
- ‘সেদিন বিকালে যদি আমি তাঁর সঙ্গে থাকতাম, তা-হলে হয়তো ওই ঘটনা ঘটত না’, আক্ষেপ মুখ্যমন্ত্ৰীর
ইমফল / চূড়াচাঁদপুর (মণিপুর), ৪ জুলাই (হি.স.) : মৃত্যুর চার মাস পর আজ শনিবার মণিপুরের চূড়াচাঁদপুর জেলার ডরকাস ভেং-এ প্রাক্তন থানলন বিধায়ক প্রয়াত ভুঙজাগিন ভালতের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছে। প্রয়াত বিধায়ক বিজেপি নেতা ভালতের শেষকৃত্যে অংশগ্ৰহণ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী ইউমনাম খেমচাঁদ সিং।
আজ শনিবার হেলিকপ্টারে করে চূড়াচাঁদপুর এসে প্রাক্তন বিধায়কের শেষকৃত্যে অংশগ্রহণ করে আজই ইমফলে ফিরে গিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের পৌরোহিত্য অনুষ্ঠিত এক ভার্চুয়াল বৈঠকে যোগ দেন মুখ্যমন্ত্রী খেমচাঁদ।
শেষকৃত্যে উপস্থিত শোকাহত মানুষের উদ্দেশে বক্তব্য পেশ করতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী খেমচাঁদ সিং প্রয়াত বিধায়ককে ‘অত্যন্ত শান্ত স্বভাবের মানুষ’ বলে অভিহিত করেন। তিনি জানান, ২০১৭ সালে মণিপুর বিধানসভার স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ভালতের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।
২০২৩ সালের ৪ মে জাতিগত সংঘর্ষের শুরুর দিকে ভুঙজাগিন ভালতের ওপর হামলার প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী গভীর দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘আমার সবচেয়ে বড় আক্ষেপ, সেদিন বিকালে যদি আমি তাঁর সঙ্গে থাকতাম, তা-হলে হয়তো ওই ঘটনা ঘটত না।’
আজকের সফরকে ব্যক্তিগত উদ্যোগ বলে উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, তিনি এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতেই এখানে এসেছেন। শেষকৃত্যে উপস্থিত থাকতে পারা তাঁর কাছে সম্মানের বিষয় বলেও তিনি জানান। পাশাপাশি তিনি আশ্বস্ত করেন, প্রয়াত বিধায়কের পরিবার ও ঘনিষ্ঠজনদের পাশে তিনি ভবিষ্যতেও থাকবেন এবং প্রয়োজনে সব ধরনের সহযোগিতা করবেন।
মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, জাতিগত সংঘর্ষের শুরুর দিনগুলো ছিল অত্যন্ত কঠিন। পরিস্থিতি যাতে আরও অবনতি না ঘটে এবং জনপ্রতিনিধিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়, সে জন্য সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিল।
শেষকৃত্যের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে খেমচাঁদ সিং বলেন, মণিপুরে স্থায়ী শান্তি ফিরিয়ে আনতে সংলাপই একমাত্র কার্যকর পথ। তিনি বলেন, রাজ্যের সার্বিক উন্নয়নের জন্য দীর্ঘস্থায়ী শান্তি অত্যন্ত জরুরি।
শান্তি প্রতিষ্ঠার রোডম্যাপ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে মুখ্যমন্ত্রী হাসিমুখে বলেন, ‘আপনার হাসিই শান্তির পথ।’ প্রশ্ন করার ভঙ্গির জবাবে তিনি এই মন্তব্য করেন।
মুখ্যমন্ত্রী বিধায়ক টংব্রাম রবীন্দ্রের সঙ্গে প্রয়াত নেতার মরদেহে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে তাঁর বিদেহী আত্মার চিরশান্তি কামনা করেন। এদিন শ্রদ্ধা নিবেদনকারীদের মধ্যে ছিলেন চিনলুন্তাং, বিধায়ক লেটজামাং ও ভি হাংখানলিয়ান, প্রাক্তন মন্ত্রীরা, বিভিন্ন উপজাতি নেতা, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, সরকারি আধিকারিক, সমর্থক এবং সাধারণ মানুষ।
শেষকৃত্য সম্পন্ন হওয়ার পর পরিবার, আত্মীয়স্বজন, বন্ধু, সহকর্মী এবং অসংখ্য শুভানুধ্যায়ীর শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনের পর ভুঙজাগিন ভালতের মরদেহ ডরকাস ভেং-এর ওয়াইপিএ নিউ লামকা সমাধিক্ষেত্রে সমাহিত করা হয়। প্রসঙ্গত প্রয়াত ভুঙজাগিন ভালতের পরিবারে স্ত্রী, এক কন্যা এবং দুই পুত্র রয়েছেন।
এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, কুকি-জো সম্প্রদায়ের একজন বিশিষ্ট নেতা ভুঙজাগিন ভালতে মণিপুরের চূড়াচাঁদপুর জেলার থানলন বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক ছিলেন। ২০২৩ সালের মে মাসে মণিপুরে মেইতেই ও কুকি সম্প্রদায়ের মধ্যে জাতিগত সংঘর্ষ শুরু হলে ৪ মে সহিংসতার দ্বিতীয় দিন গুরুতরভাবে আক্রান্ত হয়েছিলেন তিনি।
সেদিন ইমফলে তিনি তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী নংথমবাম বীরেন সিঙের সঙ্গে বৈঠক করে শান্তি প্রতিষ্ঠার আবেদন জানিয়েছিলেন। বৈঠক শেষে ফেরার পথে ইমফল পশ্চিম জেলার নাগামাপাল এলাকায় আরআইএমএস (রিমস) রোডে উগ্র জনতার একটি দল তাঁর গাড়ি আটকে দেয়। গাড়ি থেকে টেনে নামিয়ে তাঁকে নির্মমভাবে প্রহার করা হয়। হামলায় তাঁর মুখের এক পাশ চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। বাম চোখ গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বিধায়ক ভুঙজাগিনের।
এর পর তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিমানে করে দিল্লিতে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রায় দু-বছর ধরে তিনি দিল্লি ও চূড়াচাঁদপুরে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। অধিকাংশ সময় শয্যাশায়ী অবস্থায় কাটিয়েছিলেন তিনি। গত বছর ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে তিনি চূড়াচাঁদপুরে ফিরে এসে চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
তবে, পরবৰ্তীতে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে গত ৮ ফেব্রুয়ারি তাঁকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে গুরগাঁওয়ের মেডান্টা হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করা হয়। নবনিযুক্ত মুখ্যমন্ত্রী ইউমনাম খেমচাঁদ সিং তাঁর শারীরিক অবস্থার ওপর ব্যক্তিগতভাবে নজর রেখে চলেছিলেন। নিজে বিমানবন্দরে উপস্থিত থেকে সংহতি ও শান্তির বার্তাবাহক ভুঙজাগিন ভালতেকে বিদায় জানিয়েছিলেন। চিকিৎসকদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টাকে ব্যৰ্থ করে গত ২১ ফেব্রুয়ারি অপরাহ্ন ২টা ১৯ মিনিটে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।
কুকি-জো সম্প্রদায়ের একজন জ্যেষ্ঠ বিজেপি নেতা হিসেবে ভালতে পাহাড়ি জেলার মানুষের স্বার্থ রক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। ২০২৩ সালের সহিংসতায় তাঁর ওপর হামলার ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।
উল্লেখ্য, বিধায়কের ওপর হামলার ঘটনায় ন্যায়বিচার ও জবাবদিহির দাবিতে জোমি নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলি ‘জোমি কো-অর্ডিনেশন কমিটি’ (জেডসিসি) গঠন করায় শেষকৃত্য বিলম্বিত হয়। জেডসিসি-সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি কমিটি ভালতের মরদেহ পরিবারের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যাতে তাঁরা শেষকৃত্য সম্পন্ন করতে পারেন।
জেডসিসির অন্যতম প্রধান দাবি ছিল, বিধায়কের ওপর হামলার ঘটনায় জাতীয় তদন্ত সংস্থা (এনআইএ) অথবা কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো (সিবিআই)-র মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করা। পাশাপাশি, মণিপুরের কুকি-জো অধ্যুষিত অঞ্চলগুলিকে বিধানসভা সহ পৃথক কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল (ইউনিয়ন টেরিটরি) হিসেবে ঘোষণার দাবি। ভালতে নিজেও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে চিঠি লিখে কুকি-জো সম্প্রদায়ের জন্য পৃথক প্রশাসনিক ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছিলেন।
হিন্দুস্থান সমাচার / সমীপ কুমার দাস