
গুয়াহাটি, ৬ জুলাই (হি.স.) : আধুনিক ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ জাতীয়তাবাদী চিন্তাবিদ, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, সংসদীয় নেতা এবং ভারতীয় জনসংঘের প্রতিষ্ঠাতা ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ১২৫-তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষ্যে আজ সোমবার গুয়াহাটির অটলবিহারী বাজপেয়ী ভবনে শ্রদ্ধাঞ্জলি অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ভারতীয় জনতা পার্টি, অসম প্রদেশ।
অনুষ্ঠানে অসম বিজেপির প্রদেশ সভাপতি দিলীপ শইকিয়ার নেতৃত্বে দলের প্রবীণ নেতা ও কর্মীরা ড. মুখোপাধ্যায়ের প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন। পাশাপাশি তাঁর সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ, সাংবিধানিক অখণ্ডতা ও জাতীয় ঐক্যের আদর্শকে অনুসরণ করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
দিলীপ শইকিয়া বলেন, ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জন্মজয়ন্তী উপলক্ষ্যে দেশজুড়ে ১৫ দিনব্যাপী 'ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় স্মরণ পক্ষ' পালন করা হচ্ছে। তিনি জানান, মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদানের ওপর ড. মুখোপাধ্যায় বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। মাত্র ৩৩ বছর বয়সে, ১৯৩৪ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে ১৯৩৭ সালে ভারতীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় আধুনিক ভারতীয় ভাষার মাধ্যমে মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেন।
তিনি আরও বলেন, ভারতীয় রাজনীতিতে প্রথমবারের মতো 'ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট'-এর মাধ্যমে জোটভিত্তিক রাজনীতির সূচনা করেছিলেন ড. মুখোপাধ্যায়। দেশের ঐক্য, অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। তাই আজও তিনি ভারতের জাতীয় সংহতির এক উজ্জ্বল প্রতীক হিসেবে দেশবাসীর হৃদয়ে চিরস্মরণীয়। তাঁর জীবন, আদর্শ ও দেশপ্রেম আগামী প্রজন্মকে জাতিসেবা ও দেশগঠনে অনুপ্রাণিত করে যাবে।
এদিকে, জন্মজয়ন্তী উপলক্ষ্যে বিজেপির অসম প্রদেশের মুখপাত্র ড. জাফরিন মেহজাবিন বলেন, ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ভারতের রাজনৈতিক ও সভ্যতাগত ইতিহাসে এক অনন্য ও স্থায়ী স্থান অধিকার করে আছেন। ভারতীয় জনসংঘের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তিনি এমন এক আদর্শিক ভিত্তি গড়ে তুলেছিলেন, যার ওপর পরবর্তীকালে ভারতীয় জনতা পার্টির আদর্শ প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি ছিলেন একজন দূরদর্শী চিন্তাবিদ, যিনি সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, জাতীয় সংহতি ও সভ্যতাগত আত্মবিশ্বাসের ভিত্তিতে ভারতের ভবিষ্যতের রূপরেখা তুলে ধরেছিলেন।
অসমের প্রতি ড. মুখোপাধ্যায়ের অবদানের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে ড. মেহজাবিন বলেন, স্বাধীনতার আগে ক্যাবিনেট মিশনের গ্রুপিং পরিকল্পনার মাধ্যমে অসমকে একটি মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রশাসনিক গোষ্ঠীতে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা হয়েছিল। এর ফলে রাজ্যের জনবিন্যাস, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ গভীর সংকটের মুখে পড়ে। সেই সময় ড. মুখোপাধ্যায় এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে দেশব্যাপী সবচেয়ে দৃঢ় কণ্ঠস্বর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। সাংবিধানিক যুক্তি, সংসদীয় হস্তক্ষেপ এবং জাতীয় নেতৃত্বের সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনার মাধ্যমে তিনি স্পষ্টভাবে তুলে ধরে বলেন, অসমের ঐতিহাসিক স্বাতন্ত্র্য ও কৌশলগত গুরুত্ব ভারতের সঙ্গে তার অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ককে কেবল সাংবিধানিক নয়, সভ্যতাগত অপরিহার্যতায় পরিণত করেছে। তাঁর দৃঢ় অবস্থানের ফলেই অসম বিভাজনের অনিশ্চয়তা থেকে রক্ষা পেয়ে ভারতীয় ইউনিয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে থেকে যেতে সক্ষম হয়।
তিনি আরও বলেন, উত্তরপূর্ব ভারতের কৌশলগত গুরুত্ব জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে আসার বহু আগেই ড. মুখোপাধ্যায় এই অঞ্চলকে ভারতের সভ্যতার পূর্বদ্বার এবং ভূ-কৌশলগত প্রবেশপথ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা, জাতীয় নিরাপত্তা সুদৃঢ় করা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক যোগাযোগ সম্প্রসারণে অসম ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অপরিহার্য ভূমিকা সম্পর্কে তাঁর সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গি আজ বাস্তবে প্রতিফলিত হচ্ছে।
ড. মেহজাবিন বলেন, ড. মুখোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক জীবন ছিল বিদ্বৎতা, সাংবিধানিক নৈতিকতা ও আপসহীন জাতীয়তাবাদের এক অনন্য সমন্বয়। জাতীয় স্বার্থে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা থেকে তাঁর পদত্যাগ, ১৯৫১ সালে ভারতীয় জনসংঘ প্রতিষ্ঠা এবং জম্মু-কাশ্মীরে প্রচলিত সাংবিধানিক বিশেষ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তাঁর নির্ভীক আন্দোলন ভারতের অখণ্ডতার প্রতি তাঁর অটল বিশ্বাসেরই প্রতিফলন। তাঁর ঐতিহাসিক স্লোগান, 'এক দেশে দুই সংবিধান, দুই পতাকা ও দুই প্রধানমন্ত্রী চলতে পারে না', ভারতের সাংবিধানিক ঐক্যের এক স্মরণীয় ঘোষণায় পরিণত হয়েছে। জাতীয় সংহতির জন্য সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ তাঁকে স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে জাতীয়তাবাদ ও ঐক্যের এক অমর প্রতীকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
তিনি বলেন, ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের উত্তরাধিকার কেবল ইতিহাসের বিষয় নয়, আজও তা প্রতিটি দেশপ্রেমিককে অনুপ্রাণিত করে। ভারতের ঐক্য, সভ্যতাগত ঐতিহ্য এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে আরও শক্তিশালী করতে তাঁর আদর্শ ভবিষ্যতেও পথপ্রদর্শক হয়ে থাকবে। তিনি সকল কর্মী ও নাগরিককে ড. মুখোপাধ্যায়ের আত্মনিবেদিত সেবা, বৌদ্ধিক সততা, সাংবিধানিক জাতীয়তাবাদ এবং দেশের প্রতি অকৃত্রিম দায়বদ্ধতার আদর্শকে দৈনন্দিন জীবনে বাস্তবায়নের আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানের শেষে উপস্থিত সকল কর্মী ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের শক্তিশালী, ঐক্যবদ্ধ, আত্মবিশ্বাসী এবং সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ ভারত গড়ার চিরন্তন স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করেন।
হিন্দুস্থান সমাচার / সমীপ কুমার দাস