প্রেমের চূড়ায় প্রস্তাব, নীচে অপেক্ষায় হাতকড়া! এম্পায়ার স্টেটের মাথায় রুশ যুগলের দুঃসাহসিক প্রেমকাহিনি ঘিরে বিশ্বজুড়ে চর্চা
কলকাতা, ৩ জুলাই (হি.স.): প্রেম অধিকার করতে চায় না, সে মানুষকে মুক্তি দেয়।— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ট্রে বার্ডস গ্রন্থের এই বহুল উদ্ধৃত ভাবনা যেন নতুন করে বাস্তব হয়ে ধরা দিল নিউইয়র্কের আকাশছোঁয়া এক ঘটনায়। ভালোবাসার প্রকাশে মানুষ কতদূর যেতে পার
এম্পায়ার স্টেটের মাথায় রুশ যুগল


এম্পায়ার স্টেটের মাথায় রুশ যুগল


কলকাতা, ৩ জুলাই (হি.স.): প্রেম অধিকার করতে চায় না, সে মানুষকে মুক্তি দেয়।— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ট্রে বার্ডস গ্রন্থের এই বহুল উদ্ধৃত ভাবনা যেন নতুন করে বাস্তব হয়ে ধরা দিল নিউইয়র্কের আকাশছোঁয়া এক ঘটনায়। ভালোবাসার প্রকাশে মানুষ কতদূর যেতে পারে? কেউ লেখেন কবিতা, কেউ গান বাঁধেন, কেউ বা প্রিয় মানুষের সামনে হাঁটু গেড়ে আংটি বাড়িয়ে দেন। কিন্তু রাশিয়ার দুই ‘রুফটপার’ অ্যাঞ্জেলা নিকোলাউ (৩৩) ও ইভান কুজনেৎসভ ওরফে ইভান বীরকুস (৩২) ভালোবাসাকে নিয়ে গেলেন আক্ষরিক অর্থেই আকাশের চূড়ায়। বিশ্বের অন্যতম পরিচিত স্থাপনা এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিংয়ের সর্বোচ্চ অংশে উঠে প্রেম নিবেদন, শান্তির বার্তা সম্বলিত ব্যানার, আর তার কিছুক্ষণের মধ্যেই পুলিশের হাতে গ্রেফতার—বাস্তবের এই ঘটনাই আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে শিরোনাম হওয়ার পর শুক্রবার ভারতীয় সামাজিক মাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

জানা গেছে, প্রায় ১,৪৫৪ ফুট উচ্চতার এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিংয়ের সুচালো অ্যান্টেনার মাথায় দাঁড়িয়ে যুগল একটি বিশাল কালো ব্যানার মেলে ধরেন। তাতে লেখা ছিল—When the power of love beats the love of power, the world knows peace. অর্থাৎ, ক্ষমতার প্রতি ভালোবাসাকে যখন ভালোবাসার শক্তি পরাজিত করে, তখনই পৃথিবী শান্তির মুখ দেখে। এরপর অ্যান্টেনার নিচের একটি প্ল্যাটফর্মে নেমে হাঁটু গেড়ে অ্যাঞ্জেলার সামনে আংটি বাড়িয়ে দেন ইভান। আবেগঘন সেই মুহূর্তে একে অপরকে আলিঙ্গন ও চুম্বন করেন তাঁরা।

কিন্তু রোম্যান্টিক সেই মুহূর্তের পরেই শুরু হয় নাটকীয় পর্ব। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায় নিউইয়র্ক পুলিশ (এনইয়াইপিডি)। পুলিশের বডি-ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, এক আধিকারিক খাঁচাবন্দি মই বেয়ে উঠে তাঁদের শান্তভাবে সেখানেই অপেক্ষা করতে বলেন। পরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে দু'জনকে নিচে নামিয়ে আটক করা হয়।

তদন্তে উঠে এসেছে আরও বিস্ময়কর তথ্য। তদন্তকারীদের সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত যুগল আগের রাতেই বৈধ টিকিট কেটে এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিংয়ে প্রবেশ করেন এবং গোপনে ভবনের ভিতরেই রাত কাটান। পরদিন ভোরে নিরাপত্তা ক্যামেরায় তাঁদের নিষিদ্ধ অংশে প্রবেশ করতে দেখা যায়। অভিযোগ, সম্প্রচার অ্যান্টেনায় ওঠার নিরাপত্তা-দরজার তালা ভেঙে এবং বিশেষ সরঞ্জামের সাহায্যে তাঁরা অ্যান্টেনার সিঁড়িতে পৌঁছেছিলেন।

উদ্ধার অভিযানও ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তদন্তকারীদের বক্তব্য, সম্প্রচার অ্যান্টেনা থেকে নির্গত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন রেডিও সিগন্যালের কারণে শুরুতে উদ্ধারকারী দল উপরে উঠতে পারেনি। উদ্ধারকর্মীদের নিরাপত্তার স্বার্থে প্রথমে অ্যান্টেনার বিদ্যুৎ সংযোগ সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়। তারপর নিউইয়র্ক পুলিশের জরুরি পরিষেবা শাখার সদস্যরা উপরে উঠে যুগলকে নিরাপদে নিচে নিয়ে আসেন।

এনইয়াইপিডি জানিয়েছে, অ্যাঞ্জেলা ও ইভানের বিরুদ্ধে চুরি, অনধিকার প্রবেশ, বেপরোয়া আচরণের মাধ্যমে বিপদ সৃষ্টি, অপরাধমূলক ক্ষতি, জনশৃঙ্খলা ভঙ্গ-সহ একাধিক গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। তদন্তকারীদের মতে, তাঁদের এই দুঃসাহসিক পদক্ষেপ শুধু নিজেদের নয়, উদ্ধারকারী বাহিনীর জীবনকেও ঝুঁকির মুখে ফেলেছিল।

বৃহস্পতিবার ম্যানহাটন ক্রিমিনাল কোর্টে তোলা হলে বিচারক তাঁদের পর্যবেক্ষণাধীন মুক্তির নির্দেশ দেন। আদালত থেকে বেরিয়ে নবনিযুক্ত এই যুগলকে হাসিমুখে হাত ধরাধরি করে বেরিয়ে যেতে দেখা যায়। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে ইভানের সংক্ষিপ্ত জবাব, আমরা নিউইয়র্ককে ভালোবাসি। আগামী ২৪ আগস্ট মামলার পরবর্তী শুনানি হবে।

অন্যদিকে, যুগলের আইনজীবী জেসন ক্রিনস্কির দাবি, প্রসিকিউশন অপ্রয়োজনীয়ভাবে কঠোর অভিযোগ এনেছে। তাঁর বক্তব্য, তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল ভালোবাসার একটি প্রতীকী বার্তা পৌঁছে দেওয়া, কারও ক্ষতি করা নয়। যদিও তদন্তকারী সংস্থার মতে, অনুমতি ছাড়া নিরাপত্তা বলয় ভেঙে এমন বিপজ্জনক স্থানে ওঠা কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই অননুমোদিত ঘটনার সময় ভবনের দর্শনার্থী বা কর্মীদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়নি। তবে একই সঙ্গে তারা মনে করিয়ে দিয়েছে, ভবনের অবজারভেশন ডেকেই নিরাপদ ও বৈধভাবে স্মরণীয় বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার সুযোগ রয়েছে; তার জন্য জীবনের ঝুঁকি নেওয়ার প্রয়োজন নেই।

অ্যাঞ্জেলা নিকোলাউ ও ইভান বীরকুস আন্তর্জাতিক 'রুফটপিং' জগতের পরিচিত মুখ। বিশ্বের একাধিক সুউচ্চ অট্টালিকার মাথায় উঠে ছবি ও ভিডিও তৈরির জন্য তাঁরা আগেও আলোচনায় এসেছেন। তাঁদের জীবন ও সম্পর্ককে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছে ২০২৪ সালের তথ্যচিত্র ‘Skywalkers: A Love Story’।

ভারতেও এই ঘটনার ভিডিও ও ছবি দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক মাধ্যমে। কেউ তাঁদের সাহসের প্রশংসা করেছেন, আবার অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন—ভালোবাসার প্রকাশ কি এমন হওয়া উচিত, যেখানে নিজের সঙ্গে অন্যের জীবনও ঝুঁকির মুখে পড়ে?

হয়তো এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিংয়ের চূড়ায় সেই প্রেম নিবেদনের দৃশ্য বহুদিন মানুষের মনে থাকবে। কিন্তু তার শেষ দৃশ্যটিও সমান তাৎপর্যপূর্ণ—ভালোবাসা মানুষকে আকাশ ছোঁয়ার সাহস দিতে পারে, কিন্তু আইন, নিরাপত্তা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার সীমারেখা অতিক্রম করলে সেই রোমাঞ্চের পরিণতি কখনও কখনও হাতকড়াতেই গিয়ে শেষ হয়।

---------------

হিন্দুস্থান সমাচার / সৌমি বৈদ্য




 

 rajesh pande