
দুর্গাপুর, ২৯ আগস্ট (হি.স.): সাতসকালে মায়ের সঙ্গে দুর্গাপুর থেকে ট্রেনে কলকাতা সল্টলেকের ভিডিওকন কোচিং সেন্টারে। তারপর সেখানে ঘন্টা কয়েকের অনুশীলন। তারপর আবার দুর্গাপুর ফিরে যাওয়া। মাঝের সময়ে বিশ্রাম নিতেন স্টেশনের প্ল্যাটফর্মেই। সপ্তাহের শনি রবিবার উইকএন্ড রুটিন ছিল। আর সেখান থেকে জাতীয় দলে। অবশেষে স্বপ্নপূরণ হল বঙ্গতনয় অভিপ্রায়ের।
অস্ট্রেলিয়া অনূর্ধ্ব ১৯ দলের বিরুদ্ধে আগামী সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে দুই ফরম্যাটে সিরিজ খেলবে ভারত অনূর্ধ্ব ১৯ দল। আর সেই সিরিজের দুই 'মাল্টি ডে' ম্যাচের দলে জায়গা করে নিয়েছেন বাংলার এই তরুণ উইকেটকিপার-ব্যাটার।
অভিপ্রায় বিশ্বাস। দুর্গাপুর সুকান্ত পল্লীর বাসিন্দা। বাবা পঙ্কজ কুমার বিশ্বাস পেশায় চিকিৎসক। মা অলকা বিশ্বাস, গৃহবধূ। ছোটবেলা থেকেই ক্রিকেটে আগ্রহী ছিলেন অভিপ্রায়। সেই সুবাদে দাদুর হাত ধরে স্থানীয় একটি কোচিং সেন্টারে ক্রিকেটে হাতেখড়ি হয় তাঁর। মাত্র সাত বছর বয়সে দুর্গাপুরের একটি অ্যাকাডেমিতে ক্রিকেট শেখা শুরু করেন অভিপ্রায়। কিন্তু নিজের শহরে ক্রিকেটের সুযোগ সুবিধা সীমিত ছিল। তাই স্বপ্নকে আরও বড় করতে শুরু হয় দুর্গাপুর থেকে কলকাতার যাত্রা। সল্টলেকের কোচিং সেন্টারে। সেখানে প্রতি শনিবার ও রবিবার আসতেন তিনি।
শনিবার বা রবিবার মানেই ছিল অন্যরকম লড়াই। মাঝরাতে মায়ের সঙ্গে দুর্গাপুর থেকে ট্রেনে উঠতেন অভিপ্রায়। ভোরে পৌঁছে যেতেন হাওড়া অথবা শিয়ালদহ স্টেশনে। তারপর প্ল্যাটফর্মের বেঞ্চে কিছুক্ষণ বিশ্রাম। ঘুম চোখে, শরীরে ক্লান্তি। কিন্তু সামনে ছিল ক্রিকেটের মাঠ। সেখান থেকে আবার বেরিয়ে পড়া কলকাতার মাঠের উদ্দেশে। অন্য অনেক শিশুর কাছে শনিবার আর রবিবার ছিল ছুটির দিন। অভিপ্রায়ের কাছে সেই দিনগুলো ছিল স্বপ্ন পূরণের দিন। দুর্গাপুর থেকে কলকাতায় এসে করুণাময়ীর ভিডিওকন অ্যাকাডেমিতে অনুশীলন শুরু করেন অভিপ্রায়। ছোটবেলা থেকেই ব্যাটিং এবং উইকেটকিপিং দুটোই করতে ভালোবাসতেন তিনি। পরপর দু'বছর ভিডিওকন অ্যাকাডেমির হয়ে অম্বর রায় অনূর্ধ্ব ১৩ টুর্নামেন্টে খেলেন। করোনার অতিমারি বদলে দেয় সবকিছু। বন্ধ হয়ে গেল ক্রিকেট। মাঠের দরজা বন্ধ, অনুশীলন বন্ধ, প্রতিযোগিতা বন্ধ। কিন্তু একটা জিনিস বন্ধ হয়নি। অভিপ্রায়ের স্বপ্ন। বর্ধমানের হয়ে সিএবি জেলা ক্রিকেটে নিজের প্রতিভার পরিচয় দিলেন। বাঁহাতি ব্যাটার হিসেবে দলের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকও হলেন। এরপর এল ক্লাব ক্রিকেট। ২০২২ থেকে ২৩ মরশুমে ইন্টারন্যাশনাল ক্লাবের হয়ে দ্বিতীয় ডিভিশনে খেলেন অভিপ্রায়। সিএবি অনূর্ধ্ব ১৮ ক্রিকেটে সর্বোচ্চ রান করে দলকে চ্যাম্পিয়ন করলেন। তাঁর পারফরম্যান্স এবার নির্বাচকদের নজরে পড়ল। বাংলার অনূর্ধ্ব ১৬ দলে সুযোগ পেলেন অভিপ্রায়। বাংলার হয়ে তামিলনাড়ুতে প্রস্তুতি সফরে গিয়ে শেষ ম্যাচে করলেন দুর্দান্ত ১৭৯ রান। এরপর আমদাবাদের প্রস্তুতি ম্যাচেও রান পেলেন। সুযোগ এল বিজয় মার্চেন্ট ট্রফিতে। এরপর এল সেই মুহূর্ত, যার জন্য এতদিনের পরিশ্রম। বেঙ্গালুরুর সেন্টার অফ এক্সেলেন্সে ছিলেন অভিপ্রায়। দলীপ ট্রফির কারণে সেখানে ছিলেন বাংলার ক্রিকেটার সূরজ সিন্ধু জয়সওয়ালও। অভিপ্রায় ছিলেন তাঁর ঘরেই। হঠাৎ ফোন এল সৌরাশিস লাহিড়ীর। খবরটা শুনে অভিপ্রায়ের জীবনের একটা বড় স্বপ্ন সত্যি হয়ে গেল। ভারতের অনূর্ধ্ব ১৯ দলে সুযোগ পেয়েছেন তিনি। খবরটা পাওয়ার পর প্রথমেই বাড়িতে ফোন করেন অভিপ্রায়। দুর্গাপুরের বাড়িতে তখন আনন্দের মুহূর্ত। মা, বাবা, দাদু সবাই খুশি। আর সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছিলেন তাঁর দাদু। একদিন ভোরে হাওড়া বা শিয়ালদহের প্ল্যাটফর্মে বসে বিশ্রাম নিতে নিতে যে ছেলেটা শুধু একটা স্বপ্ন দেখত, আজ সেই ছেলেটাই ভারতীয় দলের জার্সি পরার অপেক্ষায়। দুর্গাপুর থেকে কলকাতা, প্ল্যাটফর্মের বেঞ্চ থেকে ক্রিকেট মাঠ, জেলা ক্রিকেট থেকে বাংলা দল, বয়সভিত্তিক ক্রিকেট পেরিয়ে এবার ভারত। এই পথটা সহজ ছিল না। ছিল ক্লান্তি, ছিল অপেক্ষা, ছিল ব্যর্থতা, ছিল করোনার মতো বড় বাধা। কিন্তু ছিল একটা জেদও। স্বপ্নটাকে ছেড়ে দেওয়া যাবে না। অভিপ্রায় বিশ্বাস সেই জেদ নিয়েই আজ দাঁড়িয়ে আছেন ভারতীয় ক্রিকেটের দরজায়। সামনে অস্ট্রেলিয়া, সামনে নতুন পরীক্ষা। অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে চারদিনের দু'টি ম্যাচ খেলবেন অভিপ্রায়রা। প্রথমটা রাজকোটে শুরু হবে ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে। দ্বিতীয়টা আহমেদাবাদে, ৫ অক্টোবর থেকে। তবে এখনই সেই ম্যাচ নিয়ে ভাবছেন না অভিপ্রায়। বরং সিওই-তে কিপিং ক্যাম্পে নিজের পূর্ণ মনযোগ দেওয়ার উপর জোর দিচ্ছেন। অভিপ্রায় জানান, শনিবার সকালে রওনা হতাম দুর্গাপুর থেকে। দুপুরে সল্টলেকে প্র্যাকটিস করতাম। তারপর আবার বাড়ি ফিরতাম। এক-একদিন রাত এগারোটা বেজে যেত ফিরতে। রবিবারও তাই। আর যদি ম্যাচ থাকত, তবে আগের দিন মাঝরাতে রওনা হতাম। পুরো সময়টাই মা থাকত আমার সঙ্গে।
---------------
হিন্দুস্থান সমাচার / জয়দেব লাহা