনের এক্সেলের ইস্পাত তৈরি জন্য নজির সৃষ্টি করেছে। জানা গেছে, সেল এর দুর্গাপুর ইস্পাত (ডিএসপি) ২.২ মিলিয়ন টন ইস্পাত উৎপাদনে ক্ষমতা রয়েছে। গত দেড় বছর ধরে ৬০-৭০ শতাংশ উৎপাদন হয়। এবং ইস্কোর ৭ মিলিয়ন টন ইস্পাত উৎপাদনের ক্ষমতা রয়েছে। সোমবার দুর্গাপুরে ডিএসপি কারখানা পরিদর্শনের পর দুর্গাপুর হাউসে কোর কমিটির বৈঠক করেন কেন্দ্রীয় ইস্পাত মন্ত্রী এইচ ডি কুমারস্বামী। এছাড়াও ছিলেন কেন্দ্রীয় ইস্পাত মন্ত্রী (রাষ্ট্র) ভূপতিরাজু শ্রীনিবাস বর্মা ও কোর কমিটির সদস্যগণ। এদিন সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ইস্পাতমন্ত্রী এইচডি কুমারস্বামী বলেন, অ্যালয় স্টিল ও দুর্গাপুর স্টিল সংযুক্তিকরণ করা হবে। ৪. ০৮ মিলিয়ন টন উৎপাদন ক্ষমতা করা হবে। আমরা চাইছি প্রধানমন্ত্রী এসে তার শিলান্যাস করবেন। ইস্কো 'র ৭ মিলিয়ন টন ক্যাপাসিটি রয়েছে। সেটা ৯ মিলিয়ন টনে নিয়ে যাওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, ইস্পাত উৎপাদনে প্রাইভেট ও সেকেন্ডারি ইস্পাত কারখানা গুলির ৪৫-৪৬ শতাংশ অবদান থাকবে। কয়েকদিন আগে দুর্গাপুর ইস্পাত কারখানায় এক ঠিকা শ্রমিকের মৃত্যুকে ঘিরে শোরগোল শুরু হয়েছে শ্রমিক সুরক্ষায়। এদিন সে প্রসঙ্গে ইস্পাতমন্ত্রী বলেন, এসব অনভিপ্রেত। শ্রমিকদের অধিকার যাতে সুরক্ষিত থাকে তার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এদিকে দুর্গাপুরে সেলের দুই কারখানার সংযুক্তিকরণের প্রস্তাবে উচ্ছ্বসিত শিল্পাঞ্চলের শ্রমিক মহল থেকে শিল্পশহরবাসী।
হিন্দুস্থান সমাচার / জয়দেব লাহা