রেকর্ড উৎপাদনেও আলু চাষিদের দুর্দশা, হুগলিতে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে বিপুল মজুত
হুগলি , ৫ আগস্ট (হি.স.): পশ্চিমবঙ্গে চলতি বছরে রেকর্ড পরিমাণ আলু উৎপাদন হলেও চাষিদের দুর্ভোগ কমার নাম নেই। বিপুল পরিমাণ আলু হিমঘরে মজুত থাকা সত্ত্বেও বাজারদর নিয়ন্ত্রণে না থাকায় কৃষক, ব্যবসায়ী এবং হিমঘর মালিক—সকলেই সমস্যায় পড়েছেন বলে অভিযোগ।
হিমঘর থেকে নামছে আলু


হুগলি , ৫ আগস্ট (হি.স.): পশ্চিমবঙ্গে চলতি বছরে রেকর্ড পরিমাণ আলু উৎপাদন হলেও চাষিদের দুর্ভোগ কমার নাম নেই। বিপুল পরিমাণ আলু হিমঘরে মজুত থাকা সত্ত্বেও বাজারদর নিয়ন্ত্রণে না থাকায় কৃষক, ব্যবসায়ী এবং হিমঘর মালিক—সকলেই সমস্যায় পড়েছেন বলে অভিযোগ।

বুধবার হিমঘর মালিক ও আলু ব্যবসায়ীদের দাবি, হিমঘর থেকে বর্তমানে প্রায় ৮ টাকা কেজি দরে আলু বেরোলেও খুচরো বাজারে সেই আলুর দাম পৌঁছে যাচ্ছে ১৬ টাকা কেজি পর্যন্ত। ফলে এই দামের পার্থক্যের সুবিধা কৃষকরা পাচ্ছেন না, বরং মধ্যস্বত্বভোগীরাই লাভবান হচ্ছেন বলে অভিযোগ ব্যবসায়ী সংগঠনগুলির।

এদিন ব্যবসায়ী সংগঠনগুলির অভিযোগ, আগের রাজ্য সরকারের আমলে অন্য রাজ্যে আলু পাঠানোর ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি হওয়ায় পশ্চিমবঙ্গের আলুর একাধিক বাইরের বাজার কার্যত হাতছাড়া হয়েছে। যদিও নতুন সরকার আন্তঃরাজ্য আলু পাঠানোর অনুমতি দিয়েছে, কিন্তু এ বিষয়ে ঘোষিত ভর্তুকির স্পষ্ট সরকারি বিজ্ঞপ্তি এখনও প্রকাশিত হয়নি বলে দাবি তাঁদের।

রাজ্যের মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ এর আগে ঘোষণা করেছিলেন, অন্য রাজ্যে আলু পাঠানোর ক্ষেত্রে হিমঘর মালিকদের ভর্তুকি দেওয়া হবে। তিনি জানিয়ে ছিলেন, গত বছরের তুলনায় চলতি বছরে রাজ্যে প্রায় ৩০ লক্ষ মেট্রিক টন বেশি আলু উৎপাদন হয়েছে। অতিরিক্ত উৎপাদিত আলু রাজ্যের বাইরে পাঠানোর চেষ্টা করছে সরকার। তবে হুগলি জেলা কৃষি বিপণন দফতরের আধিকারিকদের দাবি, ভর্তুকি সংক্রান্ত কোনও সরকারি নির্দেশ এখনও তাঁদের কাছে এসে পৌঁছয়নি।

পশ্চিমবঙ্গ দেশের অন্যতম বৃহৎ আলু উৎপাদক রাজ্য এবং হুগলি জেলার আলু উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। চলতি বছরে রাজ্যের হিমঘরগুলিতে প্রায় ৮০ লক্ষ মেট্রিক টন, অর্থাৎ প্রায় ১৬ কোটি বস্তা আলু মজুত করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে এখনও প্রায় ৭২ শতাংশ আলু হিমঘরেই রয়েছে। ৩০ জুন পর্যন্ত মাত্র ২৮ শতাংশ আলু বাজারে বিক্রি হয়েছে, যা স্বাভাবিক বছরের তুলনায় প্রায় ৮ শতাংশ কম।

হিমঘর অ্যাসোসিয়েশন ও ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না করা হলে নভেম্বর-ডিসেম্বর মাস পর্যন্তও এত বিপুল পরিমাণ আলু বিক্রি করা সম্ভব হবে না। এর ফলে নতুন মরশুমের আলু মজুত করার জন্য হিমঘরগুলিতে পর্যাপ্ত জায়গা তৈরি হবে না। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে কৃষকদের উপর এবং তাঁদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

দাদপুরের আলুচাষি শেখ নাসিরুদ্দিন জানান, এক বিঘা জমিতে আলু চাষ করতে প্রায় ৩০ হাজার টাকা খরচ হয়। অথচ বর্তমানে তাঁকে মাত্র ১২০ টাকা বস্তা দরে আলু বিক্রি করতে হচ্ছে। পরিস্থিতিতে সরকারের কাছে কৃষিঋণ মকুবের দাবিও জানিয়েছেন তিনি।

হিমঘর অ্যাসোসিয়েশনের রাজ্য সভাপতি শুভজিৎ সাহা বলেন, চলতি বছরে রাজ্যে রেকর্ড পরিমাণ আলু উৎপাদন হয়েছে। কিন্তু আন্তঃরাজ্য পরিবহণ ও বাজারজাতকরণে সমস্যা থাকায় চাষি, ব্যবসায়ী এবং হিমঘর মালিক—সকলেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তাঁর দাবি, আন্তঃরাজ্য পরিবহণে ভর্তুকি দেওয়ার পাশাপাশি মিড-ডে মিলের মতো সরকারি প্রকল্পে আলুর ব্যবহার বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে চিপস, ফ্লেক্স-সহ আলুভিত্তিক খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পকে উৎসাহ দেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তিনি।

অন্যদিকে প্রগতিশীল আলু ব্যবসায়ী সমিতির রাজ্য সম্পাদক লালু মুখোপাধ্যায় বলেন, অতিরিক্ত আলু মজুতের সমস্যা মোকাবিলায় রাজ্য সরকারকে কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি আলু কেনা, হিমঘরের ভাড়ায় ভর্তুকি এবং দীর্ঘমেয়াদি বাজারজাতকরণ পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

অন্যদিকে, খুচরো বাজারে আলুর দাম বাড়তে থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ক্রেতারাও। তাঁদের অভিযোগ, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যের কারণেই বাজারে আলুর দাম বাড়ছে, অথচ সেই বাড়তি দামের সুফল কৃষকদের কাছে পৌঁছচ্ছে না।

এই পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত আলু দ্রুত বাজারজাত করার পাশাপাশি আন্তঃরাজ্য বাজারে রফতানি বাড়ানো, ভর্তুকি সংক্রান্ত সরকারি নির্দেশিকা দ্রুত প্রকাশ এবং বাজার ব্যবস্থায় নজরদারি জোরদার করার দাবি জানিয়েছে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলি। কৃষক ও সাধারণ ভোক্তা—উভয়ের স্বার্থ রক্ষায় সরকার দ্রুত হস্তক্ষেপ করুক, এমনটাই দাবি তাঁদের।

হিন্দুস্থান সমাচার / SANTOSH SANTRA




 

 rajesh pande