প্রবীণ সাংবাদিক অমলেন্দু কুণ্ডুর প্রয়াণে প্রেস ক্লাব কলকাতার শোক প্রকাশ, অবসান হলো সাংবাদিকতার এক বর্ণময় যুগের
কলকাতা, ৪ জুলাই (হি. স.) : প্রবীণ সাংবাদিক অমলেন্দু কুণ্ডুর প্রয়াণে গভীর শোক প্রকাশ করেছে প্রেস ক্লাব কলকাতা। শনিবার সন্ধ্যায় পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া ময়দান এলাকার নিজস্ব বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। এর সঙ্গেই চিরকালের মতো থেমে গেল সিকিম ও পূ
প্রবীণ সাংবাদিক অমলেন্দু কুণ্ডুর প্রয়াণে প্রেস ক্লাব কলকাতার শোক প্রকাশ, অবসান হলো সাংবাদিকতার এক বর্ণময় যুগের


কলকাতা, ৪ জুলাই (হি. স.) : প্রবীণ সাংবাদিক অমলেন্দু কুণ্ডুর প্রয়াণে গভীর শোক প্রকাশ করেছে প্রেস ক্লাব কলকাতা। শনিবার সন্ধ্যায় পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া ময়দান এলাকার নিজস্ব বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। এর সঙ্গেই চিরকালের মতো থেমে গেল সিকিম ও পূর্ব হিমালয়ের এক নির্ভরযোগ্য ইতিহাস লেখকের কলম। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছরেরও বেশি। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন। পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতেই শান্তিপূর্ণভাবে জীবনের শেষ অধ্যায়ের ইতি টানেন তিনি। পারিবারিক সূত্রে এই খবরের সত্যতা স্বীকার করা হয়েছে। তাঁর প্রয়াণের সঙ্গে অবসান ঘটল পাঁচ দশকেরও বেশি সময় জুড়ে বিস্তৃত এক বর্ণময় সাংবাদিকতা জীবনের।

উল্লেখ্য, ১৯৬৮ সালে বহুভাষিক সংবাদ সংস্থা হিন্দুস্থান সমাচার-এর মাধ্যমে তাঁর সাংবাদিকতার কর্মজীবনে প্রবেশ। এরপর তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করেন। নিজের সহজাত দক্ষতার দৌলতে তিনি বিশেষ স্বীকৃতি লাভ করেন এবং পূর্বাঞ্চলের ‘চিফ অফ নিউজ ব্যুরো’ পদে যোগদান করেন। ১৯৭০ সালে তৎকালীন সময়েই সর্বকনিষ্ঠ ব্যুরো প্রধান হিসেবে তিনি খ্যাতির শিরোপা জয় করেছিলেন।

প্রসঙ্গত, অমলেন্দু কুণ্ডুর মৃত্যু ভারতীয় সাংবাদিকতায় এক যুগের অবসান। সততা, নীরব নিষ্ঠা, বিষয়ের গভীরে পৌঁছনোর ক্ষমতা এবং দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অথচ দীর্ঘদিন উপেক্ষিত সীমান্ত অঞ্চলকে ধারাবাহিকভাবে সংবাদমানচিত্রে তুলে ধরার অদম্য অঙ্গীকার ছিল তাঁর পরিচয়। সিকিম ও পূর্ব হিমালয়ের ঘটনাপ্রবাহকে তিনি কেবল আঞ্চলিক সংবাদে সীমাবদ্ধ রাখেননি, জাতীয় কৌশলগত আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সহকর্মী, নীতিনির্ধারক ও পাঠকমহলে তিনি সমানভাবে শ্রদ্ধেয় ছিলেন। তাঁর অসংখ্য প্রতিবেদন যেমন ভবিষ্যতের দলিল হয়ে থাকবে, তেমনই জনস্বার্থভিত্তিক সাংবাদিকতার যে মানদণ্ড তিনি স্থাপন করেছিলেন, তাও আগামী প্রজন্মের কাছে অনুকরণীয় হয়ে থাকবে।

পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে সিকিম ও পূর্ব হিমালয় অঞ্চলের সমাজ-রাজনীতি, সীমান্ত পরিস্থিতি এবং কৌশলগত বাস্তবতা নিয়ে ধারাবাহিকভাবে লিখেছেন কুণ্ডু। দেশের অল্প কয়েকজন সাংবাদিকের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম, যিনি প্রত্যন্ত সীমান্তাঞ্চলের ঘটনাবলীকে জাতীয় কৌশলগত আলোচনার কেন্দ্রে উপস্থাপন করেছিলেন। তাঁর লেখায় বারবার উঠে এসেছে আঞ্চলিক বাস্তবতা ও জাতীয় স্বার্থের নিবিড় ও পারস্পরিক গভীরতর সম্পর্ক।

কর্মজীবনে দেশের একাধিক প্রথম সারির সংবাদমাধ্যমে কাজ করেছেন তিনি। সিকিমে ‘দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া’-র বিশেষ সংবাদদাতা হিসেবে টানা চার দশকেরও বেশি সময় দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৭ সালে ব্যুরো প্রধান হিসেবে সিকিমে সাংবাদিকতা শুরু করেছিলেন তিনি, যখন রাজ্যটির ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব নিয়ে জাতীয় স্তরে আলোচনা সবে শুরু হয়েছে।

তাঁর সাংবাদিকতার বৈশিষ্ট্য ছিল গভীর অনুসন্ধান, তথ্যনিষ্ঠতা এবং প্রেক্ষাপটের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ। ভারত-চিন, নেপাল ও ভুটান সীমান্তের পরিবর্তিত সমীকরণ হোক বা দার্জিলিং পাহাড়ের আন্দোলনের অন্তর্লীন বাস্তবতা—সব ক্ষেত্রেই তাঁর প্রতিবেদন জটিল বিষয়কে সহজ অথচ নির্ভুলভাবে তুলে ধরেছে। তাঁর লেখা 'Standpoint Sikkim – Under the Dragon’s Shadow' বইটি সিকিমের সমকালীন ইতিহাস ও কৌশলগত বাস্তবতার এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত।

আজীবন সাংবাদিকতায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৮ সালে সিকিমের ৪৩তম রাজ্য প্রতিষ্ঠা দিবসে তাঁকে ‘কাশীরাজ প্রধান লাইফটাইম জার্নালিজম অ্যাওয়ার্ড’-এ সম্মানিত করে সিকিম সরকার। রাজ্যের ইতিহাস ও পরিচয়কে জাতীয় স্তরে তুলে ধরতে বিশেষ অবদান রাখা সাংবাদিকদেরই এই সম্মান প্রদান করা হয়।

তবে পুরস্কার বা স্বীকৃতির চেয়েও বড় ছিল তাঁর সাংবাদিকতার আদর্শ। তথ্য যাচাই, নির্ভুলতা এবং গভীর গবেষণার উপরই ছিল তাঁর অটল আস্থা। তিনি সেই প্রজন্মের প্রতিনিধি, যাঁদের কাছে সাংবাদিকতা ছিল দ্রুত সংবাদ পরিবেশনের প্রতিযোগিতা নয়, বরং সত্যের গভীরে পৌঁছনোর এক নিরন্তর সাধনা। তাঁর প্রতিটি প্রতিবেদনে ফুটে উঠেছে দীর্ঘ অভিজ্ঞতার পরিশীলিত দৃষ্টিভঙ্গি, যা উত্তর-পূর্ব ভারতের জটিল বাস্তবতাকে নতুন আলোয় দেখার সুযোগ করে দিয়েছে। সহকর্মীদের কাছে তিনি ছিলেন একাধারে ইতিহাসের নথিকার, অন্যদিকে উত্তর-পূর্ব ভারতের পরিবর্তিত পরিচয়ের এক বিশ্বস্ত রক্ষক।

প্রযুক্তিনির্ভর দ্রুতগতির সংবাদমাধ্যমের এই সময়ে অমলেন্দু কুণ্ডুর জীবন ও কাজ আবারও মনে করিয়ে দেয় সাংবাদিকতার মূল উদ্দেশ্যকে—গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা, নির্ভুলভাবে সত্য তুলে ধরা এবং দেশের প্রান্তিক অঞ্চলকে জাতীয় চেতনায় যথাযোগ্য স্থান করে দেওয়া।

হিন্দুস্থান সমাচার / শুভদ্যুতি দত্ত




 

 rajesh pande