
তেজপুর (অসম), ১৪ জুলাই (হি.স.) : সৃজনশীলতা ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে অসমীয়া ও নেপালি, দুই ভাষায় সমান দক্ষতায় সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে অসমে সম্প্রীতির ভিত সুদৃঢ়কারী বিশিষ্ট সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, দু-বারের সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত, পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত এবং সম্প্রতি অসম সরকারের 'সতী সাধনী' পুরস্কারপ্রাপ্ত গীতা উপাধ্যায়ের প্রয়াণে সমগ্র রাজ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
গতকাল সোমবার রাত ৯টা ১৫ মিনিটে বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় তাঁর মৃত্যু হয়। পরিবারের কয়েকজন সদস্য রাজ্যের বাইরে থাকায় তাঁদের মঙ্গলবার রাতে তেজপুরে পৌঁছানোর কথা। সেজন্য আগামীকাল বুধবার সকালে তেজপুরের পরোয়া শ্মশানে সম্পূর্ণ রাজ্য মর্যাদায় তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হবে।
এদিকে, তেজপুরের চাঁদমারির বাসভবনে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বিশেষ ব্যবস্থায় তাঁর মরদেহ রাখা হয়েছে। মঙ্গলবার সকাল থেকেই তেজপুরের বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও সাহিত্য সংগঠনের প্রতিনিধিদের পাশাপাশি জেলার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং রাজ্যের নানা প্রান্ত থেকে আগত অসংখ্য মানুষ পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানান।
শোণিতপুরের জেলাশাসক আনন্দকুমার দাসও প্রয়াতের বাসভবনে গিয়ে তাঁর মরদেহে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তিনি প্রয়াত গীতা উপাধ্যায়ের কনিষ্ঠ ভাই, প্রাক্তন সাংসদ স্বরূপ উপাধ্যায় এবং পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানিয়ে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে রাজ্য মর্যাদায় শেষকৃত্য সম্পন্ন করার সিদ্ধান্তের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানান।
এদিন বাণ থিয়েটারের উপ-সভাপতি ভবানন্দ দাস, সাধারণ সম্পাদক জিতুমণি দেবচৌধুরী, সম্পাদক পঙ্কজ বরুয়া, গ্রন্থাগারিক ভূপেন বরুয়া, কিশোর শর্মা, জিন্টু বরঠাকুর, অসমীয়া ক্লাবের সভাপতি পঙ্কজ কুমার বরুয়া, সম্পাদক ভূপেন শর্মা, প্রাক্তন সম্পাদক চিত্তদেব শর্মা, তেজপুর সাহিত্য সভার উপ-সভাপতি দ্বিজেন নাথ, সম্পাদক ড. পল্লব ভট্টাচার্য, শোণিতপুর জেলা সাহিত্য সভার প্রাক্তন সভাপতি ড. ভূপেন শইকিয়া, শিশু সাহিত্যিক দিলীপ কুমার বরুয়া, সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক চন্দ্রমণি উপাধ্যায়, জ্ঞান বাহাদুর ছেত্রী, তেজপুর জন সাংস্কৃতিক পরিষদের সভাপতি রাজু বরুয়া, বামপন্থী নেতা রুবুল শর্মা, বিজেপির প্রাক্তন মহিলা মোর্চা সভানেত্রী স্বপ্না বনিয়া, শোণিতপুর জেলা সমিতির প্রাক্তন সভানেত্রী দীপামণি শইকিয়া, অসম প্রদেশ বিজেপির কার্যনির্বাহী সদস্য অভিজিৎ কলিতা, অসম সাহিত্য সভার প্রাক্তন প্রধান সম্পাদক যাদবচন্দ্র শর্মা সহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
উল্লেখ্য, ১৯৩৯ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি বিহালির গাংমৌথানে জন্মগ্রহণ করেন গীতা উপাধ্যায়। পরে তিনি তেজপুরের চাঁদমারিতে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। ১৯৬৪ সালে গুয়াহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর শিবসাগর কলেজে অধ্যাপনা করেন এবং বিভাগীয় প্রধান হিসেবে অবসর গ্রহণের পর তেজপুরে বসবাস শুরু করেন।
২০১১ সালে তিনি শিবসাগর কলেজের 'সাহিত্য সুবাসিত' সম্মান লাভ করেন এবং ২০০৭ সালে অসম লেখিকা সংস্থার প্রবীণা শইকীয়া অনুবাদ পুরস্কার পান। ১৯৭০-এর দশকেই তিনি অ্যান ফ্রাঙ্কের ডায়েরি অসমীয়া ও নেপালি ভাষায় অনুবাদ করে বিশেষ কৃতিত্বের পরিচয় দেন।
২০১২ সালে রূপকোঁওর জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালার কালজয়ী নাটক ‘কারেঙর লিগিরী’-কে নেপালি ভাষায় ‘দরবার কে সুচারো’ নামে অনুবাদ করে সাহিত্য অকাদেমির অনুবাদ সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। পরে তাঁর পিতামহ তথা স্বাধীনতা সংগ্রামী ছবিলাল উপাধ্যায়ের জীবনাদর্শ অবলম্বনে রচিত উপন্যাস ‘জন্মভূমি মেরো স্বদেশ’-এর জন্য ২০১৬ সালে সাহিত্য অকাদেমির মূল পুরস্কার অর্জন করেন। ২০২৫ সালে পদ্মশ্রী সম্মান লাভ করে তিনি শোণিতপুর তথা সমগ্র অসমের গৌরব বৃদ্ধি করেন।
অবিবাহিত, স্বল্পভাষী ও মানবতাবাদী গীতা উপাধ্যায় ১৯৮৭ সালে নেপালি ভাষার রামায়ণ অসমীয়ায় অনুবাদ করেন। এটি প্রকাশ করে অসম সাহিত্য সভা। শিশু সাহিত্যিক হিসেবেও তিনি সমান দক্ষতার পরিচয় দিয়ে ‘মা, মই ফাৰ্স্ট হ’লোঁ’ শীর্ষক শিশুগ্রন্থ অসমীয়া ও নেপালি, উভয় ভাষায় প্রকাশ করেন।
তিনি একজন দক্ষ সংগঠক হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। সারা অসম লেখিকা সংস্থা, অসম নেপালি সাহিত্য পরিষদ এবং অসম গোর্খা পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
তাঁর উল্লেখযোগ্য প্রকাশিত গ্রন্থগুলির মধ্যে রয়েছে, ‘অ্যান ফ্রাঙ্কের ডায়েরি’, ‘সুবাসিত বাতাহ’ (গল্পসংকলন, ২০০৪), ‘ভূমিপুত্র’ (২০০৮), ‘চিলার দরে উরে মন’ (শিশুসাহিত্য), ‘মহাপুরুষ শঙ্করদেব’ (২০০৩), ‘রাজদরবারী সুসারে’ (নেপালি), ‘অ্যান ফ্রাঙ্কের বাল্যকাল’ (২০০৮), ‘মা মই ফার্স্ট হ’লোঁ’ (শিশুগ্রন্থ), ‘ক'লা সূরুজ’ (১৯৯৮), ‘মুনা মদন’ (১৯৯৮), ‘মোর আত্মকথা’ এবং ‘জনমভূমি মোর স্বদেশ’ (অসমীয়া ও নেপালি)।
এই খবর লেখা পর্যন্ত রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত অসংখ্য মানুষ এবং বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা প্রয়াত গীতা উপাধ্যায়ের বাসভবনে গিয়ে তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন।
হিন্দুস্থান সমাচার / সমীপ কুমার দাস